বুধবার   ২১ আগস্ট ২০১৯   ভাদ্র ৬ ১৪২৬   ১৯ জ্বিলহজ্জ ১৪৪০

নিরেট প্রেমের কাব্যায়ন

প্রকাশিত: ১২ মে ২০১৯  

মানুষ স্বপ্নের চাষ করে। কবিরা চাষ করে স্বপ্নের। কবিরা চাষ করে মানবতার। আল মাহমুদের ভাষায়-কবিরা স্বপ্নদ্রষ্টা। তাই যদি হয় কবিতা হবে মানুষের মনের খোরাক।


আবার আমরা এও দেখি-সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কবিতা আবিষ্করে বলেন, প্রেমে পড়ো, মদ খাও। প্রেমের ব্যর্থতা থেকে কবিতা লিখো। এ কথার আমি ঘোর বিরোধিতা করে আসছি। ব্যর্থতার স্বপ্নের চেয়ে সফলতার স্বপ্ন বেশি শক্তিশালী হয়। 


সব কবিই প্রেমিক। প্রেমহীনে কবিতা হয়নি। প্রেম কবিতাকে এনে দিয়েছে নৈসর্গের লাস্যতা। প্রেম অলৌকিক  বস্তুর সমন্বয়ও বটে। প্রেম এক জাগতিক সোহাগের বাহন যেমন তেমনি প্রেম ঐশ্বরিক এক বিনোদনের মাধ্যমও বটে। কবিরা সাধারণত ভোগ অথবা উষ্ণতার স্বপ্নই দেখাতো। কিন্তু কবিরা যখন শব্দের মাধ্যমে মানুষের স্থায়ী ভালবাসার স্বপ্ন যেমন আঁকেন তেমনি দেখাতে চান তার প্রেয়সীর উপশমতা। এটাই বাস্তবতা। যদি হয় কবির কবিতায় প্রেয়সীর আজন্ম সুস্থতার কথা তখন কবিতা হবে ঔষুধ পথ্য। কবি হবে ভালবাসা ।


কবির ভাষায়- তোমার শরীর থেকে মুঠো মুঠো কুড়িয়ে নেবো সুখ / যাদুর ছোঁয়ায় ঘোচাবো তোমার আজন্ম অসুখ ! কতো নির্ভরতার কথা তার প্রেয়সীকে বলছেন। সে কবি হচ্ছে আমার বন্ধুবর কবি, গল্পকার ও প্রাবন্ধিক রাকিবুল রকি।

 

বানু, ওবানু, আঁই যাইয়ুম ঢাকার শহর তোয়াঁরলাই আইন্নুম কী ! একটি সিনেমার গান পাঠক, ভক্তসকল যেভাবে মনের কুঠুরিতে স্থান দিয়েছেন তার কারণ প্রেমের একটা নিদর্শন। প্রেমহীন জীবন আমার কাছে জড়পদার্থের চেয়ে খারাপ মনে হয়। প্রেমের কিসিম যেমন আছে তেমনি প্রেমের বলীয়ান হওয়ার শর্তও আছে। সময় ও যাপনের ভেতর প্রেম হয়ে যায় মানুষের বেঁচে থাকার অবলম্বন। প্রেমে টিকে থাকে স্বপ্ন। স্বপ্নরা বাঁচিয়ে রাখে কৃতদ্বার অথবা ভাগ্যের অন্বেষণ। 


একজন কবি আর একজন মানুষ দুটো ভিন্ন আয়তনের হলেও এক জগতের বাসিন্দাও বটে। সেখান থেকে দুজনে বের হয় দুরকম বাহনের হাত ধরে। এটাই স্বাভাবিকতার অন্তরাল।কবি যখন আপনালয়ে তার প্রেয়সিকে ধারণ করেন ভেতরের সবটুকু করে তখন সেটি হয়ে যায় সাধারণের বুলি অসাধারণ প্রকরণে। কবি মাত্রই রূপ বর্ণানার শিল্পকারিগর। কবির বয়ন শক্তি কবিকে নিয়ে যায় প্রেম বাগানের মধ্যখানে। যেখানে আজব বিশ্বের আজব গল্পের মতো রাক্ষুস আর রাক্ষুসি বসে আছে গ্রহণায়নের সুধা দিতে।

 

