মঙ্গলবার   ২২ অক্টোবর ২০১৯   কার্তিক ৭ ১৪২৬   ২২ সফর ১৪৪১

দূষণে ধুঁকছে নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত: ২৫ মে ২০১৯  

ডেস্ক রিপোর্ট (যুগের চিন্তা ২৪) : কোনো শহরে একটি নদী থাকলেই তাকে সেই শহরের জন্য আশীর্বাদ হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু কোনো শহরের মধ্য দিয়ে যদি একটি নদী বয়ে যায়, তিন পাশে থাকে আরও তিনটি বড় নদী এবং দুই ডজনের বেশি খাল শিরা-উপশিরার মতো এসব নদীর সঙ্গে যুক্ত থাকে, তবে সেই শহর অনায়াসে ভূস্বর্গ হিসেবে গড়ে তোলা যায়। নারায়ণগঞ্জ এমনই একটি নদীসমৃদ্ধ শহর। কিন্তু এটি এখন বাংলাদেশের অন্যতম দূষিত নগরী।

 

নারায়ণগঞ্জ শহরের মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে শীতলক্ষ্যা নদী। এর পূর্বে মেঘনা, পশ্চিমে বুড়িগঙ্গা ও দক্ষিণ-পশ্চিমে ধলেশ্বরী নদী। পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদও জেলার পশ্চিম দিক দিয়ে সিদ্ধিরগঞ্জ হয়ে নারায়ণগঞ্জ সদরে ধলেশ্বরী নদীতে মিলিত হয়েছে। জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে ২৭টি বড় খাল এসে মিশেছে এসব নদীতে। কিন্তু শিল্পবর্জ্যরে কারণে এখানকার নদীর পানি হয়ে পড়েছে পরিশোধনের অনুপযোগী। খালগুলোর বেশির ভাগ ভরাট বা দখল হয়ে গেছে।

 

কেবল নদীর দূষণ নয়, বায়ুদূষণেও নারায়ণগঞ্জ এখন শীর্ষে। মার্কিন পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থার তৈরি করা বায়ুমান সূচক (একিউআই) অনুযায়ী, বায়ুমান (বাতাসে ভাসমান বস্তুকণা, কার্বন মনোক্সাইড, নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড, ওজোন, সালফার ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ) ৫০-এর নিচে থাকলে তা স্বাস্থ্যকর বলে ধরা হয়। আর ৩০০-এর ওপরে উঠলে তা বিপজ্জনক। বাংলাদেশের পরিবেশ অধিদপ্তরের পাঁচ বছরের (২০১৩-১৮) গবেষণা বলছে, ঢাকার চেয়েও বেশি দূষিত নারায়ণগঞ্জের বাতাস। গত বছর ১০৫ দিন নারায়ণগঞ্জের বায়ুমান সূচক ৩০১-এর ওপরে ছিল।

 

গত ৯ মে ঢাকার বায়ুমান ছিল ১৬৩। এদিন বিশ্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ দূষিত শহরের তালিকায় ঢাকার নাম আসে। সর্বশেষ গত বুধবার পরিবেশ অধিদপ্তরের বায়ুমান পর্যবেক্ষণ যন্ত্রের হিসাব বলছে, এই দিন ঢাকার বায়ুমান ছিল ১৪৮ আর নারায়ণগঞ্জের মান ১৬৮; যা মাঝারি মানের বিপজ্জনক। চিকিৎসকেরা বলছেন, বায়ুদূষণের কারণে শ্বাসনালির সমস্যা, ফুসফুসে সমস্যা ও অ্যাজমার ঝুঁকি বাড়ে। সার্বিকভাবে শরীরের প্রতিরোধক্ষমতা ব্যাহত হয়।

 

স্থানীয় পরিবেশকর্মীরা বলছেন, ইটভাটা, নির্মাণকাজ, সড়কের ধুলা, গাড়ির ধোঁয়া ইত্যাদি বায়ুদূষণের বড় কারণ। নারায়ণগঞ্জে এসবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সিমেন্ট কারখানার ফ্লাই অ্যাশ (নির্গত ছাই )। নিশ্বাস নিতে গেলে মনে হয়, নাকে ফ্লাই অ্যাশ ঢুকছে। এর মধ্যে সিটি করপোরেশনের অধীন শীতলক্ষ্যার ওপারে বন্দর এলাকায় এ সমস্যা বেশি। সেখানকার লোকজন জানান, অনেকের টিনের ঘরের চালে ফ্লাই অ্যাশের স্তর বসে গেছে। বাচ্চারা শ্বাসকষ্টে ভুগছে। গাছে পর্যাপ্ত ফল ধরছে না।

 

নারায়ণগঞ্জে সিমেন্ট কারখানা আছে ১২টি। এর মধ্যে চারটিই বন্দর এলাকায়। ফ্লাই অ্যাশের কারণে ব্যাপক বায়ুদূষণের কথা উল্লেখ করেন সিটি করপোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীও। তাঁর প্রশ্ন, ‘জনবসতিপূর্ণ এলাকায় এ ধরনের কারখানা স্থাপনে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড় পেল কীভাবে ?’

