শনিবার   ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯   অগ্রাহায়ণ ২৩ ১৪২৬   ০৯ রবিউস সানি ১৪৪১

‘দুটি পেঁয়াজের বেশি নয়, একটি হলে ভালো হয়’

প্রকাশিত: ১৫ নভেম্বর ২০১৯  

স্টাফ রিপোর্টার (যুগের চিন্তা ২৪) : কাঁচা বাজার থেকে শুরু করে বন্ধু বান্ধবের আড্ডা, পাড়ার চায়ের দোকান, অফিস কর্মীদের আলোচনা, পারিবারিক খোশ-গল্প, রান্নাঘর এবং সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম সব জায়গায় এখন একটাই স্লোগান ‘দুটি পেঁয়াজের বেশি নয়, একটি হলে ভালো হয়’। আবার কেউ কেউ বলছেন ‘একদিনে একটি পেঁয়াজ।’

 

‘দুটি সন্তানের বেশি নয়, একটি হলে ভালো হয়’-দেশের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে এই স্লোগানে সরকার নানা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে এটা আমরা সবাই জানি। কিন্তু এটাকে কীভাবে বা কারা পেঁয়াজের সাথে মিলিয়ে ফেললো সেটা জানা সম্ভব না হলেও বর্তমান প্রেক্ষাপটে ‘দুটি পেঁয়াজের বেশি নয়, একটি হলে ভালো হয়’ সর্বাধিক উপযোগী একটি স্লোগনই বটে!

 

কারণ সপ্তাহের ব্যবধানে পেঁয়াজের দাম কেজি প্রতি বেড়েছে ৫০-৭০ টাকা। যেখানে গত বছরে এ সময় প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম ছিল ৩০-৪০ টাকা! বর্তমান সময়ে পেঁয়াজের দাম স্মরণকালের সর্বোচ্চ রেকর্ড অতিক্রম করেছে। বাজার এখন প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ২০০-২২০। আর আমদানীকৃত পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে একই দামে। পাশাপাশি বাজারে পেঁয়াজের সংকট রয়েছে বলেও জানান বিক্রেতারা।

 

‘বাঙালীরা গরীব হলেও ভোজন রসিক’ এমন একটি কথা প্রচলিত আছে। আর এই ভোজন রসিকদের রসনা বিলাসের ক্ষেত্রে পেঁয়াজের কোন বিকল্প নেই। বলা হয়ে থাকে পেঁয়াজ নেই, এমন কোন রান্না ঘর হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে না। কারণ কোন রান্না শুরু করার আগে, কড়াইতে তেল দেয়ার পরপরই সাধারণত যে উপাদানটি ব্যবহার করা হয় সেটি পেঁয়াজ। শুধু অন্য রান্নার অনুষঙ্গ নয়, কাঁচা খেতেও পোঁজ বেশ সুস্বাদু। এছাড়া সরাসরি কাঁচা পেঁয়াজ, ভর্তা, আচার এবং সালাদ হিসেবেও পেঁয়াজের কদর কম নয়।

 

তবে হ্যাঁ দেশের মানুষ এখন এমন এক সময় অতিক্রম করছে যখন পেঁয়াবিহীন রান্নাঘর খুঁজে পাওয়া যাবে। আর কাাঁচা পেঁয়াজ, ভর্তা কিংবা সালাদ এগুলো-তো খাওয়ার কেনো প্রশ্নই আসেনা। কারণ পেঁয়াজের দাম যে এখন ছোাঁয়া। আর এ আকাশ ছোঁয়া দামের কারণে শুধু নিম্ন আয়ের মানুষ নয়, মোটামুটি স্বচ্ছল পরিবারেও চাপ তৈরি হয়েছে।

 

শহরের টানবাজার থেকে দ্বিগুবাবুর বাজারে আসা ত্রিদিব দাস নামক একজন ক্রেতা জানালেন, আগে বাজারে আসলে প্রতিবার এক পাল্লা ৫ কেজি পেঁয়াজ কিনতাম। এর পর দাম বৃদ্ধির পর আধা পাল্লা (২.৫ কেজি) কিনেছি, আর আজ কিনলাম ১ কেজি।

 

