শুক্রবার   ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯   আশ্বিন ৪ ১৪২৬   ২০ মুহররম ১৪৪১

পাঁচ কারণে চাপে শামীম ওসমান

প্রকাশিত: ২৮ নভেম্বর ২০১৮  

স্টাফ রিপোর্টার (যুগের চিন্তা ২৪) : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ সময় ছিলো বুধবার (২৮ নভেম্বর)। প্রত্যেকদল তাদের দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করে মনোনয়ন চিঠি দেয়ার পর স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে কারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন সেটিই ছিলো আজকের বিশেষ আকর্ষণ।

জেলার সবগুলো সংসদীয় আসনের মধ্যে মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন আলোচনায় নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা-সিদ্ধিরগঞ্জ) আসন। এ আসনে বড় দুই রাজনৈতিক দল বিএনপি ও আওয়ামীলীগ তাদের দলীয় প্রার্থীদের মনোনয়ন চিঠি দেয়ার কাজ আগে ভাগেই সেরে নিয়েছিলো। এ আসনে আওয়ামীলীগ প্রার্থী হিসেবে বর্তমান সাংসদ একেএম শামীম ওসমানকে মনোনয়নপত্র দেয়া হয়।

আর বিএনপির প্রার্থী হিসেবে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মামুন মাহমুদ ও সহসভাপতি শাহ আলমকে মনোনয়ন চিঠি দেয়া হয়।  তবে দুই দলেরই দুইজন মনোনয়ন বঞ্চিত হেভীওয়েট প্রার্থী নির্বাচন কমিশনের রিটানিং কর্মকর্তার কাছে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তাদের মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন।

বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য সাবেক সাংসদ মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। তার ভাষ্য, কেন্দ্রের কথানুসারেই তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছেন।

তবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন জাতীয় শ্রমিক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির শ্রমিক উন্নয়ন ও কল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক কাউছার আহমেদ পলাশ। তিনি এ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। আওয়ামীলীগ ও বিএনপির দুই স্বতন্ত্র প্রার্থীর মনোনয়নপত্র দাখিলের কারণে মূলত এ আসনে নির্বাচনের আগেই বেশ চাপে পড়ে গেলেন আওয়ামীলীগের প্রার্থী বর্তমান সাংসদ শামীম ওসমান।

ধারণা করা হচ্ছে, যদি শেষ অবদি এ দুজন তাদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার না করেন তবে শামীম ওসমানকে বিএনপির প্রার্থীর সাথে বেশ জোরেসোরে লড়তে হবে এ দুই স্বতন্ত্র প্রার্থীর সাথেই। 

শামীম ওসমান ১৯৯৬ সালে আওয়ামীলীগের টিকেটে এ আসনে এমপি নির্বাচিত হন। ওই নির্বাচনে প্রথমে মনোনয়ন দেয়া হয় গিয়াস উদ্দিনকেই। কিন্তু শেষ অবদি দল শামীম ওসমানকে বেঁছে নেয়। ফলে অভিমানে দল ছাড়েন গিয়াস উদ্দিন। বিএনপিতে যোগ দিয়েই নাটকীয়ভাবে ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হন।

সে নির্বাচনে প্রথমে বিএনপির মনোনয়ন দেয়া হয় সফর আলী ভূইয়াকে। কেন্দ্রের নির্দেশে সে নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন গিয়াস উদ্দিন। শেষ অবদি চূড়ান্ত প্রার্থী হয়েই নির্বাচনে শামীম ওসমানকে ৩২ হাজার ভোট ব্যবধানে হারান গিয়াস উদ্দিন।

সেই নির্বাচনে ফতুল্লায় ৩১ হাজার ও সিদ্ধিরগঞ্জে প্রায় ১ হাজার ভোট ব্যবধানে ভরাডুবি হয় শামীম ওসমানের। ফলে স্বতন্ত্র প্রার্থী হলেও নির্বাচনে যে শামীম ওসমান গিয়াস উদ্দিনের দিকে এক চোখ দিয়ে রাখবেন তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা।

শ্রমিক নেতা কাউসার আহমেদ পলাশ ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জে বেশ জনপ্রিয়। অষ্টম, নবম ও দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামীলীগের মনোনয়ন চেয়েছিলেন তিনি। দল তাকে দেয়নি এরপরেও অনুগত থেকে তিনি কাজ করে গেছেন।

