সোমবার   ২৫ মে ২০২০   জ্যৈষ্ঠ ১১ ১৪২৭   ০২ শাওয়াল ১৪৪১

নিউমোনিয়া হলে কী করবেন?

প্রকাশিত: ২২ এপ্রিল ২০২০  

ছবি: সংগৃহিত

ছবি: সংগৃহিত

স্বাস্থ্য ডেস্ক: ফুসফুসের এক ধরনের ইনফেকশনের নাম নিউমোনিয়া। এটি সাধারণত শ্বাসতন্ত্রের প্রদাহের জন্য হয়ে থাকে, যা ইংরেজিতে বলা হয় রেসপাইরেটরি ট্রাক্ট ইনফেকশন (Respiratory tract Infection)। এই প্রদাহ যখন জীবাণুঘটিত বা সংক্রমণজনিত হয়ে রোগ তৈরি হয়, তখন এটিকে নিউমোনিয়া বলে।


ফুসফুসের এ অসুস্থতা রাতারাতি চলে যায় না। এ অবস্থা থেকে সুস্থ হতে এক সপ্তাহ থেকে এক মাস লাগতে পারে। আপনি হয়তো ইতোমধ্যে জানেন যে, কোভিড-১৯ বা নতুন করোনাভাইরাস সংক্রমণেও এক ধরনের নিউমোনিয়া বিকশিত হয়।


ফুসফুসে প্রদাহের উল্লেখযোগ্য লক্ষণ হচ্ছে
* কাশি, উচ্চ জ্বর-ঘাম নিঃসরণ-কম্পন সৃষ্টিকারী ঠান্ডা অনুভূতি।* শ্বাসকষ্ট, দ্রুত ও অগভীর শ্বাসক্রিয়া। * তীব্র বা খোঁচানো বুক ব্যথা যা গভীর শ্বাস নিলে বা কাশলে আরো বেড়ে যায় * ক্ষুধামান্দ্য-শক্তির ঘাটতি-ক্লান্তি * শিশুদের বমিভাব ও বমি। * বয়স্কদের বিভ্রান্তি।


সাধারণ নিউমোনিয়ার ঘরোয়া সমাধান দেয়া হলোঃ


পানি, চা ও স্যূপ: সুস্থ থাকলেও শরীরকে হাইড্রেটেড রাখতে একজন মানুষের প্রচুর তরল জাতীয় খাবার খেতে হয়। কিন্তু অসুস্থ অবস্থায় এর গুরুত্ব বহুগুণে বেড়ে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, তরল জাতীয় খাবার ফুসফুসের শ্লেষ্মা বের করে দিতে সাহায্য করে। এ সময় পানি, উষ্ণ চা ও মুরগির স্যূপ ভালো অপশন হতে পারে। ক্যাফেইন ও অ্যালকোহল থেকে বিরত থাকুন। এগুলো শরীরকে ডিহাইড্রেটেড করতে পারে।


লেবু ও মধু: কাশি আসলে লোকজনের প্রবণতা হচ্ছে কাশির সিরাপ সেবন করা। কিন্তু এটা মনে রাখতে হবে যে, কাশি হলো এমন একটা প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে শরীর ফুসফুসের শ্লেষ্মা বের করে দিতে চেষ্টা করে। তাই কাশির সিরাপ ছাড়াই চলতে পারলে ভালো। কিন্তু কাশির মাত্রা বেশি থাকলে হালকা ডোজে সিডাটিভ কাশির সিরাপ সেবন করতে পারেন অথবা লেবু ও মধুর মিশ্রণ পান করতে পারেন।


ব্যথার ওষুধ: ব্যথা ও জ্বরে ভুগলে আইবুপ্রোফেন ও প্যারাসিটামলের মতো ব্যথানাশক ওষুধ সহায়ক হতে পারে। কখন কতটুকু সেবন করতে হবে নিশ্চিত হয়ে নিন। চিকিৎসকে কোনো অ্যান্টিবায়োটিক দিলে তা কোর্স শেষ না হওয়া পর্যন্ত চালিয়ে যেতে হবে, এমনকি ভালো অনুভব করলেও। অন্যথায় নিউমোনিয়া ফিরে আসতে পারে।


