বৃহস্পতিবার   ১৪ নভেম্বর ২০১৯   কার্তিক ৩০ ১৪২৬   ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

থামাতে হবে ইয়াবা ঢল! 

প্রকাশিত: ৩ অক্টোবর ২০১৯  

মরণ নেশা ইয়াবা বন্ধে ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ, সাঁড়াশি অভিযান, মামলা, আত্মসমর্পণ- সবই চলছে। কিন্তু তবু থামছে না ইয়াবার কারবার। বরং সড়কপথ, আকাশপথ, নৌপথ আর পাহাড়ি এলাকা দিয়ে পাচার হয়ে রাজধানীসহ সারাদেশে আসছে ইয়াবার বড় বড় চালান। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাদক বিরোধী সাঁড়াশি অভিযানের ফলে শহরে ইয়াবার ব্যবহার কমলেও গ্রামে বিস্তার বেশি। গ্রামাঞ্চলেই এখন ইয়াবার রমরমা ব্যবসা চলছে। 

 

তবে প্রশাসনের কঠোর অবস্থানে আগের চেয়ে ইয়াবা ব্যবসার জৌলুস অনেকটাই কমেছে। এখন কেউ প্রকাশ্যে ইয়াবা বিক্রি করছে না। কার্যক্রম চলছে গোপনে। সূত্র জানায়, দেশের গ্রামাঞ্চলে ইয়াবা এখন অনেকটা মহামারি রূপ নিয়েছে। প্রায় প্রতিটি গ্রামের আনাচেকানাচে পর্যন্ত বিস্তার ঘটেছে নীরব ঘাতক ক্রেজি ড্রাগ ইয়াবার।স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও বহন করছে এই মরণ বড়ি। রাজনীতিকদের একটি অংশ এই ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে। 

 

ইয়াবায় আসক্ত নেই এমন কোনো পেশার লোক পাওয়া যাবে না। শ্রমজীবী থেকে শুরু করে একেবারে সব পেশার মধ্যে ইয়াবা আসক্ত রয়েছে। গ্রামে ইয়াবা খাওয়ার যুক্তি হিসেবে বলা হচ্ছে, নিয়মিত ইয়াবা খেলে শরীরে শক্তি বাড়ে। তবে ইয়াবায় আসক্ত হওয়ার পর প্রথমে শক্তি বাড়লেও পরে ধীরে ধীরে শক্তি কমিয়ে দেয়। উত্তেজিত হয়ে আসক্তরা নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ে। ধর্ষণ ও খুনের মামলার আসামিদের অধিকাংশই ইয়াবায় আসক্ত।

 

মনোবিজ্ঞানীরা বলেছেন, সামাজিক অবক্ষয়ের মূলে এই ইয়াবা সেবন। এর কারণে সন্তান মা-বাবাকে মারছে। খুন, চুরি, ডাকাতির ঘটনাও ঘটছে। ইয়াবার ভয়াবহ আগ্রাসন আগামী প্রজন্মকে ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। ইয়াবার ভয়াবহ আগ্রাসন নিয়ে সরকার যেমন উদ্বিগ্ন, চিন্তিত অভিভাবক মহলও।ইয়াবা পাচারে একশ্রেণির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তা,রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা জড়িত থাকায় এটা নিয়ন্ত্রণ অনেকটা দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

ইয়াবার ভয়াবহ আগ্রাসন থেকে দেশকে রক্ষায় যুদ্ধ ঘোষণা করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।এরই অংশ হিসেবে গত এক বছর ধরে চলা ইয়াবা বিরোধী অভিযানে দেড় লাখের বেশি ইয়াবা কারবারিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। একই সময়ে র‌্যাব-পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছে চার শতাধিক ইয়াবা কারবারি।টানা অভিযানের মুখে প্রাণ বাঁচাতে ইয়াবার প্রধান রুট কক্সবাজারের টেকনাফের ১০২ জন ইয়াবা ব্যবসায়ী পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করে। তবে আত্মগোপনে চলে যায় বেশিরভাগ ব্যবসায়ী। ফলে ঠেকানো যায়নি ইয়াবার কারবার।

