মঙ্গলবার   ১৬ জুলাই ২০১৯   শ্রাবণ ১ ১৪২৬   ১৩ জ্বিলকদ ১৪৪০

বঙ্গবন্ধু এবং জয়বাংলা 

প্রকাশিত: ১০ আগস্ট ২০১৮  

করীম রেজা : নির্মম ঘাতকের হাতে বঙ্গবন্ধু নিহত হয়েছিলেন ১৯৭৫ সনে। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল ৯ মাসের কঠিন যুদ্ধের পরে ১৯৭১ সনে। যখন ঐক্যবদ্ধ হয়ে  সবার দেশ গঠনে ভূমিকা রাখার কথা, সেসময় মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে বিভাজন জাতিকে অবিন্যস্ত,দ্বিধান্বিত করে । বঙ্গবন্ধুকে কেন হত্যা করা হলো তা নিয়ে নানান রকম ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ হাজির করা হয়েছে;আরো হবে, হতে থাকবে। 

একদিন না একদিন প্রকৃত তথ্য, সত্য বেরিয়ে আসবে। বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা হিসাবে তিনি একটি শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে জাতীয় আকাক্সক্ষা, সংগ্রামের ঐকান্তিক চেতনা কিভাবে ধারণ ও রূপায়ন করেছিলেন নিচের আলোচনায় আমরা তা বুঝে নিতে চেষ্টা করছি।

গত ডিসেম্বরে ২০১৭ জয়বাংলা দেশের উচ্চ আদালতে গড়িয়েছে।  জয়বাংলা ১৯৭১ এ বাঙালি জাতি নির্মাণের স্তম্ভরূপে প্রতিষ্ঠিত ও কীর্তিত হবে আবহমান কাল। জয়বাংলা বাঙালির প্রাণের গভীর উৎস থেকে উচ্চারিত শক্তিমন্ত্র, এক কথায় বাংলাদেশ সৃষ্টির মূলমন্ত্র। বালাদেশ প্রতিষ্ঠার আগে জয়বাংলা ছিল কিন্তু ব্যবহার ছিল না। 

১৯৬৯ সনেই কেবল জয়বাংলার অমিত শক্তির পরিচয় পাওয়া যায়। জয়বাংলা, বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশ একাকার হয়ে গিয়েছিল বিশ্ববাসীর কাছে। স্বাধীনতা যুদ্ধের নয়মাস সময়কালের জন্য এ কথা যেমন সত্য, তার চেয়েও বেশি সত্য বাংলাদেশের অভ্যূদয়ের পর, এমনকি এখন পর্যন্ত পৃথিবীর অনেক দেশের জনগণ বাংলাদেশ বলতেই জয়বাংলা কিংবা বঙ্গবন্ধু বোঝে। 

জানুয়ারিতে ১৯৭১, ১০ বঙ্গবন্ধু বৃটেন, ভারত হয়ে বাংলাদেশে আসেন পাকিস্তানি জেল থেকে ছাড়া পেয়ে। আমরা জানিনা বাংলাদেশের স্থপতি কোন দেশের পাসপোর্ট নিয়ে বৃটেন এবং ভারত গিয়েছেন এবং মাতৃভূমিতে পদার্পণ করেন। আদৌ কোন পাসপোর্টের দরকার ছিল কিনা অথবা পাসপোর্ট ছিল কিনা। কিন্তু একটি জিনিস ছিল তা হলো জয়বাংলা, সঙ্গে স্বয়ং বঙ্গবন্ধু। 

বৃটেনের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রি এডওয়ার্ড হিথ বিবিসি রেডিওতে বাংলায় কয়েকটি কথা বলেছিলেন পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে বঙ্গবন্ধুর বৃটেনে আগমন উপলক্ষে। সেখানে জয়বাংলা ছিল। জয়বাংলা কোনও দলীয় শ্লোগান নয়, কোনও দলের প্রবর্তিতও নয়, কোনও দলের বিরোধিতারও উপলক্ষ বস্তু নয়।  

জয়বাংলা কি শুধু শ্লোগান :

জয়বাংলা একটি জাতির অভ্যূদয় । ত্রিশ লাখ শহীদ,চার লাখ নারীর অবমাননা,এককোটি মানুষের ঘরবাড়ি ছেড়ে পাশের দেশে শরণার্থী হওয়া এ সবই একটি মাত্র শব্দবন্ধ জয়বাংলার মধ্যে ধারণ করা আছে। ইতিহাস সৃজনকারী জয়বাংলা একটি শব্দ বা শ্লোগান শুধু নয়। একটি মানুষের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ মানুষ হওয়ার ইতিহাস এই শব্দ ধারণ করে এবং একটি জাতির জন্মজয়ের যাবতীয় আনন্দ-বেদনা। 

