সোমবার   ২৫ মার্চ ২০১৯   চৈত্র ১১ ১৪২৫   ১৮ রজব ১৪৪০

ত্বকী হত্যা ও একটি বিচারহীনতার ৬ বছর

প্রকাশিত: ৫ মার্চ ২০১৯  

তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যার ৬ বছর পূর্ণ হলো, আবার একটি বিচারহীনতাও ৬ বছর পেরিয়ে গেল। ৬ মার্চ ২০১৩ বিকেলে পাঠাগারে যাওয়ার পথে নারায়ণগঞ্জের বঙ্গবন্ধু সড়ক থেকে মেধাবী কিশোর ত্বকীকে অপহরণ করা হয়। ঐ রাতেই ত্বকীর পিতা রফিউর রাব্বি নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় বিষয়টি উল্লেখ করে সাধারণ ডায়েরী করেন এবং র‌্যাব ১১ এর কার্যালয়ে চিঠি দেন।


এর পরদিন ত্বকীর এ-লেভেল পরীক্ষার প্রথম পর্বের ফল প্রকাশিত হয়। ত্বকী সে পরীক্ষায় পদার্থ বিজ্ঞানে ২৯৭/৩০০ ও রসায়নে ২৯৪/৩০০ নম্বর পায়। পদার্থ বিজ্ঞানে এইটি ছিল বিশ্বের সর্বোচ্চ নম্বর এবং রসায়নে দেশের সর্বোচ্চ নম্বর। এর পর দিন ৮ মার্চ সকালে শীতলক্ষ্যা নদীর খালের পাড় থেকে পুলিশ ত্বকীর লাশ উদ্ধার করে।


৮ মার্চ রাতেই ত্বকীর পিতা বাদী হয়ে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় দ- বিধি ৩০২/৩৪ ধারায় আসামী অজ্ঞাত উল্লেখ করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন এবং ১৮ মার্চ জেলা পুলিশ সুপারের কাছে ত্বকী হত্যার জন্য তিনি শামীম ওসমান ও তার ছেলে অয়ন ওসমানসহ আটজনের নাম উল্লেখ করে একটি অবগতিপত্র দেন। তদন্তে মামলাটির আশানুরূপ অগ্রগতি না হওয়ায় রফিউর রাব্বির আবেদনের প্রেক্ষিতে ২৮ মে ২০১৩ উচ্চ-আদালত মামলাটি তদন্তের জন্য র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটেলিয়ন (র‌্যাব) কে নির্দেশ দেন। 


সে বছর ২৯ জুলাই ইউসুফ হোসেন লিটন নামের এক ঘাতক আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। সে জবানবন্দিতে ত্বকীকে কখন, কীভাবে, কোথায়, কারা কারা এবং কেন হত্যা করেছে তার বিশদ বর্ণনা দেয়। তার বর্ণনা অনুযায়ি অপহরণের রাতেই তারা ত্বকীকে প্রথমে গজারির লাঠি দিয়ে পিটিয়ে অজ্ঞান করে এবং পরে কালাম সিকদার নামের এক ঘাতক তার বুকের উপর উঠে গলা চেপে শ্বাস রোধ করে হত্যা করে। রাত ১১টার মধ্যেই তারা ত্বকীকে হত্যা করে এবং পরে লাশ শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলে দেয়।


ঘাতকের এই জবানবন্দির কিছুদিন পর ৭ আগষ্ট র‌্যাব শামীম ওসমানের ভাতিজা সে সময়ের সংসদ সদস্য নাসিম ওসমানের ছেলে আজমেরী ওসমানের উইনার ফ্যাশন খ্যাত টর্চারসেলে অভিযান পরিচালনা করে। সেখানে তারা দেয়ালে ও আসবাব পত্রে গুলির চিহ্ন দেখতে পান এবং সেখান থেকে রক্তমাখা প্যান্ট, দড়ি, রক্তমাখা গজারির লাঠি, ইয়াবা সেবনের সরঞ্জামাদি, পিস্তলের অংশ সহ বিভিন্ন বস্তু আলামত হিসেবে সংগ্রহ করেন।