 

রুমার গডেনের সেই শীতলক্ষ্যা এখন মৃতপ্রায়
প্রাচ্যের ডান্ডিখ্যাত নারায়ণগঞ্জ শহর গড়ে উঠেছে শীতলক্ষ্যা নদীকে ঘিরে। এই নদী এবং এই শহরকে নিয়ে ইংরেজ সাহিত্যিক রুমার গডেন তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস দ্য রিভার লিখেছিলেন ১৯৪৬ সালে। পরবর্তীকালে ফরাসি চিত্রনির্মাতা জ্যঁ রেনোয়া এর ছায়া অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। মার্গারেট রুমার গডেন ও তাঁর বড় বোন উইনসাম রুথ কে গডেন (জন গডেন নামে লিখতেন) কিশোর বয়সে ১৯১৪ সালে বাবার কর্মসূত্রে নারায়ণগঞ্জে আসেন। দুই বোনের লেখা স্মৃতিকথা টু আন্ডার দ্য ইন্ডিয়ান সান-এও শীতলক্ষ্যার বর্ণনা আছে।

 

দ্য রিভার-এর কেন্দ্রীয় চরিত্র ইংরেজ কিশোরী হ্যারিয়েটের চোখে স্রোতস্বিনী শীতলক্ষ্যার স্বচ্ছ জল, অসংখ্য জলযান, গাঙচিল-মাছরাঙার ওড়াউড়ি, নিঃসীম নীলাকাশের যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তার উল্লেখ করে নারায়ণগঞ্জের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বি প্রথম আলোকে বলেন, সেই শীতলক্ষ্যা এখন দূষণে মৃতপ্রায়। পানি দুর্গন্ধময়। অথচ একটা সময় এর পানি মানুষ পান করত।


সম্প্রতি নৌকায় শীতলক্ষ্যা ঘুরে দেখা যায়, পানি আলকাতরার মতো কালো। দুর্গন্ধে নাকে রুমাল না চেপে বেশিক্ষণ থাকা দায়। নৌকার মাঝি খলিল মিয়া বললেন, পানিতে কিছুক্ষণ হাত বা পা ডুবিয়ে রাখলে চামড়া ফুটে যায়।

 

পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, পানিতে জীববৈচিত্র্য টিকে থাকার জন্য ন্যূনতম ৪ দশমিক ৫ মিলিগ্রাম অক্সিজেন থাকার কথা। কিন্তু শীতলক্ষ্যার পানিতে রয়েছে শূন্য দশমিক ৫ মিলিগ্রাম অক্সিজেন। বর্ষাকালে কিছুটা বেড়ে এটা ২ মিলিগ্রাম হয়ে থাকে। ফলে এই পানিতে মাছসহ জলজ প্রাণীর বেঁচে থাকা দায়।

 

গৃহস্থালির বর্জ্য ও সিটি করপোরেশনের বর্জ্যরে একটা বিরাট অংশ নদীতে গিয়ে পড়ছে। শহরের নৌঘাটের আশপাশে নদীর পাড় ধরে হেঁটে দেখা গেল নদীর ঢালে, পানির ধারে ময়লা-আবর্জনা পড়ে আছে। গৃহস্থালি বর্জ্য থেকে শুরু করে এমন কোনো বর্জ্য নেই, যা নদীতে ফেলা হচ্ছে না। কোথাও কোথাও আবর্জনার স্তূপ দেখা গেল। এসব বর্জ্যরে বেশির ভাগ আসছে স্থানীয় মার্কেট ও আড়ত থেকে।

 

অপরিশোধিত শিল্পবর্জ্য দূষণের বড় কারণ
পরিবেশ অধিদপ্তরের সূত্র জানায়, এখানকার নদী, খাল দূষিত হওয়ার প্রধান কারণ মূলত শিল্পবর্জ্য। গৃহস্থালি বা পয়োবর্জ্যও আংশিক দায়ী। প্রতিদিন অপরিশোধিত শিল্পবর্জ্য এবং গৃহস্থালি বর্জ্য, পলিথিন, বাজারের ময়লা, হোটেল-রেস্তোরাঁর বর্জ্যসহ পয়োবর্জ্য নদীতে পড়ছে।

 

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জে নানা রকম শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২ হাজার ৪০৯। এসব শিল্পকারখানার অনেকগুলোই তরল বর্জ্য নির্গমনকারী প্রতিষ্ঠান। সব কারখানায় বর্জ্য শোধনাগার বা ইটিপি নেই। এর মধ্যে ডাইং কারখানা অন্যতম। আবার অনেক কারখানায় ইটিপি থাকলেও খরচ বাঁচাতে প্রায়ই তা বন্ধ রাখা হয় বলে অভিযোগ আছে।

 

পরিবেশ অধিদপ্তরের নারায়ণগঞ্জ কার্যালয়ের উপপরিচালক মো.সাঈদ আনোয়ার প্রথম আলোকে বলেন, দূষণ রোধে তাঁরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করেন, জরিমানা করেন। তবে জনবল কম থাকায় কোনো কারখানা রাতে ইটিপি বন্ধ রেখে বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলছে কি না, তা নজরদারি করা সম্ভব হয় না।