জাতির সমস্ত বোধ আকাঙ্খা জয়বাংলার আবেগের মধ্যে নিহিত আছে। একটি নির্যাতিত জাতি, শোষিত জনগোষ্ঠীর বিশ্ব সংসারে অভূতপূর্ব আত্মসম্মানের বৈভব নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার আনুপূর্বিক ইতিহাস এই একটি মাত্র শব্দগুচ্ছে মিশে আছে। দীর্ঘ নয়মাসের চাপিয়ে দেয়া অসম যুদ্ধজয়ের ইতিবৃত্ত জয়বাংলা। 

শুধুমাত্র শ্লোগান হলে জয়বাংলা এতদিন টিকে থাকতে পারত না। পৃথিবীর অন্যান্য শ্লোগানের মত সময়ের উপযোগিতা হারিয়ে তা সাধারণ মানুষের মন ছেড়ে ইতিহাসের বইয়ের পাতায় স্থান করে নিত। কিন্তু জয়বাংলা কেবল শ্লোগান নয় তাই এখনও সমান প্রাসঙ্গিক যুগতিক্রম্যরূপে। 

জয়বাংলা প্রেরণাশক্তি কিভাবে ধারণ করে : 

বাংলাদেশ সৃষ্টির আগে তৈরি হয়েছিল পাকিস্তান নামে একটি অসম্ভব রাষ্ট্র। কিন্তু বাঙালি জাতির মহত্বে সেই রাষ্ট্র টিকেছিল প্রায় ২৫ বছর। সময় পরিক্রমায় পাকিস্তানের জাতীয় শ্লোগান বলতে ছিল হিন্দি-উর্দু মিলিয়ে ‘পাকিস্তান-জিন্দাবাদ অথবা পাকিস্তান-পায়েন্দাবাদ’। বিভাষী, বিজাতি এই শব্দসমূহের উচ্চারণ বাঙালির অন্তরজগতে কোনও আসন নিতে ব্যর্থ হয়েছে দীর্ঘ ২৫ বৎসরে। 

শুধু আনুষ্ঠানিক আচরনের অংশের বাইরে বাঙালির মননে, সংস্কৃতিতে তা কোনও প্রভাব ফেলতে পারেনি। যা মানুষের হৃদয়ের কন্দর থেকে. মর্মমূল থেকে উৎসারিত হয় না, তা মানুষের, সমাজের বা জাতির আবেগ প্রতিফলিত করে না। এই জিন্দাবাদ ধ্বনি বাঙালির কোনও আবেগই স্পর্শ করতে পারে নাই। এখনও পারে না, কোনও কোনও মহলের প্রাণঘাতি প্রচেষ্টার পরও তা অধরা, অসম্ভবই থেকে গেছে এবং যাবে। 

২৫ বছর পাকিস্তানের সময়কাল উদার বাঙালি জাতিকে শোষণ-বঞ্চনার কাল। ১৯৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধের মাধ্যমে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক পাকিস্তানি ধারার অবসান ঘটে। ১৯৬৯ এর ৪ জানুয়ারির আগে ‘জয়বাংলা’ ধ্বনি, শ্লোগান হিসেবে ব্যবহারের তেমন বিবরণ পাওয়া যায় না।

ইতোমধ্যে বাঙালির স্বাধিকার চেতনা পরিনত এবং ঐতিহ্য গর্বের সংকেতবাহী পদ্মা-মেঘনার সঙ্গে এই জাতি ততদিনে আত্মপরিচয় ঘোষণায় অকুন্ঠ। এই সময়েই বাঙালি তাঁর আত্মপরিচয় নির্মাণে জয়বাংলা শব্দবন্ধটি আবিষ্কার ও আত্মস্থ করে, যা ১৯৭১ এ মুক্তিযুদ্ধে অমিত তেজ,তিতীক্ষা ও বীরত্বের অফূরন্ত উৎস হিসেবে অভূতপূর্ব ভুমিকা পালন করে। ইতিহাস তাই সাক্ষ্য দেয়।

জয়বাংলার ইতিহাস :

