বুধবার   ২৬ জুন ২০১৯   আষাঢ় ১১ ১৪২৬   ২২ শাওয়াল ১৪৪০

নারায়ণগঞ্জকে বদলে দিচ্ছেন এসপি হারুন 

প্রকাশিত: ১০ এপ্রিল ২০১৯  

স্টাফ রিপোর্টার (যুগের চিন্তা ২৪) : প্রাচ্যের ডান্ডি হিসেবে খ্যাত নারায়ণগঞ্জ গুম-খুন ও সন্ত্রাসের জন্য নেতিবাচকভাবে সারাদেশে উপস্থাপিত হচ্ছিল। জেলার আইনশ্ঙ্খৃলা পরিস্থিতিও ছিলো অবনতির দিকে। তবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ নারায়ণগঞ্জে যোগ দেয়ার পর থেকেই বদলে যেতে শুরু করে পুরো জেলার চিত্র। 


এসপি হারুন মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজ ও ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণার পর তা বাস্তবায়ন শুরু করলে পুরো জেলার মানুষের আস্থা আদায় করতে সক্ষম হয় প্রথমবারের মতো পুলিশ। তবে পুলিশ সুপার হারুনও খ্যাতি পেয়ে যান জেলার সর্বোচ্চ জনপ্রিয় সরকারী কর্মকর্তা। 


একই সাথে তিনি প্রিয় ব্যক্তি হিসেবে নাগরিক সমাজ, সাংবাদিক সমাজ, জনপ্রতিনিধিসহ সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হন।  তবে তাঁর তুলনায় অনেক পেছনে রয়েছেন ২৫ মাস ধরে নারায়ণগঞ্জে জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা রাব্বী মিয়া। সবাই মনে করছেন, এসপি জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। 


নাগরিক সমাজের বিশিষ্টজনেরা মনে করেন, যেখানে জেলা প্রশাসক ২৫ মাসে তৃণমূল মানুষের আস্থা আদায় করতে পারেননি সেখানে মাত্র ৫ মাসে পুলিশ সুপার সেটি আদায় করে নিতে পেরেছেন। 


তারা বলছেন, নগরের ফুটপাত দিয়ে স্বাচ্ছন্দে হাঁটতে পারা এবং যানজটমুক্ত নগরী দেখতে পাওয়ার দাবি ছিলো নারায়ণগঞ্জবাসীর দীর্ঘদিন। নতুন এসপি যোগ দেয়ার কয়েকদিনের মধ্যেই একাজটি বিনারক্তপাতে করতে পেরেছিলেন। তিনি নিজে উপস্থিত থেকে চাষাঢ়া শহীদ মিনার এলাকাসহ নগরীর ফুটপাতগুলো উন্মক্ত করেছেন। অথচ একাজটিতে সফল হয়নি জেলা প্রশাসন। 


২০১৮ সালের ১৬ জানুয়ারি হকার ইস্যুতে মেয়র আইভীর উপর হামলার মতো ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটে। এঘটনার পরদিন ১৭ জানুয়ারি বিকেলে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) জসিমউদ্দিন হায়দারকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। 


এছাড়া কমিটির অপর দুইজন সদস্য হলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মোস্তাফিজুর রহমান, র‌্যাব-১১ এর সহকারি পরিচালক বাবুল আক্তার। গঠিত তদন্ত কমিটিকে ৭ দিনের মধ্যে তদন্ত রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়। রিপোর্ট জমার সময় কয়েকদফা বাড়ানো হয়। 


ইতিমধ্যে তদন্ত কমিটির প্রধান জেলায় থাকলেও বাকিদুজন বদলি হয়ে গেছেন। এখনো পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি  সেই তদন্ত প্রতিবেদন।  বিশিষ্ট জনেরা বলছেন, এই তদন্ত প্রতিবেদন জমা না দেয়ায় জেলা প্রশাসনের উপর নারায়ণগঞ্জের মানুষের আস্থা কমেছে। 