গরম ভাপ: শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হলে গরম ভাপে আরাম পেতে পারেন। কুসুম গরম পানিতে একটি কাপড় ভিজিয়ে কপাল বা ঘাড়ের ওপর ২০-৩০ মিনিট রেখে দিন। এটি বাইর থেকে শরীরকে শীতল করবে।


সঠিকভাবে কাশি দেয়া: প্রচুর কাশি আসলে সঠিকভাবে কাশলে সর্বোচ্চ উপকার পেতে পারেন। চেয়ারে বসে সামনে অল্প ঝুঁকে একটি টিস্যু পেপারে কয়েকবার জোরে কাশুন। বিশ্রাম নিয়ে আবার কাশুন। কাশি দেয়ার সময় ব্যথা পেলে পেটে একটি বালিশের চাপ দিলে সহায়ক হতে পারে।
বাষ্প স্নান: আর্দ্র বাতাসে শ্বাস নিলে ফুসফুসের শ্লেষ্মা আলগা হতে পারে। এ উপকার পেতে বাষ্প স্নান করতে পারেন। যেহেতু সবসময় বাথরুমে থাকতে পারবেন না, তাই বাতাসে আর্দ্রতা বাড়াতে ঘরে একটি হিউমিডিফাইয়ার চালু রাখতে পারেন। আর্দ্রতার সঠিক মাত্রা বজায় রাখতে হিউমিডিফাইয়ারের নির্দেশিকা অনুসরণ করুন।


হলুদ: দক্ষিণ এশিয়ায় শতশত বছর ধরে শ্বাসপ্রশ্বাসের সমস্যা, ক্লান্তি ও ব্যথার চিকিৎসায় এ মসলাটি ব্যবহার হয়ে আসছে। গবেষণায় দেখা গেছে, সংক্রমণ ও নিউমোনিয়া উপশমে হলুদ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। হলুদের সাপ্লিমেন্ট অথবা হলুদের চা চেষ্টা করে দেখতে পারেন। কিন্তু সতর্ক থাকবেন যে অত্যধিক হলুদ খেলে পেটের অবস্থা খারাপ হতে পারে। এছাড়া আপনি অন্যকোনো ওষুধের ওপর থাকলে তার ওপর হলুদ নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে কিনা জানতে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বললে ভালো।


বিশ্রাম নেয়া: এটা হচ্ছে বিশ্রাম নেয়ার প্রকৃত সময়। নিউমোনিয়ার সঙ্গে লড়তে শরীরের পর্যাপ্ত বিশ্রামের প্রয়োজন হয়। এসময় সকল প্রকার কাজ থেকে বিরত থাকুন। একটু ভালো অনুভব করলেই পুরো দমে কাজ করার চেষ্টা করবেন না, অন্যথায় নিউমোনিয়া প্রত্যাবর্তনের সুযোগ পেতে পারে।


ধূমপান বর্জন: ধূমপানে নিউমোনিয়ার উপসর্গ আরো শোচনীয় হতে পারে। তাই ধূমপান পরিহার করুন অথবা ধূমপানকারী থেকে বিরত থাকুন। ধূমপান কখনোই ফুসফুসের জন্য ভালো নয়। এ অভ্যাসে ভবিষ্যতে নিউমোনিয়া বা অন্যান্য ফুসফুস সমস্যার ঝুঁকি বাড়ে। এছাড়া আগুনে পরিবেশ আরামদায়ক হলেও দূরে থাকা উচিত, কারণ এর ধোঁয়াও ফুসফুসের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।