জয়বাংলার অভ্যূদয় সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায় না। এই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, আবেগ স্বতোৎসারিত হয়।  কখনো দিনক্ষণ নির্দিষ্ট করে তার প্রকাশ ঘটে না। তবে জয়বাংলা বাঙালির অন্যান্য অবিসম্বাদিত শ্লোগানের সঙ্গে নিজস্ব হয়ে ওঠে ১৯৬৯ সনে। প্রথম আনুষ্ঠানিক ব্যবহার দেখা যায় ১৯৬৯ সনে ‘সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের’ ১১ দফা দাবীনামায়। 

এই বছরেই শেখ মুজিবকে জনতা জেলখানা থেকে মুক্ত করে প্রবল গণ আন্দোলনের দ্বারা। ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ বর্তমান সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ অভিধায় ভূষিত করে লাখো জনতার উপস্থিতিতে। সেদিন উপস্থিত জনতা  গগনবিদারী স্বরে জয়বাংলা ধ্বনিতে বঙ্গবন্ধু উপাধিকে স্বাগত জানায়। 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব- এর জাতির জনক হয়ে উঠার প্রকৃত বীজ তখনই উপ্ত হয়। পাকিস্তানি বন্দীদশা থেকে মুক্ত হওয়ার পর পৃথিবীর বিভিন্ন রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানগণ বঙ্গবন্ধুকে জাতির পিতা হিসেবে উল্লেখ করেন তাদের বার্তা ও বক্তৃতায়। কথায় আছে লোকে যারে বড় বলে বড় সেই হয়। বাংলাদেশের জনগণ ঘোষণা করার, সিদ্ধান্ত নেয়ার আগেই কিন্তু বাইরের দেশের লোকজন বঙ্গবন্ধুকে বাঙালি জাতির পিতা জ্ঞানে স্বীকার করে নেয়।

আমরা এখন বিষয়টি বিতর্কিত করে, প্রশ্নসাপেক্ষরূপে হীনমন্যতার নিদর্শন সৃষ্টি করছি। মীমাংসিত, সুপ্রতিষ্ঠিত প্রসঙ্গ বিতর্কিত হলে আত্মস্খলনের, নৈতিক অবক্ষয় এবং জাতীয় অনৈক্য সৃজনের অনুঘটকের তকমা ছাড়া ইতিহাসে অন্যকোন অবস্থান নির্দিষ্ট হয় না। 

দীর্ঘ নয়মাস জয়বাংলা ছিল সংগ্রামের প্রদীপ, যার আলোতে জাতি মুক্তির কঠিন যুদ্ধদিন জয় করেছে অকুতোভয়ে। পাকিস্তানি বাহিনীর বন্দুকের সামনে সাধারণ বাঙালিও জয়বাংলা ধ¦নি মুখে নিয়ে শত্রুর গুলিতে মরেছে।

 মৃত্যুভয়,গুলির ভয়, নিজের চোখের সামনে আরেকজনকে জয়বাংলা বলার কারনে গুলিতে মরার ভয়েও সাধারণ বাঙালি শত্রুর জিঘাংসার কাছে নত হয়নি, জয়বাংলা বলতে দ্বিধা করেনি। জয়বাংলা বলে চোখের সামনে থাকা মৃত্যু আলিঙ্গনে পিছপা হয়নি। মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধ-ইতিহাস পড়লে জানা যায়, প্রতিটি আক্রমণের উজ্জীবনী মন্ত্র ছিল এই জয়বাংলা ধ্বনি। 

জয়বাংলা ধ্বনি দিয়ে আক্রমণ শুরু করতো আবার যুদ্ধজয়ের পর আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে মুক্তিসেনার বুক চিড়ে বের হওয়া জয়বাংলা শুনেই বিজয়ের বার্তা পাওয়া যেত। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কাছে জয়বাংলা ছিল প্রচন্ড আতঙ্কের অপর নাম। জয়বাংলা ধ্বনি পাকিস্তানি সেনাদের মনে কাঁপন ধরিয়ে দিত। এ সবই ঐতিহাসিক সত্য এবং প্রমাণিত।

জয়বাংলা কেন প্রিয় হল বাঙালির : 

