সোমবার   ২৫ মে ২০২০   জ্যৈষ্ঠ ১০ ১৪২৭   ০২ শাওয়াল ১৪৪১

পদ পেতে নেতাদের কাদা ছোড়াছুড়ি

প্রকাশিত: ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০  

যুগের চিন্তা রিপোর্ট : একুশের প্রভাতফেরি শেষ করে শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক তখনো শেষ হয়নি, এরই মাঝে খবর এলো জেলা বিএনপির কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করেছে কেন্দ্র। ২০১৭ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি কাজী মনিরুজ্জামানকে সভাপতি আর অধ্যাপক মামুন মাহমুদকে সেক্রেটারি করে ২৬ সদস্যের আংশিক কমিটি দেয়া হয়েছিল। তবে এটুকু পর্যন্তই।


সাংগঠনিক কার্যক্রমে নিজেদের ব্যর্থতা বারবারই ফুটে তুলেছে ওই আংশিক কমিটি। জেলা বিএনপি ওই আংশিক কমিটি পারছিলো না কেন্দ্রের দাবি অনুযায়ী কাজ করতে অপরদিকে ব্যর্থ হচ্ছিল তৃণমূলের আশাআকাঙ্খার প্রতিফলন ঘটাতে। ক্রমাগত ব্যর্থতার দরুণ ওই আংশিক কমিটি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে কেন্দ্র ও তৃণমূল।


তবে শুক্রবার (২১ ফেব্রুয়ারি) বিএনপির সহ-দফতর সম্পাদক মুহাম্মদ মুনির হোসেন স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জেলা বিএনপির এই কমিটি বিলুপ্ত করার পর সমস্যা তৈরি হয়েছে আরেকদিকে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন উপজেলার বিএনপি নেতাদের সমর্থকদের মধ্যে পদ পেতে কাঁদা ছোড়াছোড়ি করছেন।


আংশিক কমিটিতে ছিলেন কাজী মনিরুজ্জামান। পুরোদস্তুর ব্যবসায়ী। সহসহভাপতি শাহআলমও ব্যবসায়ী। নির্বাচনে নমিনেশন না পেয়ে রাজনীতি ছাড়ারই ঘোষণা দিয়ে দিয়েছেন। তার ভায়রা সদর উপজেলা চেয়ারম্যান এড.আবুল কালাম আজাদ বিশ্বাস যাকে নিজ দলের নেতারাই সরকারি দলের সাথে আঁতাতের অভিযোগ তোলেন।


সহসভাপতি খন্দকার আবু জাফর তো একাদশ নির্বাচনে প্রকাশ্যে দলীয় মনোনয়ন নিয়ে আরেক সহসভাতি আযহারুল ইসলাম মান্নানের সাথে দ্বন্দ্বের চূড়ান্ত পর্যায়টি দেখিয়ে ছেড়েছেন। প্রয়াত হয়েছেন জান্নাতুল ফেরদৌস,  সদস্য আড়াইহাজার থানা বিএনপি’র সভাপতি বদিরউজ্জামান খান খসরু। সাংগঠনিক ও সহসাংগঠনিক পদে থাকা জাহিদ হাসান রোজেল, নজরুল ইসলাম পান্না, মাসুকুল ইসলাম রাজীব, উজ্জল হোসেন, অ্যাডভোকেট মাহমুদুল হাসান, রুহুল আমিন শিকদার কেউ নিষ্ক্রিয় আবার কেউ ফটোসেশনের রাজনীতি করেন।


সেক্রেটারি অধ্যাপক মামুন মাহমুদ, সহসভাপতি মনিরুল ইসলাম রবি, আব্দুল হাই রাজুও যেন সবসময় জ্বলে উঠতে পারেননা। তাল যে মেলাতে পারছিলেননা তা বোধ হয় টের পেয়ে গিয়েছিলেন সকলেই। আর তাই কেন্দ্র থেকে কমিটি বিলুপ্ত করার সিদ্ধান্ত আসার কয়েক মিনিট পরেই এই আংশিক কমিটির অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মন্তব্য করেছেন ‘আলহামদুলিল্লাহ’।


তবে কমিটি বিলুপ্ত হবার পরপরই শুরু হয়ে গেছে আরেক কাণ্ডকারখানা। জেলা বিএনপির কমিটিতে কে হচ্ছেন সভাপতি আর কে হচ্ছেন সেক্রেটারি তা নিয়ে শুরু হয়ে গেছে কথার যুদ্ধ, আক্রমন। কার শিক্ষাগত যোগ্যতা কেমন, কে দলের জন্য নিবেদিত প্রাণ আর কে বিশ্বাস ঘাতক না প্রমাণের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছেন নানা নেতার সমর্থকরা।


কেউ বিলুপ্ত কমিটির অনেককেই টেনে আনছেন সভাপতি, সেক্রেটারি হিসেবে, আবার কেউবা যাদের সভাপতি সেক্রেটারি হওয়ার আভাস ছিল তাদের টেনে আনছেন। সাংগঠনিক কাজে কে কতটুকু দক্ষতা দেখাতে পারবেন তার নিশ্চয়তা নেই, তবে আপাতত জেলা বিএনপির কমিটি বিলুপ্ত হওয়ায় জমজমাট রাজনীতি।  