ফুসফুসের ব্যায়াম: নিউমোনিয়ার সময় ব্রিদিং এক্সারসাইজ তথা ফুসফুসের ব্যায়াম ফুসফুসের কার্যক্ষমতা বাড়াতে পারে। পাঁচ থেকে ১০ বার গভীর শ্বাস নিন, তারপর দুই থেকে তিন বার জোরে কাশি দিন। এতে ফুসফুস থেকে কিছু শ্লেষ্মা বের হয়ে আসবে। অথবা ধীরে ধীরে গভীর শ্বাস নিন। চেষ্টা করে দেখার জন্য আরেকটি এক্সারসাইজ হচ্ছে, স্ট্র দিয়ে এক কাপ কুসুম গরম পানি ধীরে ধীরে পান করা।


শিশুকে নিউমোনিয়া থেকে বাঁচাতে করণীয়-


১. নিউমোনিয়ার কিছু ভ্যাকসিন বের হয়েছে। ভ্যাকসিনগুলো যদি সময়মতো নেওয়া যায়, তা হলে ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাসজনিত নিউমোনিয়া প্রতিরোধ করা যায়। তবে অবশ্যই ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করতে হবে।

২. হাঁচি-কাশি আক্রান্ত লোকের সামনে থেকে শিশুদের দূরে রাখুন। সব সময় ধুলাবালি থেকে দূরে রাখতে হবে।

৩. সব সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখাতে হবে। বাইরে থেকে এসে হাত-মুখ সাবান দিয়ে ধুয়ে ফেলা। এ ছাড়া খাবার খাওয়ার আগে অবশ্যই হাত ধুতে হবে।

৪. শীতকালে নিউমোনিয়ার প্রকোপ বেশি থাকে। শিশুকে ভিড়ের মধ্যে অর্থাৎ বেশি লোক সমাগমের মধ্যে যেতে না দেওয়া। যেমন- শপিংমল, সিনেমা হল, বাস ইত্যাদি এড়িয়ে চলা।

৫. বয়স ছয় মাসের কম এমন শিশুরা যদি বুকের দুধ পান করে, তবে সে নিউমোনিয়ার জীবাণু অনেকটাই প্রতিহত করতে পারবে। যে শিশুর বয়স ছয় মাসের বেশি, তাদের যদি বুকের দুধের পাশাপাশি বাড়তি খাবার হিসেবে দেশীয় খাবার, যেমন- খিচুড়ি, দেশি ফলমূল, শাকসবজি খাবারের মাধ্যমে শিশুর পুষ্টি ঠিক রাখা যায়। তবে নিউমোনিয়ার জীবণু প্রতিহত করার ক্ষমতা আরও বাড়বে।

৬. শিশু যদি অপুষ্টিজনিত রোগে আক্রান্ত হয়, ঘন ঘন নিউমোনিয়া হয়। তাই শিশুর পুষ্টির দিকে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে।

৭. শীতে শিশুকে নিউমোনিয়ার হাত থেকে বাঁচতে গোসলের সময় কুসুম গরম পানি ব্যবহার করতে হবে। গোসলের সময় স্যাভলন, ডেটল বা এ ধরনের জীবাণুনাশক দেয়া উচিত নয়।

৮. শীতে শিশুর ত্বকের যত্নে ময়েশ্চারাইজ ব্যবহার আবশ্যক। গোসল করানোর পর কোমল টাওয়েল দিয়ে শরীর মোছার পর অলিভ অয়েল ও ভিটামিন-ই সমৃদ্ধ তেল গায়ে মাখতে পারেন। তবে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে- লাগানো তেল বা লোশন যেন সুগন্ধি, অ্যালকোহল এবং অন্যান্য কেমিক্যালমুক্ত হয়।

৯. শীতে শিশুদের ডায়াপার ঘন ঘন পরিবর্তন করতে হবে। ভেজা ডায়াপার দীর্ঘক্ষণ পরে থাকলে শিশুর অ্যালার্জির সমস্যাও হতে পারে।

১০. ঠাণ্ডা লেগে অনেক সময় শিশুর নাক বন্ধ হয়ে যেতে পারে। একে ক্ষেত্রে ‘নরসল নসল ড্রপ’ দিনে দুবার দেওয়া যেতে পারে।
 

এই বিভাগের আরো খবর