আমরা ইতিহাস পাঠ থেকে জেনেছি স্বপ্নের পাকিস্তানে বাঙালির জন্য সবই ছিল দুঃস্বপ্ন। রাষ্ট্রীয় বা জাতীয় অনুষ্ঠানে বাংলার কোনও ব্যবহার ছিল না। এই জিন্দাবাদ ধ্বনি বাঙালির কোনও আবেগ ধারণ, বরণ বা প্রতিফলন করেনি, করত না। অন্যদিকে জয়বাংলা মূলত এবং সর্বতোভাবেই বাংলা শব্দ। বাঙালি যা বুঝতে পারে, বলতে পারে অনায়াসে। 

এমন শব্দ যা বুকের গভীর থেকে উচ্চারণের সময় সমস্ত আবেগ ধারণ করে মুখ দিয়ে বেরিয়ে এসে ছড়িয়ে যায় ইথারে। যে ধ্বনির আবেগ সমস্ত সত্তা দিয়ে শ্রোতার অন্তরের গভীরে প্রবেশ করে, রক্তের কোষে কোষে সংক্রমিত হয়। পরক্ষণেই যা শ্রোতারও তদনুরূপ আবেগের অনিবার্য বাহন হয়ে প্রবলবেগে উচ্চারিত হয়, উৎসারিত হয়।

অন্যকোন শ্লোগান বা শব্দে এই আবেগের মোক্ষণ, ধারণ এবং নির্গমন বাঙালি এর আগে আর কখনও খুঁেজ পায়নি। আমরা লক্ষ করতে পারি যে, ষড়যন্ত্রমূলকভাবে তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষকরূপে প্রতিষ্ঠার যে চেষ্টা করা হয় যে ঘোষণার জন্য, সেই ঘোষণায়ও কিন্তু জিয়াউর রহমান জয়বাংলা উচ্চারণ করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের পক্ষে ঘোষণা পাঠ শেষ করেন।

জয়বাংলা বাঙালির প্রাণের কথা, বেঁচে থাকার স্পন্দন এবং জীবনের মন্ত্ররূপ জীয়ন কাঠি। পরবর্তীকালে বি এন পি চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে জয়বাংলাকে আওয়ামী লীগের দলীয় শ্লোগানরূপে চিত্রিত করতে। বি এন পি উপলদ্ধি করতে সক্ষম হয়নি জাতীয় মানসের ধারা। তারা দলীয় ও জাতীয় সূক্ষ্ম অনুভূতির জায়গাটির ফারাক নির্নয় করতে পারেনি। 

ব্রিটিশ ভারতে দেশপ্রেমমূলক কয়েকটি শ্লোগান এবং জয়বাংলা :

ঔপনিবেশিক শাসক ব্রিটিশের বিরদ্ধে ভারতবর্ষে আন্দোলনের প্রয়োজনে কিংবা স্বাধীন ভারতে অনেক রাজনৈতিক নেতা বিভিন্ন শ্লোগানের আমদানি ও প্রচলন করেছেন। সময়ের উপযোগিতার সাথে সাথে সেগুলো গুরুত্ব হারিয়েছে। মানুষের মন ছেড়ে তা ইতিহাসের বইয়ের পাতায় জায়গা পেয়েছে। যেমন বঙ্কিমের ‘বন্দে মাতরম’, নেতাজীর ‘জয় হিন্দ’, ভগত সিংয়ের ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’, গান্ধিজীর ‘কুইট ইন্ডিয়া’ প্রভৃতি। 

এগুলো ছাড়াও সর্বভারতীয় নেতাদের অনেকেই সময় ও উপযোগিতা বিবেচনা করে আরও শ্লোগান তৈরি করেছেন, কালের বিচারে যা স্থায়ী হয়নি। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ ছাড়াও আরও রাজনৈতিক দল ছিল, তারাও দেশের স্বার্থে ( কয়েকটি নির্দিষ্ট দল ব্যতীত ) , দলের পক্ষে নানা রকম শ্লোগান দিয়ে জনগনের মনে জায়গা খোঁজার চেষ্টা করেছেন । 

কাগমারী সম্মেলনে প্রদত্ত মাওলানা ভাসানীর বহুল চর্চিত ও উদ্ধৃত ‘ওয়ালাইকুমুস সালাম’ এই মুহুর্তে স্মরণীয়। ভাসানীর এই শ্লোগান নিয়ে রাজনীতির ইতিহাস প্রসঙ্গে যত আলোচনা হয়, পক্ষান্তরে তা বিন্দুমাত্র অভিঘাত জাগায়নি আন্দোলনের কোনও পর্যায়ে।