পৃথিবীকে শোনাব আজ /শরীরে শরীরে বেঁজে উঠা /অশ্রুত সিম্ফনী /সো সোনা আর সহে না /চর্মে চর্মে / সুখের শতকিয়া গুণি।
কী চমৎকার ঢঙে প্রেয়সীকে গ্রহণের বাণী শোনাচ্ছেন। পাঠক মাত্রই মুখে মুখে রটে নিবে প্রেমের কাহিনী। লুফে নিবে জাগতিকতার আস্তরণ। বিছিয়ে দিবে বোগলে আগলে রাখা শব্দকলার সামিয়ানা। ভেতরের বয়ন থেকে বের হয় দ্যুতি আর স্বপ্নস্ফূরণ। বহুরূপী দুনিয়ার ভোগবাদিতার অন্তরালে ত্যাগের মহিমায় টিকে থাকে প্রেমাঞ্জলি। মোহে বেড়ে যায় আকর্ষণ। বিপরীত মেরুকরণ থেকে সব কিছুর যেমন চিন্তন হয় তদ্রুপ কর্ষণের ক্রিয়ায় বেড়ে উঠে কাব্যপাঠের সুখস্মৃতি। কবি যখন ভেতরের পর্দা খোলে মেলে ধরেন শব্দের কারুকাজ। কবির ভাষায়
ইচ্ছে হলে মেঘের হুলে গেঁথে দিও বুক /বিষে বিষে ভরে দিও শরীরের রোম-কূপ /চোখে সীমা ছেড়ে শুধু দূরে /যেও না প্রিয় /কষ্ট যদি দিতেই চাও কাছে এসেই দিও ( হৃদয় তল্লাট)

 

কবি প্রেয়সীর সীমানায় উজাড় হতে হতে হৃদয়ে গেঁথে যেতে চান বেঁচৈ থাকার অর্ঘ্য নিয়ে। প্রেম ভাঙ্গতে জানে সীমানা প্রাচীর। টানতে জানে গাধার চেয়ে ভারী বহণকারী বোঝা। তবু প্রেমিক পুরুষের ভেতরের শক্তি জানান দিতে প্রেয়সিকে কতভাবেই না আবেদন করে। স্বপ্নের ডুব সাগরে নিতে চায় শামুকের খোলস খোলে ঝিনুক নিতে। ঝিনুক পেতে যে বসন্তের উষা থেকে গ্রীষ্মের জ্যৈষ্ঠায়ন পর্যন্ত অপেক্ষার প্রহর গুণতে হয় সেটা অনেক সময় প্রেমিক পুরুষ মানতে অপারগ। কবি তখন দৃঢ়তার সহিত ঘোষণা করেন প্রেয়সীর কাছে ঠিক এভাবে -
যাবো যুগল স্বর্গে তোমার / আগ্নেয়গিরি হতে নেবো সুখ / হবো কাদামাটি দু'জনে / কাঁপবো ভূকম্পনে /জানবে না কেউ এতটুক। (২আগস্ট, ২০০৯)

 

কবিরা প্রেম পিয়াসী যেমন হয় তেমনি সময় ও সমাজ সচেতনও হতে হয়। কারণ কবিরা যে সমাজের মানুষও বটে। সমাজবদ্ধ জীবও বটে। ফলে সমাজের সঙ্গ অনুসঙ্গের সাথে কবিকে যেতেই হয়। ভাবতেই হয়। এ ক্ষ্রেত্রে আমাদের কবি রাকিবুল রকি সমাজের যাচিত-অযাচিত অনেক বিষয় এড়িয়ে গিয়ে একান্ত নিজের ভুবনের পরিধি নিয়েই থাকতে চেয়েছেন। না, সেক্ষেত্রে কবি স্বার্থবাদীতার কাতারে নিশ্চিত পড়বেন। তবে এও ঠিক এ সময়ের অযাচিত বিষয় নিয়ে ভাবতে গেলে কবিরা পড়ে যান রাষ্ট্রযন্ত্রের রোষানলে।

 

তারপরও কবিদেরকেই বলতে হবে। এ শক্তি একমাত্র কবি ও লেখদের আছে। তবে কবিদের উপমা আর রূপকতার শক্তিতেই সম্ভবতা বেশি হয়।

 
কবির কাজ কবিতায় ছন্দ, অন্তমিল, উপমা, অনুপ্রাস এবং শিল্পের রুপায়নে শব্দের গাঁথুনি সুচারুভাবে দিতে পারা। এমনতর শক্তিতে কবি যখন সফল হবেন তখন প্রেমের কবিতার লাইনগুলো যে কোন কবিকে জায়গা ছেড়ে দিতে বাধ্য হবে। আমাদের কবি রাকিবুল রকির কিছু সুখপাঠ্য পদাবলি অথবা অন্তরাগুলো কবিকে স্থান দিতে বাধ্য হয়েছে বাংলাসাহিত্যের আঙ্গিনায়। 


তোমার অরণ্যে হারিয়ে যাবো / জানবে না তো কেউ / মধ্যরাতে আনবো ডেকে /সাত সাগরের ঢেউ অথবা তোমার স্তনের উপমা পারে নি দিতে নির্মলেন্দু গুণ / আমি শুধু বলবো, তোমার যুগল স্তন জীবনের নুন।

 

এরকম অসংখ্য সুখপাঠ্য স্তবক কবিকে মুখে মুখে রাখবে পাঠকের মাঝে। এ কবি গদ্যকবিতায় ছন্দ ব্যবহারে যে তালের পরিচয় দিয়েছেন তাতে বুঝা যাচ্ছে ছন্দজ্ঞান কবির আত্মস্থ। আর এটাই হওয়া উচিত। এখনকার সময়ে অনেকে আবার কবিতায় ছন্দ মানতে নারাজ। তারা নাকি প্যাটার্ন ভাঙ্গতে চায়। প্যাটার্ন ভাঙ্গতে হলেও ছন্দজ্ঞানের বিকল্প নেই। সেরকম একটি গদ্য কবিতার ছন্দ ও অন্তমিলে দেখি আমরা