বিশেষ করে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে আওয়ামীলীগ প্রার্থী চলচিত্র নায়িকা সারাহ বেগম কবরীর জন্য বেশ জোরেসোরে মাঠে নামেন। ওই নির্বাচনে কবরী বিজয়ী হন। এ আসনে এবারও হেভীওয়েট প্রার্থী হিসেবে পলাশ মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন।

মনোনয়নপ্রত্যাশী কথাটি তাঁর সাথে যুক্ত হওয়ার পরপরই নানা চক্রের ষড়যন্ত্রের স্বীকার হন পলাশ। তিনি বারবারই বলে আসছিলেন মনোনয়ন চাওয়ার কারণেই মূলত তার বিরুদ্ধে এসব অপপ্রচার করা হচ্ছে। সেসময় এ আসনের হেভীওয়েট অন্য কোন আওয়ামীলীগ নেতাই তার পাশে এসে দাড়াননি।

সহযোগিতা করেছেন জেলা ও মহানগর আওয়ামীলীগের সভাপতি। এমনকি নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন মেয়রেরও সমর্থন পান তিনি। তিনবার মনোনয়ন চেয়েও না পেলেও তেমন আক্ষেপ করেননি। তবে এবার স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিলকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা অন্যভাবে দেখছেন।

তাদের মতে, মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে ঘোষণা দেয়ার পর পরই তার উপর যেসব অপপ্রচার চালানো হয়েছে সেগুলোর সমুচিত জবাব দেয়ার জন্যই কাউছার আহমেদ পলাশ স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। এছাড়া তিনি যে এ সংসদীয় আসনে কতখানি জনপ্রিয় সেটিরও মাপকাঠি সবার সামনে ভোটের মাধ্যমে তুলে ধরতেই তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন।

যদিও মিডিয়ার সামনের তিনি মুখ খোলেননি। শুধু বলেছেন, এ আসনে আমি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছি, তাই মনোনয়নপত্র দাখিল করেছি। 

পলাশ স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার কারণে চাপ বাড়লো শামীম ওসমানের উপর। কেননা এ আসনে আওয়ামীলীগের একটি বিশাল অংশ কাউসার আহমেদ পলাশের অনুসারী। 

গিয়াস উদ্দিন ও পলাশ ছাড়া শামীম ওসমানকে বিএনপির মনোনিত প্রার্থীর দিকে চোখ রাখতে হবে বেশভালোভাবেই। যদিও এ আসনে এখনো চূড়ান্ত প্রার্থী ঠিক করেনি বিএনপি। তবে সেটি যে মামুন মাহমুদ কিংবা শাহ আলমের মধ্যে একজন হচ্ছেন তা নিশ্চিত। ফলে বিএনপির প্রার্থীর বিরুদ্ধেও শামীম ওসমানকে জয়ী হতে বেশ বেগ পেতে হবে। 

নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে আপত দৃষ্টিতে ভোটব্যাংক মূলত পাঁচভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়েছে। প্রথমত, এ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী গিয়াস উদ্দিনের একটি বিশাল ভোট ব্যাংক রয়েছে।

দ্বিতীয়ত  এ আসনে বড় অংকের ভোট ব্যাংক রয়েছে কাউসার আহমেদ পলাশেরও।

তৃতীয়ত, শামীম ওসমানের বলয়েরও কিছু ভোট রয়েছে, চতুর্থত, এ আসনে বিএনপিরও একটি ভোট ব্যাংক রয়েছে যা কিনা শাহ আলম কিংবা মামুন মাহমুদ যেই চূড়ান্ত প্রার্থী হবেন তার পক্ষে যাবে।

পঞ্চমত, এ আসনে নাসিকের জনপ্রিয় মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীরও বিশাল ভোট ব্যাংক রয়েছে। এমনিতেই চলতি বছরের ১৬ জানুয়ারি হকার ইস্যুতে নাসিক মেয়র ডা.আইভীর উপর হামলার ঘটনায় শামীম ওসমানের উপর নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে।

যদিও এখনো এ আসনে আওয়ামীলীগ প্রার্থী সম্পর্কে কোন মন্তব্য করেননি আইভী। ফলে এ জায়গাতেও শূণ্যে হাতড়াতে হবে শামীম ওসমানকে। ফলে নির্বাচনের আগেই বেশ চাপ নিয়েই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামতে হচ্ছে শামীম ওসমানকে।  

এই বিভাগের আরো খবর