মানুষের মনে কোনও দাগ কাটেনি। অবস্থা বিচারে শ্লোগানের অন্তর্নিহিত তাৎপর্যের বাস্তব অবস্থা বিদ্যমান থাকার পরেও সাধারণ জনগণের কাছে তা গ্রহণযোগ্য হয়নি। হতে পারে তার অন্যতম কারণ এটিও সাধারণের মুখের ভাষায় নয়, বিদেশি আরবি ভাষায়। 

ইতিহাসে এমন আরও অনেক শ্লোগান রয়েছে কিন্তু কোনটিই জয়বাংলার মত শ্রেণী-ধর্ম নির্বিশেষে একান্ত আপনার আবার একই সঙ্গে সমগ্র জাতির আশা-আকাঙ্খার মূর্ত প্রতীক হতে পারেনি। এখানে জয়বাংলা সবিশেষ এবং নির্বিশেষ, উপমহাদেশে জয়বাংলার তুল্য দ্বিতীয় আরেকটি নেই।

সারা বিশ্বেও জয়বাংলার সমমানের আরেকটি শোলাগানের সন্ধান পাওয়া যায়নি। বলা যায় জয়বাংলা পৃথিবীর ইতিহাসে একমাত্র শ্লোগান যা একটি জাতি সৃজনে সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে। কালের বিচারে যার আবেদন চিরন্তন এবং কালোত্তীর্ণ।

জয়বাংলার পক্ষবিপক্ষ : 

বাংলাদেশে এক সময় বঙ্গবন্ধু, জয়বাংলা ইত্যাদি নিষিদ্ধ ছিল। প্রকৃত ইতিহাস আড়াল করে কয়েকটি প্রজন্মকে কৃত্রিম, নকল, মনগড়া, নিজেদের বাখানি করা ইতিহাস শেখানো হয়েছিল। জয়বাংলার বিরুদ্ধ পক্ষ সাধারণ মানুষকে বোঝাতে চেষ্টা করেছে, জয়বাংলা বাংলাদেশ কিংবা বাঙালির নিজস্ব নয়। ভারত থেকে আমদানি করা। তারা আবার সেই পুরনো ছুঁড়ে ফেলা জিন্দাবাদ ফিরিয়ে এনেছিল। 

জয়বাংলার বিরুদ্ধে যুক্তি হিসেবে দেখানো হত ‘জয়হিন্দ’ শব্দের সঙ্গে মিল রয়েছে জয়বাংলার। শাক দিয়ে মাছ ঢাকা যায় না পুরনো বাংলা প্রবাদ। দুটো শব্দের মধ্যে কথিত মিল থাকলেও তা সম্পূর্ণতই রূপগত, ধ্বনিসাম্যগত। আবেগ সঞ্চরণ, ধারণ, বরণ এবং প্রকাশ, কোনও ক্ষেত্রেই দুটো শব্দের মধ্যে মিল নেই। অর্থগতভাবে সাধারণ মিল থাকলেও তা এখন আর বিবেচ্য নয়।

জয়হিন্দ এখন কেবলই আনুষ্ঠানিক উচ্চারণে পর্যবসিত। পক্ষান্তরে জয়বাংলা এখনও সংগ্রামে, উদ্দীপনায় পূর্বের মতই প্রাণসঞ্চারী। ভাষাবিজ্ঞান একটি শব্দের মূলানুসন্ধানের মাধ্যমে ইতিহাস খুঁড়ে বের করে। জয়বাংলা তেমন একটি শব্দ, যা ইতিহাসের ¯্রষ্টা এবং নিয়ামক। জয়বাংলা নিজে যেমন ইতিহাস, তেমনি একটি জাতির ইতিহাস নির্মাতা। 

পৃথিবীতে জয়বাংলার ন্যায় শব্দ বিরল। কাজেই জয়বাংলার বিরোধিতা করে যা কিছু বলা হয়, তার সবই হীনমন্যতার পরিচায়ক, অভিসন্ধিমূলক অভিপ্রায়ে, অজ্ঞানতা কিংবা পরশ্রীকাতরতার নামান্তর। 

যে সময়ে জয়বাংলা শব্দের ব্যবহার শুরু হয় তখন এমন কোন কারণ ছিল না বা ঘটেনি, যার জন্য আমাদের হিন্দি শ্লোগান ধার করতে হবে। হিন্দির সঙ্গে গভীর কোন সখ্যতা বা ষড়যন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়নি । তাই হিন্দির জয়ধ্বনির সঙ্গে মিল অবশ্যই কাকতালীয়। মিল অমিলের ফলে তৎকালীন, সমসাময়িক বা ভবিষ্যত কোন বিশেষ সুবিধা বাংলাদেশ কখনো পায়নি বা পাওয়ার বাধ্যবাধকতা দিয়ে এই জয়ধ্বনি নির্মিত হয়নি। 