পুলিশ সুপার জনপ্রিয় হওয়ার বিশেষ যে কারণটি মনে করছে নাগরিক সমাজ। সেটি হচ্ছে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো। নারায়ণগঞ্জ শহরসহ জেলার প্রতিটি উপজেলাতেই সড়কে শৃঙ্খলা ফিরেছে।বিশেষ করে নগরীর চাষাঢ়ায়, লিংক রোড, ঢাকা-পাগলা-নারায়ণগঞ্জ সড়ক এবং চাষাঢ়া- চিটাগাংরোড পর্যন্ত সড়কে শৃঙ্খলা ফিরেছে। এগুলো পুলিশ সুপার নিজ উদ্যেগেই করেছেন। লিংকরোডে ডিভাইডার ভেঙে গাড়ি ঘোরানোর জন্য যেসব অবৈধ ফাক তৈরি করা হয়েছে সেগুলো বন্ধ করার ব্যাপারে উদ্যেগ নিয়েছেন পুলিশ সুপার। 


এছাড়া নগরীতে নির্দিষ্ট জায়গা ব্যতিরেকে গাড়ির স্ট্যান্ড এবং পার্কিং এর ব্যাপারে কঠোরতার কারণে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে পেরেছেন পুলিশ সুপার। জনভোগান্তি কমায় পুলিশ সুপারের উপর আস্থা বেড়েছে সাধারণ মানুষের। 


এদিকে ২০১৮ সালে জেলা প্রশাসন বিআরটিএকে সঙ্গে নিয়ে ৭৬টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করলেও সেটি আদতে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার সংখ্যাও ছিলো খুবই কম। 


এরমধ্যে জানুয়ারিতে ২টি, ফেব্রুয়ারিতে ৪টি, মার্চে ৭টি, এপ্রিলে ৯টি, মে ১৩টি, জুন ২টি, জুলাই ৭টি, আগষ্টে ১২টি,  সেপ্টেম্বর) ৮টি, অক্টোবরে ২টি, নভেম্বর মাসে ৪টি, ডিসেম্বরে ৬টি মোটরযান অধ্যাদেশে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। আর সেগুলোর অধিকাংশই শহরের ভেতরে । 


নাগরিক সমাজের মতে,নারায়ণগঞ্জ শহরে একটি বড় জুয়ার আসরের কথা সারাদেশের মানুষ জানতো। অথচ সেখানে কখনো ব্যবস্থা নেয়নি জেলা প্রশাসন। কিন্তু পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ সেই জুয়ার আসরে অভিযান চালিয়ে ৪১জন জুয়ারীকে গ্রেপ্তার করে। 


বন্ধ হয়ে যায় সেই জুয়ার আসর। জেলার সর্বোচ্চ কর্মকর্তা জানেন সে জেলায় কি ঘটছে। সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারলেই তিনি সে জেলার মানুষ হয়ে যান।  পুলিশ সুপার সাধারণ মানুষের মনের অবস্থাটি বুঝতে সক্ষম হয়েছেন। 


 নাগরিক সমাজের বিশিষ্টজনদের মতে, জেলা প্রশাসকের জনপ্রিয়তা কমার আরেকটি অন্যতম কারণ গত বছরের জুনে নারায়ণগঞ্জে ময়লা-আর্বজনা ফেলতে জেলা প্রশাসনের সহযোগিতা চেয়ে না পাওয়া। সপ্তাহব্যাপী মানুষ ময়লা ফেলা নিয়ে অনেক ভোগান্তিতে পড়েন। পরে ১ জুন জেলা প্রশাসকের খানপুরের বাসভবনের প্রধান ফটকের দুই পাশে দুটি করে চারটি গাড়ি ময়লাভর্তি ট্রাক (ত্রিপল দিয়ে ঢাকা) ফেলে রেখে চালকরা চলে যান। 


