বৃহস্পতিবার   ২৩ মে ২০১৯   জ্যৈষ্ঠ ৮ ১৪২৬   ১৮ রমজান ১৪৪০

নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টির দায়িত্ব কার ?

প্রকাশিত: ১১ মার্চ ২০১৯  

৩০ ডিসেম্বর’১৮ অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের অনুসরণ ও অনুকরণের মধ্যে দিয়েই ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র পদে কথিত উপ নির্বাচন ২৮শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ তারিখে হয়ে গেল। ০১/৩/২০১৯ ইং তারিখে জাতীয় পত্রিকান্তরে উত্তর সিটি মেয়র নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বিভিন্ন মন্তব্য করেছেন। নির্বাচন কমিশনের একজন কমিশনার (মাহবুব) বলেছেন যে, “ডি.এন.সি.স’তে একটি অপূর্ণাঙ্গ নির্বাচন হয়েছে।” মোট ভোটার ৪ হাজার ৯শত ৭৭ অথচ ৪ ঘন্টায় ভোট পড়েছে ৮৬টি বলে জাতীয় পত্রিকা রিপোর্টিং করেছে।

 

জাতীয় পার্টির মনোনীত প্রার্থীর মতে “ভোটাররা নির্বাচন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন,” ডি.এম.পি কমিশনার বলেছেন যে, “ডিএনসিসি’তে ভোটারের উপস্থিতি কম ছিল,” শিক্ষামন্ত্রী (দীপু মনি) বলেছেন যে, “মেয়র পদে মেয়াদ কম বলে ভোটার উপস্থিতি কম ছিল”, অথচ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী (আসাদুজ্জামান কামাল) জোর গলায় বলেছেন যে, “সব কেন্দ্রেই ভোটারদের প্রচন্ড ভিড় ছিল।” দুই কেবিনেট মন্ত্রীর বক্তব্য যদিও পরস্পর বিরোধী তবুও বিষয়টি নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন নাই এই জন্য যে, যেহেতু জাতীয়ভাবে “মিথ্যা” জাতীয়করণ করা হয়েছে সেহেতু শপথ নেয়া পদধারীরা কে মিথ্যা বললেন বা কে সত্য বললেন তা নিয়ে জাতি এখন আর মাথা ঘামায় না বা জাতির কোন প্রকার মাথা ব্যাথা পরিলক্ষিত হচ্ছে না। তবে জনগণের মধ্যে চরম হতাশা ও তিক্ততার সৃষ্টি হচ্ছে।

 

নির্বাচন কমিশনের দন্ডমুলের সর্বোচ্চকর্তা প্রধান নির্বাচন কমিশনার ডিএনসিসি নির্বাচনের পরক্ষণেই বলেছেন যে, “বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটার আনার দায়িত্ব আমার না।” সিইসি’র কথাই যদি সঠিক হয় তবে কাঙ্খিত প্রার্থীকে ভোট দেয়ার জন্য ভোটারদের নিরাপত্তামূলক পরিবেশ সৃষ্টি করা কার দায়িত্ব ? এবং ভোটাররা যে ভোট দেয়া থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে এর ব্যর্থতা কার দায়িত্বের উপর বর্তায় ? 

 

জনগণের ট্যাক্সের টাকায় যারা স্বপরিবারে বিলাসবহুল গাড়িতে চড়ে, বাড়ি থেকে জনগণকে ভোট কেন্দ্রে আনার দায়িত্ব প্রধান নির্বাচন কমিশনের নাই বলে দাবী করার মত এতো বড় মূর্খতা সে পেলো কোথায় ? গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ-১১৯ মোতাবেক “নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব” নিম্নরূপ :

 

(১)  রাষ্ট্রপতি পদে ও সংসদের নির্বাচনের জন্য ভোটার তালিকা প্রস্তুতকরণের তত্ত্বাবধান, নির্দেশ ও নিয়ন্ত্রণ এবং অনুরূপ নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের উপর ন্যস্ত থাকিবে এবং নির্বাচন কমিশন এই সংবিধান ও আইনানুযায়ী (ক) রাষ্ট্রপতি পদের নির্বাচন অনুষ্ঠান করিবেন, (খ) সংসদ-সদস্যদের নির্বাচন অনুষ্ঠান করিবেন, (গ) সংসদে নির্বাচনের জন্য নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ করিবেন এবং (ঘ) রাষ্ট্রপতির পদের এবং সংসদের নির্বাচনের জন্য ভোটার তালিকা প্রস্তুত করিবেন।  


(২)   উপরি-উক্ত দফাসমূহের নির্ধারিত দায়িত্বসমূহের অতিরিক্ত যেরূপ দায়িত্ব এই সংবিধান বা অন্য কোন আইনের দ্বারা নির্ধারিত হইবে, নির্বাচন কমিশন সেইরূপ দায়িত্ব পালন করিবেন।

 