 

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া নজরদারির মধ্যেও হরদম চলছে ইয়াবা ব্যবসা। পাল্টে ফেলা হয়েছে ব্যবসার ধরনও। আগে টেকনাফ দিয়ে বেশিরভাগ ইয়াবা প্রবেশ করলেও বর্তমানে সমুদ্রপথ ও উখিয়ার দুর্গম পাহাড়ি পথ বেছে নিয়েছে কারবারিরা। আর ইয়াবার চালান দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দিতে নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে আকাশপথ। ভাড়া করা হচ্ছে পাকস্থলী। বিক্রির ধরনেও আনা হয়েছে ব্যাপক পরিবর্তন। বিভিন্ন অনলাইনে বিক্রি হচ্ছে ইয়াবা। অনেক ব্যবসায়ী আবার শুধু পুরনো কাস্টমারের কাছে বিক্রি করছে ইয়াবা। ফলে তাদের ধরতে হিমশিম খেতে হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে।

 


পুলিশের একাধিক সূত্র জানায়, প্রতিনিয়ত রুট ও ব্যবসার ধরন পরিবর্তন করায় নিয়ন্ত্রণে আসছে না ইয়াবা। এ ছাড়াও অনলাইনে ইয়াবা বিক্রির বিষয়টি অনেকটাই তাদের ভাবিয়ে তুলেছে। তবে এই চক্রকে ঠেকাতে র‌্যাব-পুলিশের সাইবার নিরাপত্তা বিভাগের একাধিক টিম কাজ করছে। ইতোমধ্যে বশ কয়েকটি সাইট ফেসবুক পেজ শনাক্ত করা হয়েছে। সরবরাহ কমে যাওয়ায় দাম বেড়েছে ইয়াবার। 

 


র‌্যাব-পুলিশের করা তথ্য-উপাত্তের পরিসংখ্যান বলছে, গত বছর ৪ মে থেকে শুরু হওয়া অভিযান জোরদার করা হয় ১৫ মে থেকে। এর মধ্যে র‌্যাব-পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছে এক লাখের বেশি ইয়াবা কারবারি। যার মধ্যে গত বছরের ৩ মে থেকে চলতি বছরের ১ মে পর্যন্ত র‌্যাব গ্রেফতার করেছে ২৪ হাজার ৮৯৮ জনকে। পুলিশ গত বছরের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত ১ লাখ ৪০ হাজার ৭৮৮টি মাদক মামলায় যে ১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৯৫ জন মাদক কারবারিকে গ্রেফতার করেছে। তাদের বেশিরভাগই এই মাদক অভিযানের সময়। 

 

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর গত বছরের মে মাস থেকে চলতি বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত ১৪ হাজার ৩০৭ জনকে গ্রেফতার করেছে। এ ছাড়াও বিজিবি, কোস্ট গার্ডের হাতেও ধরা পড়ে কয়েক হাজার ইয়াবা কারবারি। গত বছরের ৩ মে থেকে চলতি বছরের ১ মে পর্যন্ত শুধু র‌্যাবই উদ্ধার করেছে ৬০৪ কোটি ৮৪ লাখ টাকার মাদকদ্রব্য।


মানবাধিকারবিষয়ক সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যানুযায়ী, গত বছরের ১৫ মে থেকে চলতি বছরের ৯ মে পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে ৩২৯ মাদক কারবারি। এর মধ্যে ১০৯ জন র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে র‌্যাব।


বিশেষ অভিযানের মধ্যেও মাদকের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত কক্সবাজার, পটুয়াখালী, কুমিল্লা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, যশোর, সাতক্ষীরা ও ফেনীর মতো জেলাগুলোর সীমান্ত হয়ে এখনো দেশে ঢুকছে মাদক। বিশেষ করে কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রায়ই ধরা পড়ছে ইয়াবার ছোট-বড় চালান। 

 