এর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, পেঁয়াজের স্বাভাবিক দামের পূর্বের প্রায় ৫ কেজির দামে বর্তমানে ১ কেজি কিনতে হচ্ছে। আমরা সীমিত আয়ের মানুষ এত দাম দিয়ে কেনা সম্ভব নয়। বাসায় আপনার বৌদি বলছে ১ কেজি করেই নিতে।

 

সৈয়দপুর থেকে বাজার করতে আসা নাফিজুল করিম নামে একজনের কাছে জানতে চাইলে তিনি অবশ্য রসিকতা করে বললেন অন্য কাথা। তিনি বলেলেন, ছোট বেলায় বাংলা সিনেমায় দেখতাম নায়ক কিংবা নায়িকার বাবা যে বড়লোক থাকতো তাদের বাসার ডাইনিং টেবিলে আপেল, আঙুর, কমলা, কলা ইত্যাদি ফল সাজানো থাকতো। এগুলোর পরিবর্তে এখন পেঁয়াজ, রোসন, শসা, ধনে পাতা ইত্যাদি সাজিয়ে রাখতে হবে। তাহলে গৃহকর্তার আভিজাত্যের বিষয়টি ফুটে উঠবে। তাঁর কথায় সেখানে উপস্থিত আমরা সবাই না হেসে পারলামনা।

 

পেঁয়াজের দাম আরেক দফা বৃদ্ধির কারণ জানতে চাইলে একজন পাইকারী বিক্রেতা বললেন, বুলবুলের (ঘূর্ণিঝড়) কারণে এর দাম হঠাৎ আবার বেড়ে গেছে। কারণ প্রায় তিনদিন আমাদের মাল (পেঁয়াজ) আসা বন্ধ ছিল। এর পরে চট্টগাম ও ঢাকার বড় বড় পাইকারী বাজারে এর দাম বেড়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে আমাদেও বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। তাই এর প্রভাব খুচরা বাজারে পরেছে। তাছাড়া বাজারে এখন পেঁয়াজের সংকট রয়েছে।

 

খোঁজ নিয়ে জানা যায় আমদানির অনুমতি নেওয়া হলেও এখনো পেঁয়াজের বড় চালান দেশে এসে পৌঁছায়নি। আবার ঘূর্ণিঝড়ের কারণে গত কয়েক দিন চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পেঁয়াজ খালাস ব্যাহত হয়েছে। সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাজারে দাম বেড়ে গেছে। ঘূর্ণিঝড়ের কারণে পেঁয়াজ খালাস হয়নি। তাতে বাজারে পেঁয়াজের সরবরাহে সংকট তৈরি হয়েছে। ঝড় কেটে যাওয়ায় এখন পেঁয়াজের সরবরাহ বাড়লে দামও কমবে বলে জানিয়েছে চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা।

 

পেঁয়াজের এ সংকট শুরু হয় গত ২৯ সেপ্টেম্বর ভারত রপ্তানী বন্ধ করে দেওয়ার পর। ভারতীয় পেঁয়াজ বন্ধের পর দের মাস হতে চলল, ব্যবসায়ীরা তাকিয়ে আছেন বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর আমদানি করা পেঁয়াজ কবে এসে দেশে পৌঁছায়। অবশ্য আমদানি করা এ পেঁয়াজ দু-চার দিনে আসছে না। সব মিলিয়ে পেঁয়াজের দাম আরও সপ্তাহ দুয়েকের মতো এমন থাকবে।

 

পেঁয়াজের দাম বাড়ার সাথে সাথে বেড়েছে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস চাল, আটা, ভোজ্য তেলের দামও। শহরের বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে চালের দাম প্রতি কেজি ৩-৪ টাকা, আটা প্রতি কেজি ২-৩ টাকা এবং ভোজ্য তেলের দাম লিটার প্রতি ৩-৫ টাকা বেড়েছে। রসুনের দামও কেজি প্রতি বেড়েছে ১৫-২০ টাকা করে।

 

নিত্য প্রয়োজনীয় সবজির তালিকায় বেশি চাহিদা সম্পন্ন আলুর দাম গত সপ্তাহের তুলনায় বেড়েছে। প্রতি কেজি আলু এখন বিক্রি হচ্ছে ২৮-৩০ টাকা দরে। তবে পাইকারি বাজারে এক পাল্লা (৫ কেজি) এক সাথে কিনলে দাম হয় ১২০-১৩০ টাকা অর্থাৎ প্রতি কেজি ২০ টাকা দরে। যা গত সপ্তাহে ছিল ২৫ টাকা কেজি এবং ১১০ টাকা পাল্লা।