ভারতের সঙ্গে স্বাধীনতা পরবর্তীকাল থেকে পূর্বাপর সম্পর্ক দিয়েই তা সরলভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করা যায়।  ইতিহাস বড়ো নির্মম, কঠিন সত্যকে সময় মতো ঠিকই  সর্বপ্রকার প্রতিকুলতার আড়াল থেকে বের করে দেয়। 

সেই সময়কার ছাত্র, রাজনীতির কর্মি, সাধারণ মানুষ এখনও বাংলাদেশে যথেষ্ট সংখ্যায় জীবিত রয়েছেন, তাদের মাধ্যমে ভিত্তিহীন, মনগড়া এই অপবাদের সত্যমিথ্যা প্রমাণ করা যায় সহজেই। যাদের এতটুকু আত্মমর্যাদাবোধ আছে তারা অবশ্যই বিষয়টি বিরূপ দৃষ্টিতে বিচার করবে না। 

জয়বাংলার তিনকাল :

জয়বাংলা আদালতে কেন গিয়েছে, সে বিচারে না গিয়ে বরং বিচার করা উচিত কেন ৪৬ বছরেও জয়বাংলা যথাযোগ্য মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা পায়নি? শুধু কি জয়বাংলা ? জাতীয় জীবনে এমন বহু প্রশ্নের মীমাংসা বাকি রয়েছে।

আর কত ৪৬ বৎসর জাতিকে অপেক্ষা করতে হবে, প্রকৃত বাংলাদেশের সোনার রূপ দেখার জন্য? জয়বাংলার যারা সূর্যসন্তান, তারা এখনও জীবিত, তাহলে বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ কেন এগিয়ে যেতে যেতেও পিছিয়ে পড়ে? জয়বাংলা এককালে ছিল ন্যায্য দাবী আদায়, স্বাধিকার-স্বাধীনতা অর্জনের, জনতার ঐক্য গঠনের সার্থক ও অমোঘ অস্ত্র। 

অন্যকালে শত্রু নিধনের কলজেয় কাঁপন ধরানো সিংহনাদ, বিজয়ের আনন্দ প্রকাশের একমাত্র ধ্বনি, বিপদের সময় পারস্পরিক পরিচয় জেনে শত্রুমিত্র নির্ধারণের উপায়, আত্মপরিচয়ের গর্বিত প্রকাশ। আরেককালে জয়বাংলা নিষিদ্ধ ছিল মুখে উচ্চারণ করা। মুক্তিযোদ্ধাদের তাচ্ছিল্য করে বলা হতো মুর্গিযোদ্ধা। সেসব দিন গত হয়েছে। 

জয়বাংলা আবার তার স্বমহিমা নিয়ে ফিরে এসেছে নিজের সঠিক জায়গায়। কয়েকটি প্রজন্মকে ভুলের পর ভুল মন্ত্রে বশীভূত করার অপচেষ্টার অবসান হয়েছে। সত্যের জয়, জয়বাংলার জয় চিরদিনের। 

মৃত্যু পরবর্তী মুজিবকে নিয়ে আরো বেশি গবেষণা দরকার। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকা স¤পর্কে কিংবা বঙ্গবন্ধুর  নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা অথবা যাদের পক্ষে কমবেশি ভূমিকা রাখার সুযোগ ছিল তাদের সক্রিয়তা, নিষ্ক্রিয়তা ইত্যাদি বিষয়ে গবেষণা প্রকৃত সত্য উদঘাটনে  সহায়ক।  এ

কটি শব্দ নিজস্ব অর্থদ্যোতনা ছাপিয়ে কি করে একটি জাতীয় আকাক্সক্ষা ধারণ করে, জাতীয় মুক্তি আন্দোলনে মানুষকে সংশ্লিষ্ট করে, কঠিন আত্মত্যাগের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনে অসীম শক্তি যোগাতে পারে তা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বের প্রেক্ষিতে বিবেচনা না করলে অস¤পূর্ণ থাকবে। 

কবি ও শিক্ষাবিদ, karimreza9@gmail.com