এ ছাড়াও আকাশপথ ও পাকস্থলীতে করে ইয়াবা সরবরাহের চিত্র চোখে পড়ছে হরহামেশাই। চলতি বছরেই বিমানবন্দরে ৫টিরও বেশি ইয়াবার চালান ধরা পড়ায় বিষয়টি ভাবিয়ে তুলেছে সবাইকে। আর পাকস্থলী ভাড়াও যেন কৌশলের অংশ হয়ে উঠেছে। সর্বশেষ পাকস্থলীতে ইয়াবা বহন করতে গিয়ে মৃত্যু হয় জুলহাস নামে এক যুবকের। গত ২৭ এপ্রিল তার লাশের ময়নাতদন্ত করতে গিয়ে পেটের মধ্যে ১১ প্যাকেটে ১৫০০ পিস ইয়াবা পান চিকিৎসকরা।

 

ইয়াবা তরুণ প্রজন্মকে ধ্বংস করে দেয়া ভয়ঙ্কর ক্ষতিকর ড্রাগের নাম। মহামারী রূপ নিয়েছে এই ক্রেজি ড্রাগ ইয়াবা। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত বিস্তার ঘটেছে নীরব এই ঘাতক বড়ি ইয়াবা। এই ইয়াবা এখন মাদক রাজ্যে হট আইটেম। মাদক জগতে ফেনসিডিলই (ডাইল) ছিল সম্রাট। সেই ডাইলকে হটিয়ে দিয়ে শীর্ষস্থানে উঠে এসেছে বাবা (ইয়াবা)। যৌন উত্তেজক হওয়ায় মাদকাসক্ত তরুণ-তরুণীদের প্রথম পছন্দ এখন এই ইয়াবা। এখন যেখানে সেখানে হাত বাড়ালেই মেলে ভয়ংকর নেশা ইয়াবা। ইয়াবার ভয়াল থাবায় এতটাই ভয়াবহ হয়ে উঠেছে যে, স্কুল, কলেজ,বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী, তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, কতিপয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক দলের নেতা কেউই বাদ নেই ইয়াবার নীল ছোবল থেকে। তবে আসক্তদের মধ্যে ছাত্র-ছাত্রী এবং তরুণ-তরুণীর সংখ্যাই বেশি। 

 

বর্তমানে ইয়াবা সেবীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক তরুণী রয়েছে। সেই সাথে সেবনকারীদের তালিকায় স্কুল-কলেজ পড়ুয়া অনেক কিশোর ও তরুণও রয়েছে। পুঁজি কম আর ইয়াবা পরিবহন খুব সহজ তাই তরুণ সমাজও এটাকে বেছে নিয়েছে রাতারাতি টাকা কামানোর মন্ত্র হিসেবে। শিক্ষার্থীদের মাঝে এভাবে মাদক ছড়িয়ে পড়ায় শঙ্কিত হয়ে পড়েছে অভিভাবক মহল। 

 

এখন যেসব ইয়াবা পাওয়া যায় সেসব ইয়াবার নাম আবার বিচিত্র। নাম গুলো হলো- চম্পা, চম্পা সুপার, আর ৭০, আর ৮০, আর ৯০, জিপি, ঝাকানাকা, ডাব্লিউ ওয়াই, এনসিআরএস, ডাব্লিউ এক্স প্রভৃতি। মূলত: চম্পা, চম্পা সুপার, ঝাকানাকা নামের এসব ইয়াবা নকল ও ভেজাল। এগুলো মাদক কারবারী চক্র দেশের বিভিন্ন এলাকায় তৈরি করে বাজারজাত করে। তবে ভারত, থাইল্যান্ড ও মায়ানমার থেকে চোরাই পথে আসা যেসব ইয়াবা ঢুকে সেগুলো আসল তবে ক্ষতিকর। 

 