 

শীতের আগাম সবজির বাজাওের রয়েছে আগুন।বাজারে দেখা যাচ্ছে ফুলকপি ও বাাঁধা কপি বিক্রি হচ্ছে প্রতিপিস ৫০-৬০ টাকা যা গত সপ্তাহে ছিল ২০-২৫ টাকা, লাউ বিক্রি হচ্ছে প্রতি পিস ৪০-৬০ টাকা দরে যা গত সপ্তাহে ছিল ৩০-৪০ টাকা দরে, শসা, গাজর, টমেটো প্রতি কেজি  বিক্রি হচ্ছে ৮০-১০০ দরে যা গত সপ্তাহে ছিল ৬০-৭০ টাকা। তবে কমেছে কাঁচা মরিচের ঝাল। প্রতি কেজি এখন বিক্রি হচ্ছে ৩০-৪০ টাকা দরে। তাছাড়া ধনে পাতার কেজি পাইকারী বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৩০০-৩৫০ টাকা কেজি দরে।

 

কাঁচা মরিচের পাশাপাশি কিছুটা কম এবং স্থিতিশীল রয়েছে পেঁপে, কাঁচকলা, কুমরা, লাল শাকসহ কিছু শাক-সবজির দাম। বাজারে প্রতি কেজি পেঁপে বিক্রি হচ্ছে ১০-১৫ টাকা, কাঁচকলা প্রতি হালি ১৫-২০ টাকা, করল্লা ও কাকরোল প্রতি কেজি ৫০-৭০ টাকা, পোটল প্রতি কেজি ৪০-৫০ টাকা, বটবটি প্রতি কেজি ৮০-১০০ টাকা, কুমরা প্রতি পিস আকার ভেদে ৩০-৫০ টাকা, লাল শাক ও পালং শাক প্রতি কেজি ৩০-৪০ টাকা এবং ডাটা প্রতি আঁটি ২০-৩০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

 

তবে এখন স্থিতিশীল রয়েছে ডিম, মাংস ও মাছের দাম। প্রতি হালি ডিম বিক্রি হচ্ছে ৩৪-৩৬ টাকা হালি দরে। শহরের বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে ব্রয়লার মুরগি প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ১২০-১৩০ টাকা এবং দেশি মুরগি বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৪৩০-৪৫০ টাকা। প্রতিটি হাঁস আকারভেদে বিক্রি হচ্ছে ৫০০-৬০০ টাকা দরে। গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৫৫০-৬০০ টাকা এবং খাসির মাংস ৮০০-১০০০ টাকা।

 

শহরের ৫নং মাছ ঘাটের বাজারসহ দিগুবাবুর বাজার, কালির বাজার, বাবুরাইল বউ বাজার এবং খানপুর বউ বাজারসহ বাজারগুলেতে প্রচুর মাছের সরবরাহ রয়েছে। আকার ও বাজারভেদে প্রতি কেজি রুই মাছ বিক্রি হচ্ছে ৩৫০-৬৫০ টাকা, কাতলা ও মৃগেল মাছ ৩০০-৬০০টাকা, পাঙ্গাস মাছ ১১০-১৪০টাকা, কই মাছ ১৪০-১৮০, তেলাপিয়া মাছ ১৩০-১৭০ টাকা, চিংড়ি মাছ ৬০০-১২০০ টাকা।

 

বর্তমানে বাজারে ইলিশ মাছের সরবরাহ দেখা যাচ্ছে প্রচুর পরিমাণে। প্রতিটি ১কেজি ওজনের কম-বেশি ইলিশ মাছ বিক্রি হচ্ছে ৬৫০-৮৫০ টাকা কেজি দরে।তবে হালিতেও বিক্রি হচ্ছে ইলিশ মাছ।আকারভেদে ১হালি ইলিশ মাছ ১ হাজার ৬০০ টাকা থেকে ৪ হাজার ৫০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

এই বিভাগের আরো খবর