 

বিসিক শিল্প মালিক সমবায় সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্পগুলোর ইটিপি আছে। বিদেশি ক্রেতারা নিয়মিত নজরদারি করে, তাই এখানে ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ কম। তিনি বলেন, ছোট ছোট ডাইং কারখানার সামর্থ্য নেই ইটিপি বসানোর। এগুলো বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। তবে সরকার উদ্যোগ নিলে এসব কারখানার বর্জ্য পরিশোধন একটা কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনায় আনা সম্ভব।

 

এত দিন পর পয়োবর্জ্য ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ
নারায়ণগঞ্জ শহরে প্রায় ২০ লাখ লোকের বাস। বিপুল জনগোষ্ঠীর এই নগরী পরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠেনি। ফলে জনসংখ্যা অনুপাতে এর যাতায়াত, পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থাসহ অন্যান্য সেবা ও সুবিধাদি গড়ে ওঠেনি। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নগর-পরিকল্পনাবিদ মো. মঈনুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, এই শহরের পরিবেশ উন্নয়ন ও নদীকে বাঁচাতে হলে সরকারের সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা ও জনসাধারণের সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। তিনি জানান, পয়োবর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য সিটি করপোরেশন ইতিমধ্যে জালকুঁড়ি এলাকায় ২৩ একর জমি অধিগ্রহণ করেছে। সেখানে প্রতিদিন ৫০০ টন বর্জ্য থেকে ৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া নদীর ওপারে ৮২ একর জমিতে একই রকম আরেকটি প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন আছে। পঞ্চবটীতে একটি কম্পোস্ট প্ল্যান্ট চালু করা হয়েছে। সেখানে বর্জ্য থেকে প্রতিদিন ২০ টন জৈব সার তৈরি হয়।

 

বেশির ভাগ খাল ভরাট
নারায়ণগঞ্জে খাল আছে ২৭টি। অনেক খালে একসময় পণ্যবাহী নৌকা চলত। এখন বেশির ভাগ ভরাট হয়ে গেছে, কোনো কোনোটা মৃতপ্রায়। সরেজমিনে দেখা যায়, মৃতপ্রায় বাবুরাইল খালের এখন খননকাজ চলছে। সাড়ে তিন কিলোমিটার দীর্ঘ এই খালের মাধ্যমে শীতলক্ষ্যা ও ধলেশ্বরীর সংযোগ ঘটানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী প্রথম আলোকে বলেন, কেবল বাবুরাইল নয়, সিটি করপোরেশন আরও কয়েকটি খাল উদ্ধার ও খননকাজের উদ্যোগ এরই মধ্যে নিয়েছে। পর্যায়ক্রমে নগরীর বাকি খালগুলো উন্নয়নেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি জানান, সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকার খালগুলোও উদ্ধার এবং উন্নয়নের কাজ চলছে। সেটা সেনাবাহিনী করছে।

 

নেমে যাচ্ছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর 
ব্যাপকভাবে নদীদূষণের ফলে খাওয়ার পানির সংকট দেখা দিয়েছে এখানে। ওয়াসার নারায়ণগঞ্জ আঞ্চলিক কার্যালয়ের কর্মকর্তারা জানান, নারায়ণগঞ্জ শহরের দুপাশে শীতলক্ষ্যা ও বুড়িগঙ্গার পানি শোধন করেও পানের উপযোগী করা যাচ্ছে না। পাশাপাশি শহরের জলাশয়গুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় এবং নদীগুলোর তলদেশে কয়েক ফুট পর্যন্ত পলিথিনের স্তর জমে যাওয়ায় ভূপৃষ্ঠের পানি ভূগর্ভে যেতে পারছে না। ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে।

 

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) নারায়ণগঞ্জ শাখার সভাপতি এ বি সিদ্দিক প্রথম আলোকে বলেন, দূষণের পাশাপাশি আছে নদীর দুই পাড় দখল। বিআইডব্লিউটিএ কিছুদিন ধরে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করছে। কিন্তু তারা বিরতি দিলে দেখা যায়, আবার দখল হয়ে যাচ্ছে। বিআইডব্লিউটিএ নদীর চর এলাকাটা ইজারা দিয়ে নদীর আরেক সর্বনাশ করছে। শীতলক্ষ্যার পূর্ব পাড়ের প্রায় ৯০ শতাংশ ডকইয়ার্ডের দখলে। নদীর মধ্যে বেশ কয়েক একর জমি ভরাট করে ইকোপার্ক করা হয়েছে। পরিবেশকর্মীরা আন্দোলন করেও এটা ঠেকাতে পারেননি। তিনি বলেন, সরকার আন্তরিক হলে এবং নদীদূষণের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় আইন ও হাইকোর্টের নির্দেশনা যথাযথভাবে প্রতিপালন করলে অবস্থা এতটা খারাপ হতো না। 


তথ্য সূত্র ও ছবি : দৈনিক প্রথম আলো

এই বিভাগের আরো খবর