এনসিআরএস নামের লাল রঙের ইয়াবা ভারত ও মায়ানমার থেকে আসে। আর ডাব্লিউ ওয়াই ইয়াবা আসে থাইল্যান্ড থেকে। তবে বিদেশি ইয়াবার প্রতি ঝোঁক বেশি ধনরি বখে যাওয়া তরুণ-তরুণীর। যে দামেই হোক, তারা তা সংগ্রহ করে নিয়মিত সেবন করছে। ইয়াবার নেশায় বুঁদ হয়ে থাকছে দিন রাত। ইয়াবার ভয়াবহ ছোবল আগামীর প্রজন্মকে ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। এ অবস্থায় দেশ মেধা শূন্য হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। 

 

ইয়াবার ভয়াবহ আগ্রাসন নিয়ে চিন্তিত অভিভাবক মহল। ইয়াবাসেবীরা শুধু জীবনের করুণ পরিণতির শিকার হচ্ছে তাই নয়, মারাত্মক প্রতারণার শিকার হচ্ছে। অ্যামফিটামিন ও ক্যাফেইনের সংমিশ্রণে তৈরি ইয়াবা ট্যাবলেটের রয়েছে নানা ক্ষতিকর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া। শুধু এ দুটি উপাদান দিয়ে ইয়াবা তৈরি হচ্ছে তাই নয়, বিশেষজ্ঞগণ আশঙ্কা করছেন ইয়াবাকে আরো ভয়ঙ্কর নেশা ড্রাগ হিসেবে ব্যবহার করার জন্য এর মধ্যে মরফিন, হেরোইন, কোডিন মিশিয়ে ড্রাগসের তীব্রতা বাড়ানো হচ্ছে কি না তাও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা দরকার। 

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইয়াবা ট্যাবলেট সেবনকারীদের সাময়িক উত্তেজনা হলেও ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে যায় শরীরের নানা অঙ্গ। তৈরি হয় ক্ষতিকর মানসিক সমস্যা সিজোফ্রেনিয়া। যৌনশক্তি নিঃশেষ হতে থাকে, বুদ্ধিমত্তা হ্রাস পায়, এমনকি মাত্রাতিরিক্ত ইয়াবাসেবীদের হার্ট বিকল হয়ে মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে। তাই কোনোভাবেই ইয়াবা সেবন করা উচিত নয়। অনেকে ধারণা করেন, ইয়াবা সেবন করলে রাত জাগা যায়, এটাও ঠিক নয়। তাই ইয়াবার বিরুদ্ধে নিজে সোচ্চার থাকুন এবং অন্যদের ইয়াবা সেবন থেকে বিরত রাখুন। 

 

ইয়াবা ট্যাবলেটে আসক্ত শিক্ষিত তরুণ-তরুণীরাই বেশি। তাও তারা সাধারণ কিংবা মধ্যবিত্ত নয়, অভিজাত এলাকার ধনীর দুলাল-দুলালি। পিতা-মাতারা কোটি কোটি টাকার দিকে ছুটছে আর বিলাসবহুল জীবন-যাপন করে যাচ্ছে। কিন্তু তাদের আদরের দুলাল-দুলালিরা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়ার ফাঁকে মরণনেশায় আসক্ত। সেই দিকে অভিভাবক হিসেবে তাদের দৃষ্টি নেই। সন্তানরা চাওয়া মাত্রই দুই হাতে টাকার বান্ডিল ওই সকল পিতা-মাতা তুলে দিচ্ছে। পিতামাতা একটু সচেতন হলে ইয়াবার মরণছোবল হতে তাদের মেধাবী সন্তানদের রক্ষা সম্ভব হতো। 

 

ইয়াবা একবার সেবন করলে সে আর এটা ছাড়তে পারবে না। সে ইয়াবার পেছনে ছুটতে থাকবে। এ মরণনেশা চিকিৎসায় তেমন কোনো সুফল নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রথমদিকে ইয়াবা যৌনউত্তেজক বড়ি হিসাবে বাজারে পরিচিত ছিলো। কিন্তু দীর্ঘদিন সেবনের ফলে যৌন ক্ষমতা হ্রাস পেতে পারে। যুক্তরাজ্যের ড্রাগ ইনফরমেশন এর ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী ইয়াবা ট্যাবলেটটি খেলে সাময়িক ভাবে উদ্দীপনা বেড়ে যায়। কিন্তু এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হেরোইনের চেয়েও ভয়াবহ। নিয়মিত ইয়াবা সেবন করলে মস্তিষ্কে রক্ত ক্ষরন, নিদ্রাহীনতা, খিঁচুনি, ক্ষুধামন্দা এবং মস্তিষ্ক বিকৃতি দেখা যেতে পারে। ইয়াবা গ্রহণের ফলে ফুসফুস, বৃক্ক সমস্যা ছাড়াও অনিয়মিত এবং দ্রুতগতির হৃৎস্পন্দনের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। 