এঘটনার পরে মেয়র আইভী নাসিকের বাজেট অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, কাউকে নিচু করে দেখাতে কিংবা অপমানিত করতে নয়, জেলা প্রশাসকের বাসভবনের সামনে ওভাবে প্রতিবাদ জানানো হয়েছিলো।’ বর্র্জ্য সমস্যায় জেলা প্রশাসনের সহযোগিতা না পাওয়ায় তখন জেলা প্রশাসনের উপর সাধারণ মানুষের আস্থা কমে গিয়েছিলো। 


এছাড়া লিংক রোডের জালকুড়ি এলাকায় ময়লা আবর্জনার স্তুপ সরানোর দাবি সাধারণ মানুষ বারবার জানালেও সেখানে কার্যকর ভূমিকা না রাখতে পারায় জেলা প্রশাসনের উপর মানুষের আস্থা কমেছে। 


পুলিশ সুপার হারুন অর রশীদ যোগদান করার পরপরই মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান পরিচালনা করছেন। এতে অনেক প্রভাবশালীকেও তিনি ছাড় দেননি। সন্ত্রাস কিংবা অপরাধীদের বিরুদ্ধে তিনি যেমন কঠোর তেমনি নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার সুশীল সমাজের সাথেও অত্যন্ত মিশুক। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর তিনি জেলায় প্রথমবারের মতো সাংবাদিকদের নিয়ে একটি ফুটবল টুর্নামেন্টের আয়োজন করেন। 


যেখানে তিনি নিজেও খেলোয়ার ছিলেন। সাংবাদিকদের সাথে একই মাঠে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এসপির এফুটবল খেলার আয়োজন সর্বমহলে অত্যন্ত প্রশংসিত হয়। এছাড়া পুলিশ সুপারেরর উপর সাধারণ মানুষের  আস্থা তৈরি হয়েছে এর আরেকটি বড়দিক হচ্ছে পুলিশ সুপার কার্যালয়ে সাধারণ মানুষের সেবা বৃদ্ধি পাওয়া। 


অপরদিকে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যে কোন সেবার জন্য ঘন্টার পর ঘন্টার অভিযোগ তোলেন ভুক্তভোগীরা। তাদের অভিযোগ, ঠুনকো কারণে অনেক ব্যস্ততা দেখিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা বসিয়ে রাখা হয় সেবাগ্রহিতাদের। বিশেষ পরিচিতমুখ অনায়াসেই সেই অফিসের পিয়ন পেয়াদের নিয়ে কর্তাদের দেখা পেয়ে যান। কেউ প্রতিবাদ করলে তাঁর সেবাগ্রহণের ভাগ্যে জোটে দুর্ভোগ ও দীর্ঘসূত্রিতা।


নাগরিক সমাজের বিশিষ্টজনেরা বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নারায়ণগঞ্জবাসীকে সুসংবাদ দেন। তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রথমবারের মতো একজন পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রী উপর দেন নারায়ণগঞ্জবাসীকে। 


অত্যন্ত সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের এমপি গোলাম দস্তগীর গাজীকে (বীর প্রতিক) তিনি পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব দেন। আনন্দের জোয়ারে ভাসে পুরো নারায়ণগঞ্জ। মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়ে দুইবার নারায়ণগঞ্জ শহরে আনুষ্ঠানিকভাবে আসলেও একবারও তাকে বরন করে নেননি জেলা প্রশাসক। 


কাজের ব্যস্ততা কারণ হলেও সেটিকে ভালোভাবে নেয়নি সাধারণ মানুষ। অথচ একেবারেই বিপরীত পুলিশ সুপার। মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর নারায়ণগঞ্জে প্রথমবারের মতো আসলে পুলিশ সুপার হারুন অর রশীদ জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে গোলাম দস্তগীর গাজীকে গার্ড অব অনার প্রদান করেন।
যা পুরো নারায়ণগঞ্জবাসীর অন্তরকে স্পর্শ করে। সবার মন জয় করে নেন পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ। সবাইকে ছাপিয়ে যান তিনি। 
 

এই বিভাগের আরো খবর