অধিকন্তু ১৯৯২ সালের ১লা ডিসেম্বর আফজল হোসেন বনাম প্রধান নির্বাচন কমিশনার মোকদ্দমায় সংবিধানের অনুচ্ছেদ-১১৯ এর ব্যাখ্যায় হাই কোর্ট ডিভিশন (রীট নং-৪০৪০/১৯৯২) মন্তব্য করেন যে,The Election Commission however must work within the framwork of the law made by Parliament concerning election matters and must not travel beyond the law and arrogate to itself powers not enjoined by law or act on fields prohibited by law but when the law is silent, not expressly providing a thing to be done or not to be done, the Election Commission has plenary power to act under Article 119 of the Constitution which is the reservoir of power for the Election Commission to act for the onward purpose of ensuring a free, fair and impartial election with expedition” (Reported in DLR 45 C 1993, Page-255).


 
অর্থাৎ সুষ্ঠ ও স্বচ্ছ নির্বাচনের জন্য আইনে কোথায় স্পষ্টতা থাকলেও সংবিধানের ১১৯ অনুচ্ছেদ মোতাবেক একটি সুষ্ঠ ও স্বচ্ছ গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশন যে কোন ক্ষমতা সংরক্ষণ করে। হাই কোর্টের উক্ত ব্যাখ্যা প্রতিবাদ করে কেউই এ পর্যন্ত চ্যালেঞ্জ করে নাই। 

 

অনুরূপ, ভারতে ১৯৭৮ ইং সনে মহিন্দ্র সিং বনাম প্রধান নির্বাচন কমিশনার, ভারত মোকদ্দমায় একটি নিরপেক্ষ, সুষ্ঠ, স্বচ্ছ, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার বিষয়ে ভারতীয় সংবিধানের অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যায় নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা ও দায়িত্ব সম্পর্কে নিম্নরূপ মন্ত্রব্য করেছেন। 

 

“The Supreme Court of India held that such an order under compulsion of circumstances can be saved under Article 324 holding that when the provisions of the Representation of People Act is silent without any direction on either way Article 324 is a reservoir of power for the Election Commission to act for the avowed purpose of pushing forward a free and fair election with expedition and the order of the commission was upheld” [Reported in AIR 1978(S.C.) 851]. 


 
একটি সুষ্ঠ, গ্রহণযোগ্য, স্বচ্ছ নির্বাচনের প্রধান অংশীদার হলো ভোটার। ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত করার দায়িত্ব যদি সিইসির না থাকে বা তিনি যদি দায়িত্ব নিতে না পারেন তবে শপথ বাক্য পাঠ করে তিনি কেন এ দায়িত্বে বসে সকল মজা লুটছেন ? সংবিধানের তৃতীয় তফসিলের ১৪৮ অনুচ্ছেদের ৭ উপ অনুচ্ছেদ মোতাবেক সিইসি যে শপথ বাক্য পাঠ করে দায়িত্ব গ্রহণ করেন তা নিম্নরুপ :


“আমি, ............, প্রধান নির্বাচন কমিশনার (বা ক্ষেত্রমত নির্বাচন কমিশনার) নিযুক্ত হইয়া সশ্রদ্ধচিত্তে শপথ (বা দৃঢ়ভাবে ঘোষণা) করিতেছি যে, আমি আইন-অনুযায়ী ও বিশ্বস্ততার সহিত আমার পদের কর্তব্য পালন করিব। আমি বাংলাদেশের প্রতি অকৃত্রিম বিশ্বাস ও আনুগত্য পোষণ করিব, আমি সংবিধানের রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তাবিধান করিব এবং আমার সরকারী কার্য সরকারী সিদ্ধান্তকে ব্যক্তিগত স্বার্থের দ্বারা প্রভাবিত হইতে দিব না।”

 

বাড়ি বাড়ি থেকে ভোটার আনার দায়িত্ব নাই বলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) মূর্খের মত শুধু অদায়িত্বশীল কথা বলেন নাই, বরং তিনি সংবিধান লংঘন ও শপথ ভঙ্গ করেছেন। অদায়িত্বশীল কথা বলে নিজের ব্যর্থতার সাফাই গাওয়া যায়, কিন্তু জনগণের আস্থা অর্জিত হয় না, বরং যাদের টাকা (জনগণ) আমলাদের ঠাটবাট চলে তাদের সাথে নিঃলজ্জ তামাশা করা হয়। দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় জোর দাবী উঠেছে, কোন দিন যদি ব্যক্তির শাসনের চেয়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় তবে নিশ্চয় সংবিধানিক চেয়ারে বসে সংবিধান বিরোধী কথা বলার জন্য জবাবদিহিতার আওতায় আসতে হবে। তবে এ দিনের জন্য জনগণের বাস্তবসম্মত ভূমিকা দরকার। 

 

এ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার 


লেখক : কলামিষ্ট ও আইনজীবি (এ্যাপিলেট ডিভিশন)   
মোবাঃ ০১৭১১-৫৬১ ৪৫৬
E-mail: taimuralamkhandaker@gmail.com  

এই বিভাগের আরো খবর