 

এমনই আষাঢ় নামতো একদিন বিদ্যাপতির নোটবুকে / জানে তা রাধার নীলাভ আঁচল / তুমি জানো না, জানবে না,আজও বৃষ্টি মেয়ে / মলিন করে দেয় কত প্রতীক্ষারত চোখের কাজল। (আষাঢ়বার)

 

কবি মাত্রই প্রেমিক পুরুষ। জাগতিকতার ভেতর বাহির কবিরা লালন করেন বহুরপ্রেয়সীকে। এ জায়গায় এসে সাধারণ পাঠক কবিকে মিথ্যাবাদি বানাতে বসে যান। কবির কবিতায় প্রেম নেই তবে প্রেয়সী থাকবেই। শব্দ আর বাক্যের ঘোড়দৌড়ে প্রেয়সির সীমানাপ্রাচীর হয়ে ওঠে আহত পাখির ডানা ঝাপটানোর মতো। কবি তুলে রাখেন হাতপাখার মতো সেল্ফের কার্নিশে। তখন পাঠক তথা প্রেমিক পুরষ মাত্রই বিরহের সুরে জ্বলতে থাকেন নিয়মের সূতিকা ধরে। আর আমাদের এ কবি প্রেমের ভাঙ্গনের জায়গায় উদার জমিনে যে চাষ বপন করেছেন তাতে করে আমাদের প্রজন্মরা আশাবাদিতার বাগানে চাষ করতে সাহস যেমন পাবে তেমনি প্রেমের নতুন এক জগৎ সৃষ্টি হবে।

 

সাহিত্যে এযাবৎ কালে প্রেমের বাক্য বুননে ইমরুল কাইয়েসকে কেউ অতিক্রম করতে পারছে বলে আমার মনে পড়ছে না। দেশীয় কবিদের মধ্যে মহাদেব সাহা ও হেলাল হাফিজের কবিতা বিরহকে লালন করা বলতেই হয়। এ দুজনের কবিতার নৈরাশ্যতার নায়িকারা বিরহের আঘাত বয়ে চলেছে। অনেকের কবিতা তাই বহণ করে টিকে আছে পাঠক হৃদয়ে।


পিয়ানোর সুরের মতো দ্যুতি ছড়িয়ে কিছু বাক্য কবি রাকিবুল রকিকে বাঁচিয়ে রাখবে স্বপ্নের বাগানে। কবির বুকের পাটা যেমন বড় তেমনি শক্ত। আবার দৃঢ়তাও আছে। তাই প্রেয়সিকে বলেন-যেতে চাও, যাও, যতদূর খুশী /আমি জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে / লিখেছি খোদাই করে-ভালোবাসি / আমার ভালোবাসার সীমা ছেড়ে / যাবে কত দূর? / মান ভেঙ্গে এসো কাছে, পায়ে পরো / প্রেমের নূপুর। (যেতে চাও, যাও)


এ রকম বাক্য পাঠে নির্দ্বিধায় বলা যায় এ কবি আশায় বাসা বাঁধা এক প্রেমিক পুরুষ। ভূগোলে প্রেমের পরিমাপের চেয়ে কবির হৃদয়ের উচ্চাশা কবির কবিতায় খুঁজে পাই। যাপিত জীবনের অংশে কবি বিশ্বাসী লালন করা মায়াবী পুরুষ।


‘পৃথিবীর প্রান্ত ধরে হাঁটতে হাঁটতে, তোমার থেকে দূরে যেতে যেতে, হয়তো কখনও কোন নদীর মোহনায় পেয়ে যাবো অবিকৃত তোমায়।’ 
চমৎকার চিত্রকল্পের হাতে উপমা তুলে দিয়ে শব্দগুলো বানিয়ে ছাড়লো আগলে রাখা কবিতা। কবিতার পাত্রে কবির ঢেউ উথলে ওঠে কবিকে জানান দিতে বসে আছে ‘তুমি হাসলে সূর্যটা কেমন মন খারাপ করে নিভে যায়।’

 

আসলে তাই। প্রেয়সীর হাসিতে লুকিয়ে থাকে বেঁচে থাকার এক অর্ঘ্য। কবি প্রেমকে এমনভাবে আলিঙ্গন করেছেন যেভাবে প্রেমিক পুরুষরা প্রেয়সীকে ঘরে তুলে আঁচলে বেঁধে রাখেন সুখস্মৃতির এক তৃপ্ত মোহনায়। কবিরা বেঁচে থাকেন প্রেম আর স্বপ্নের সোহাগায়। তদ্রুপ কবি আপনি বেড়ে উঠুন আপনার কবিতার মতো-তুমিও মানুষ, তাই ঋণী হতে তোমার কাছে বারবার ফিরে যাই।

 

মোস্তফা হায়দার
লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক