বৃহস্পতিবার   ১২ ডিসেম্বর ২০১৯   অগ্রাহায়ণ ২৮ ১৪২৬   ১৪ রবিউস সানি ১৪৪১

না’গঞ্জ বিএনপিতে একাধিক ব্লক, চলছে মতবাজদের মনমতলবি

প্রকাশিত: ১ ডিসেম্বর ২০১৯  

বিশেষ প্রতিনিধি (যুগের চিন্তা ২৪) : নারায়ণগঞ্জ জেলায় বিএনপি নেতারা অন্তঃকলহে লিপ্ত। প্রধান বিরোধী দল হিসেবে নিজেদের করণীয় ভুলে নেতারা পদ বাগাতে বেশি আগ্রহী। পদ বাগানো নিয়ে জেলাজুড়ে ওয়ার্ড পর্যায়ে ঝগড়া বিবাদ চলছে। কেউ কাউকে মানতে চাইছেনা। দলটির  নেতৃবৃন্দ রাজনীতির ময়দানে অলস সময় পার করছেন।

 

দল গোছানোর প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকেই চলছে হিংসা বিবাদ ও পদ পদবী নিয়ে মারামারি-কাড়াকাড়ি। দলের চেয়ারপারর্সন যেখানে অসুস্থ্য, সেখানে নেতাকর্মীরা দলীয় পদ-পদবী নিয়ে মেতে উঠেছে অসুস্থ্য প্রতিযোগিতায়।

 

ফলে নারায়ণগঞ্জ বিএনপি মাঠ পর্যায়ে সাংগঠনিকভাবে দুর্বল থেকে দুর্বল হয়ে পড়ছে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বোদ্ধামহল।তাদের মতে, দল ক্ষমতায় থাকতে যেমন তেমন বিরোধী দলে গেলেই নারায়ণগঞ্জ বিএনপি অধিকতর দুর্বল হয়ে পড়ে। জেলা পর্যায়ের বাঘা বাঘা নেতারা নুইয়ে পড়েন জুজুর ভয়ে।

 

হামলা-মামলার ধোঁয়া তুলে দলীয় কার্যক্রম থেকে দূরে থাকেন। কেউ কেউ আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে গাটছড়া বাঁধার চেষ্টা করেন। অনেকে রাজনীতি থেকে সরে গিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন ব্যক্তি জীবন নিয়ে। সচরাচর এঁরা দলের কর্মসূচিতে আসেন না। তবে নেতাদের সাথে খাতির রাখেন। কেননা দল ক্ষমতায় আসলে যেন নিজের জায়গাটা ধরে রাখা যায়।

 

বিএনপি বিরোধী দলে চলে গেলেই শত সহস্র মতবাজদের মনমতলবি চলে নারায়ণগঞ্জে। জেলা ও মহানগর বিএনপিতে এখন একাধিক ব্লক। জেলা কমিটি চলে গেছে শহরের বাইরে। জেলা বিএনপি’র এখন কোন কার্যালয় নারায়ণগঞ্জ শহরে নেই। জেলা কমিটি আয়ত্বের বাইরে চলে যাওয়ায় শহরের সিনিয়র নেতারা বিএনপি অফিস নিয়ে মাথা ঘামায়না।

 

একাধিক সিনিয়র নেতা ও তৃণমূল পর্যায়ের কর্মীরা জানান, নারায়ণগঞ্জে প্রথম বিতর্কিত হয়েছে জেলা বিএনপি কমিটি। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদ দুটিতে শহরের কোন সিনিয়র নেতার ঠাঁই হয়নি। সভাপতি রূপগঞ্জের বাসিন্দা কাজী মনির সাধারণ সম্পাদক সিদ্ধিরগঞ্জের বাসিন্দা অধ্যাপক মামুন মাহমুদ।

 

শহরের ডাকসাইটে নেতাদের মধ্যে থেকে কেউই  জেলা কমিটির ভাইটাল পদ না পাওয়ায়  জেলা কমিটির চলছে দুর্দশা-দুর্গতি। মামুন মাহমুদ কিছু অনুসারী নিয়ে রাজপথে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন মাঝে মধ্যে। পুলিশের তাড়া খেয়ে দৌঁড়ে সরে যেতে হয়।

 

দলের ডাকসাইটে নেতারা ভাইটাল পদ না পাওয়ায় তাঁরাই বিএনপি’র সমালোচনা করেন সবসময়। নেতাদের মুখে সমালোচনা শুনে সাধারণ নেতাকর্মীরা দলের প্রতি উৎসাহ হারায়।সবকিছুকেই কর্মীরা মনে করে ভাঁওতাবাজি।

 

নেতাকর্মীদের মতে, এবার নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপি’র কমিটিও বিতর্কিত হল। মহানগরের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা কমিটি গঠনে সুবিচার করতে পারেনি। পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনে লংঘিত হয়েছে দলীয় গঠনতন্ত্র।

 

বিএনপি’র ইতিহাসে রেকর্ড হয়ে রইলো এই ঘটনা। মহানগরের কমিটিতে নারায়ণগঞ্জ মহানগরের ১ থেকে ১০ নং ওয়ার্ডের  নেতাদের পদ বঞ্চিত করা হয়েছে। মহানগর কমিটি নিয়ে অনেক আগে থেকেই সাবেক এমপি আবুল কালাম ও এড. সাখাওয়াত হোসেন এর মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছিল।

 

এড. সাখাওয়াত হোসেন নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপি থেকে মেয়র পদে নির্বাচন করায় তাঁর ইমেজ বেড়ে গেছে নেতাকর্মীদের কাছে। এখান থেকেই দ্বন্দ্বের সূত্রপাত। মেয়র নির্বাচন করার পর থেকে এড. সাখাওয়াতের গ্রহণযোগ্যতাও বেড়েছে জ্যামিতিক হারে।

 

সূত্রমতে, শহরের বিএনপি নেতাকর্মীরা তুলনা করতে শুরু করলো একটা সময়ে। শহরে বিএনপি’র কান্ডারি কে ? সাবেক এমপি এড. আবুল কালামকে সকলেই ঘরমুখী নেতা মনে করেন। তিনি খুব একটা বাইরে বের হন না। ব্যক্তি হিসেবে তিনি সবার প্রিয়পাত্র।

 

তবে রাজনীতিবিদ হিসেবে পছন্দের নন। এমপি থাকাকালে তিনি যতটা সচল থাকেন-দল ক্ষমতা থেকে চলে গেলে তিনি ততটাই অচল হয়ে পড়েন। এছাড়া তাঁর তেমন কোন সমস্যা নেই। রাজপথে না নামলেও তিনি তিনবারের সফল এমপি।

 

অনেক যোগ্যতা থাকার পরও এড. আবুল কালামকে নিয়ে একটাই সমালোচনা-তিনি ঘরমুখী রাজনীদিবিদ। দলের টিকিট পেলে মাঠে নামেন। নয়তো ঘরে বসে থাকেন। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে সাবেক এমপি আবুল কালামকে নিয়ে তুলনা শুরু হয় এড. সাখাওয়াত হোসেন এর সাথে।

 

এড. সাখাওয়াত হোসেন আইনজীবী সমিতিতে সাফল্যের বরপুত্র হিসেবে দেখা হয়। সেই সাফল্যের কারণে এবং ঝড়ের মুখে দাঁড়িয়ে একা শক্ত হাতে রাজপথে বিএনপি’র ঝান্ডা তুলে ধরে সাখাওয়াত হোসেন বিএনপি’র তৃণমূল নেতাকর্মীদের বিশ্বাস ও আস্থা অর্জন করেন। তৃণমূলের আস্থা অর্জন করাটাই এড. সাখাওয়াত হোসেন এর জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।

 

দলীয় সূত্রের খবর, সাম্প্রতিক সময়ে এড. সাখাওয়াতের ইমেজকে কিছুতেই সহ্য করতে পারছিলেন না মহানগর বিএনপি’র ধারক বাহক এড. আবুল কালাম এর সহযোগী ও সমর্থকরা। তারা দিনরাত এড. আবুল কালামের কানভারী করতে থাকে এই বলে যে, এড. সাখাওয়াত হোসেন আগামীতে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে বিএনপি’র নমিনেশন চাইতে পারেন। সে আপনার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠছে। তাঁকে আর বাড়তে দেয়া যাবেনা। আগাছা পরিষ্কার করে ফেলতে হবে।

 

এড. সাখাওয়াতকে কোনঠাসা করতে গিয়ে নারায়ণগঞ্জ মহানগর কমিটিতে সিটির ১০ টি ওয়ার্ডের নেতাকর্মীদের কমিটিতে স্থান দেয়া হয়নি। যা ছিল বিএনপি’র গঠনতন্ত্রের লংঘন। বঞ্চিত নেতাকর্মীরা এ বিষয়ে আদালতে মামলা ঠুকে দিয়েছে।

 

যার প্রেক্ষিতে আদালত নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপি কমিটির উপর জারি করেছে অন্তর্বতীকালীন নিষেধাজ্ঞা। এ ঘটনার পর শোনা যাচ্ছে, এড. সাখাওয়াত হোসেনকে দল থেকে বহিষ্কার করানোর ষড়যন্ত্র চলছে। মহানগর বিএনপি নিয়ে দুপক্ষের লড়াই কবে থামবে কেউ জানেনা।

 

প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি অ্যাড. আবুল কালামকে সভাপতি ও এটিএম কামালকে সাধারণ সম্পাদক ঘোষণা করে ২৩ সদস্য বিশিষ্ট নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির আংশিক কমিটির অনুমোদন দেওয়া হয়।

 

পরবর্তীতে চলতি বছরের ৩০ অক্টোবর সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এবং সিনিয়র সহসভাপতির পদ ঠিক রখে ১৫১ সদস্য বিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

 

গত ১১ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর বিএনপির কোনো কমিটিতে পদ না পেয়ে ১০ নং ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সভাপতি গোলজার খান ও একই ওয়ার্ডের সাবেক যুগ্ম-সম্পাদক নূর আলম শিকদার ওই আদালতে মামলার আর্জি করেন।

 

মামলায় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জেলা বিএনপির সভাপতি কাজী মনিরুজ্জামান, সাধারণ সম্পাদক মামুন মাহমুদ এবং মহানগর বিএনপির সভাপতি অ্যাড. আবুল কালাম ও সাধারণ সম্পাদক এটিএম কামালকে বিবাদী করা হয়। আদালত ১৩ নভেম্বর ওই দুই নেতার আবেদনটি আমলে নিয়ে বিবাদীদের ১৯ নভেম্বরের মধ্যে আদালতে হাজির হয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করেন।

 

মামলার বাদী গোলজান খান জানান, দলের জেলা কমিটিতে অল্প ক’জন স্থান পেলেও মহানগরের কমিটিতে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ১ থেকে ১০ নং ওয়ার্ড পর্যন্ত ১০টি ওয়ার্ডের কোনো নেতাই পদ পাননি।১০টি ওয়ার্ডের মূল দলের নেতাকর্মীরা দলীয় পদ-পদবির ক্ষেত্রে অবহেলার শিকার হচ্ছেন। দলের জন্য প্রাণপণ কাজ করলেও কেন্দ্রীয় নেতারা তাদের কোনো মূল্যায়ন করছেন না বলে তিনি দাবি করেছেন।

এই বিভাগের আরো খবর