 

অতিরিক্ত হারে ইয়াবা গ্রহণ হাইপারথার্মিয়া বা উচ্চ শারীরিক তাপমাত্রার কারণ হতে পারে। অভ্যস্ততার পর হঠাৎ ইয়াবার অভাবে সৃষ্টি হয় আত্মহত্যা প্রবণতা এবং হতাশা। দীর্ঘদিন ধরে ইয়াবা খেলে স্মরণশক্তি কমে যায়, সিদ্ধান্তহীনতা শুরু হয় এবং কারও কারও ক্ষেত্রে সিজোফ্রেনিয়ার লক্ষণ দেখা দেয়। অনেকে পাগল হয়ে যায়। হতাশাজনিত নানা রকম অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পায়, এমনকি অনেকে আত্মহত্যাও করে থাকে। এছাড়া হার্টের ভেতরে ইনফেকশন হয়ে বা মস্তিষ্কের রক্তনালী ছিড়েও অনেকে মারা যান। অনেকে রাস্তায় দুর্ঘটনায় পতিত হন। কেউ কেউ টানা সাত থেকে ১০ দিন জেগে থাকেন।

 

ইয়াবার পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে বিশিষ্ট মনোচিকিৎসক ডা.মোহিত কামাল বলেন, নিয়মিত ইয়াবা সেবনে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ, নিদ্রাহীনতা, খিঁচুনি, মস্তিষ্ক বিকৃতি, রক্তচাপ বৃদ্ধি, অস্বাভাবিক হৃৎস্পন্দন, হার্ট অ্যাটাক, ঘুমের ব্যাঘাত, শরীরে কিছু চলাফেরার অস্তিত্ব টের পাওয়া, অস্বস্তিকর মানসিক অবস্থা, কিডনি বিকল, চিরস্থায়ী যৌন-অক্ষমতা, ফফুসফুসের প্রদাহসহ ফুসফুসে টিউমার ও ক্যান্সার হতে পারে। এ ছাড়া ইয়াবায় অভ্যস্ততার পর হঠাৎ এর অভাবে সৃষ্টি হয় হতাশা ও আত্মহত্যার প্রবণতা। 

 

তিনি আরও বলেন,এ মাদক সাধারণ শান্ত ব্যক্তিটিকেও হিংসা ও আক্রমণাত্মক করে তুলতে পারে। ইয়াবা গ্রহণে হ্যালুসিনেশন ও সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত হওয়াটা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। হ্যালুসিনেশন হলে রোগী উল্টোপাল্টা দেখে, গায়েবি আওয়াজ শোনে। আর প্যারানয়াতে ভুগলে রোগী ভাবে অনেকেই তার সঙ্গে শত্রুতা করছে। তারা মারামারি ও সন্ত্রাস করতেও পছন্দ করে। ইয়াবা আসক্ত তরুণ-তরুণীরা জীবিত থেকেও মৃত। বিয়ে করে কোনো লাভ হবে না। ইয়াবা আসক্ত তরুণ-তরুণীদের যৌন ক্ষমতা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আর ফিরে আসবে না। বিবাহিত ইয়াবা আসক্তদের ছাড়াছাড়ি পর্যন্ত হয়ে যায়।

 

বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা ইয়াবায় বেশি আসক্ত। এই সকল মেধাবী ছাত্র-ছাত্রী সহজেই ইয়াবা সেবনে উৎসাহিত হয়। তাদের বলা হয়, ইয়াবা সেবন করলে শরীর স্লিম হয়, শরীরে ফ্যাট জমবে না, মন সব সময় সতেজ থাকবে ও জ্ঞান-বুদ্ধি বাড়বে, লেখাপড়ায় উৎসাহ বেড়ে যাবে, ঘুম কম হবে ও ক্ষুধা কমে যাবে। শিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের এই ধরনের কথা বলে ব্যবসায়ীরা তাদের প্রভাবিত করে। ইয়াবা সেবনে প্রথমে যৌন উত্তেজনা, ঘুম কম ও ক্ষুধা কম হয়। এটা সীমিত সময়। ইয়াবা সেবনকারীরা মানসিক রোগে ভুগতে থাকে। অস্থির ভাব এবং যেকোনো সময় অঘটন তারা ঘটিয়ে ফেলতে পারে। বেশির ভাগ ইয়াবা আসক্ত সিজোফ্রেনিয়ার মতো মানসিক রোগের শিকার হয়। 

 

শিক্ষিত তরুণ সমাজকে রক্ষা করতে হলে ইয়াবার বিরুদ্ধে গণসচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি ব্যবসায়ী ও সেবনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। ইয়াবার মরণছোবল থেকে সন্তানদের রক্ষা করার মূল দায়িত্ব পিতা-মাতার এবং তারা একটু সচেতন হলেই আদরের দুলালরা ইয়াবার সর্বনাশা ছোবল থেকে রক্ষা পেতে পারে।

 

আসক্তদের জন্য নিজে নিজে আসক্তির পথ ছাড়ার চেষ্টা করতে পারা খুবই কঠিন হয়ে দাঁড়ায় যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং অভিভাবকের চোখে ধরা পড়ে। এজন্য যেভাবেই হোক অভিভাবকগণ তার সন্তানদের দিকে খেয়াল রাখবেন তার কী কী পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে এবং রোগ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য তার সাথে সহানুভূতিশীল আচরণের দ্বারা চিকিৎসার জন্য রাজি করাতে হবে।

 

দেশের যুবসমাজ ও ছাত্র সমাজকে চরম অধঃপতন থেকে উদ্ধার করতে হলে ইয়াবাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। দেশের সকল রুট এমনভাবে বন্ধ করতে হবে যে কোনো অবস্থাতেই ভয়ংকর নেশা ইয়াবা যেন প্রবেশ করতে না পারে। তরুণ-তরুণীরা ইয়াবাসক্ত হয়ে পড়লে তারা আর সঠিক পথে আসতে পারেনা।সঠিক পথে আনার ব্যবস্থা করলেও তারা নেশার তাড়নায় পূর্ব পথে ফিরে যায়। নেশার টাকা যোগাতে তারা চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, মাদক ব্যবসা কিংবা সন্ত্রাসে জড়িয়ে পড়ে। 

 

মাত্র ১৬-১৭ বছর বয়সী তরুণরা টাকার লালসায় অস্ত্র হাতে তুলে নেয়। তারা হয়ে ওঠে হিংস্র বেপরোয়া। শুধু তাই নয়, ভয়াবহ মাদক ‘ইয়াবা’ সেবনে মানুষ এতটাই হিংস্র হয়ে ওঠে যে, তারা অনায়াসে মানুষ খুনও করতে পারে। তাদের ন্যায়-অন্যায়বোধ লোপ পায়, লজ্জাবোধও থাকে না এবং মানুষ অপরাধ প্রবণ হয়ে ওঠে। ইয়াবাসক্তের এই বীভৎস কর্মকাণ্ড যেভাবেই হোক বন্ধ করতে হবে। তা না হলে দেশ আরও সঙ্কটে পড়বে। আগামী প্রজন্মকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষায় ইয়াবার ভয়াবহ আগ্রাসন বন্ধ করতে হবে। আর যে কোন মূল্যে “থামাতে হবে ইয়াবা ঢল’।    
                                                                                                                                                               
আশিকুর রহমান হান্নান

লেখক : সাংবাদিক, চ্যানেল জিটিভি