কেউবা বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এড.তৈমূর আলম খন্দকারকে সভাপতি হিসেবে দেখতে চান। আবার কেউ দেখতে চান বিএনপির নির্বাহী কমিটির অন্যতম সদস্য সাবেক সাংসদ মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিনকে।


তবে অনেকে পার্থক্য দেখান একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন নিয়ে বিএনপির পাটি অফিসে ভাঙচুর, মিডিয়ায় নিজ দল নিয়েই সরগরম বক্তব্য দিয়ে নিজেকে সমালোচিত করেছেন তৈমূর। তবে নির্বাচনে লড়বার জন্য যুদ্ধে নেমেও দলের সিদ্ধান্তে সরে আসায় গিয়াস উদ্দিনের উজ্জল ভাবমূর্তি তাকে সামনে ঠেলে দিচ্ছেন সমর্থকরা।  

 

অভিযোগ ছিলো, টাকার বিনিময়ে অনেকে বিলুপ্ত আংশিক কমিটিতে স্থান পেয়েছিল। সেই আলোকে অনেকে কল্পনা করেন অধ্যাপক মামুন মাহমুদকে সরিয়ে হয়তো সেই ধারাবাহিকতায় আসতে পারে আজহারুল ইসলাম মান্নান। তবে এসব নিছক কল্পনা বলে সরিয়ে দেন আরেক নেতার সমর্থকরা।


তারা বলেন, নির্বাহী কমিটির সদস্য রূপগঞ্জের মোস্তাফিজুর রহমান দীপু ভূঁইয়া হচ্ছেন এবারের কমিটির সেক্রেটারি। আবার ছাত্রদলের সাবেক নেতাদের আশা বিলুপ্ত কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মাশুকুল ইসলাম রাজীব হচ্ছেন জেলার সেক্রেটারি।   

    
তৃণমূল চাইছে, কমিটির দায়িত্ব যাকেই দেয়া হয় সে যেন দলের কথা, কর্মীদের কথা বলেন। পদ কুক্ষিগত রেখে অনৈক্যে নারায়ণগঞ্জ বিএনপি রীতিমত ধুঁকছে। সাংগঠনিক দক্ষতা ও ত্যাগের নজির আছে এমন নেতাকেই যেন এবার দায়িত্ব দেয়া হয়।

 

রাজনীতির থেকে সবার চোখের সামনেই নীরবে অবসরে চলে যাওয়া অধ্যাপক রেজাউল করিমকে সভাপতি করলে যেমন দল চাঙা হবেনা, তেমনি সারা বছর ঢাকাতেই পড়ে থাকা কেন্দ্রীয় বিএনপির সহআন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক নজরুল ইসলাম আজাদ, ঢাকায় পড়ে থাকা আড়াইহাজার থানা বিএনপির সহসভাপতি ও বিলুপ্ত জেলা কমিটির সহসভাপতি মাহমুদুর রহমান সুমনকে দায়িত্ব দিলেও সাংগঠনিক তৎপরতা বাড়বেনা।


কর্মীদের কথা বলে, দলের কথা বলে, সাংগঠনিক কাজে আগ্রহী এমন নেতাই যদি পায় দল তবে নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপি হবে ক্ষুরধার। বিরোধ কমাতে অনেক নেতার দাবি মহানগর বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি এড.সাখাওয়াত হোসেন খানকে যাতে জেলার বড় পদে দায়িত্ব দেয়া হয় তবে তাতে নারাজ মহানগরের তৃণমূল। তারা বলছেন, সাখাওয়াত হল মহানগর বিএনপির প্রাণ, যতখানি মহানগর বোঝা যায় তা শুরু সাখাওয়াতের কল্যাণে।


এদিকে দলের প্রয়োজনে যেকোন দায়িত্ব পেলে তা পালন করতে আপত্তি নেই বলে জানিয়েছেন বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য সাবেক সাংসদ মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন। তিনি যুগের চিন্তাকে জানান, ‘আমি একটি রাজনৈতিক দল করি। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ আমাকে যখন যে দায়িত্ব দেবে আমি তাই পালন করবো। তবে দায়িত্ব নেয়ার জন্য আমি কোন প্রতিযোগিতা বা কারো বিরুদ্ধাচরন করতে রাজি নই।


যেখানে দল আমাকে কাজে লাগাবে, আমি সেখানেই কাজ করবো। দায়িত্ব পেলে আমি চেষ্টা করবো ছাত্রজীবন থেকে আমার যেই সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা তা কাজে লাগিয়ে দল ও নেতাকর্মীকে সেবা দেয়ার জন্য। এখানকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি সবার কাছে স্পষ্ট। জনসমর্থন আছে এমন দলের ঘুরে দাঁড়ানোর একমাত্র পথ সংগঠনকে দাঁড় করানো, আর আমি তাই করবো।’

 

এই বিভাগের আরো খবর