সে বছর ১২ নভেম্বর সুলতান শওকত ভ্রমর নামে অপর এক ঘাতক আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। জবানবন্দিতে সেও ত্বকীকে হত্যার বিশদ বিবরণ দেয়। সে তার বিবরণে উল্লেখ করে আজমেরী ওসমানের নির্দেশে তার টর্চারসেলে তারই উপস্থিতিতে ত্বকীকে রাত ১২টার আগেই তারা হত্যা করেছে। পরে আজমেরীর গাড়িতে করেই তারা ত্বকীর লাশ শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ে নিয়ে যায় এবং লাশ নৌকায় করে নিয়ে যেয়ে নদীতে ফেলে দেয়। 


ত্বকী হত্যার ১ বছরের মাথায় ৫ মার্চ ২০১৪ র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক জিয়াউল হাসান র‌্যাবের প্রধান কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমকে ত্বকী হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনের বিষয়টি অবহিত করেন। তারা উল্লেখ করেন আজমেরী ওসমানের নেতৃত্বে ১১ জন ত্বকীকে হত্যা করেছে।


হত্যার কারণ হিসেবে তারা উল্লেখ করেন ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বি ২০১১ সালে অনুষ্ঠিত নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে সেলিনা হায়াৎ আইভীর পক্ষ শক্ত অবস্থান গ্রহণ, এর কিছু দিন পূর্বে গণ পরিবহনে শামীম ওসমান ও তার অনুগত লোকদের ব্যাপক চাঁদাবাজীর বিরুদ্ধে নারায়ণগঞ্জবাসীকে ঐক্যবদ্ধ করে তার আন্দোলন, এবং চিহ্নিত গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ভূমি দখলের প্রতিবাদে জনগণের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে তারা ত্বকীকে হত্যা করে। তখন র‌্যাব উপস্থিত সাংবাদিকদের একটি অভিযোপত্রও সরবরাহ করেন। এবং অচিরেই তা আদালতে পেশকরা হবে বলে জানান। 


৬ বছর অতিবাহিত হলেও র‌্যাবের প্রস্তুত করা সে অভিযোগপত্রটি আজও পর্যন্ত আদালতে পেশ করা হয় নাই। যার ফলে আদালতে ত্বকী হত্যায় ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়া ঘাতক সুলতান শওকত ভ্রমর ও ঘাতক ইউসুফ হোসেন লিটন সহ সকলেই উচ্চ-আদালত থেকে জামিন নিয়ে বেড়িয়ে যায়। পরে ঘাতকদের কেউ বিদেশে পালিয়ে যায় এবং কেউবা দেশেই ঘুড়ে বেড়াচ্ছে।


যে ঘাতকের টর্চার সেলে ত্বকীকে হত্যা করা হয়েছে বলে র‌্যাব সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করে, যার উপস্থিতিতে ও নেতৃত্বে হত্যা করা হয়, এবং যার গাড়ি দিয়ে নিয়ে ত্বকীকে শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলেদেয়া হয় সে আজমেরী ওসমানকে র‌্যাব আজও পর্যন্ত গ্রেপ্তারই করে নি। এখন আজমেরী ওসমান প্রশাসনের সামনেই বীরদর্পে ঘুড়ে বেড়াচ্ছে; ক্ষণে ক্ষণে তার ছবি সংবলিত বিলবোর্ডে শহর ছেয়ে যাচ্ছে।


অন্যদিকে শামীম ওসমান ত্বকী হত্যার বিচারপ্রার্থীদের নানাভাবে ভয়ভীতি দেখিয়ে নিবৃত করতে ব্যর্থ হয়ে তাদেরকে হামলা করে, মামলাদিয়ে নির্যাতনের বিভিন্ন পথ অব্যাহত রেখেছে। বহু সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কর্মী বিভিন্ন সময় তার হামলার শিকার হয়েছে, রক্তাক্ত হয়েছে, রবীন্দ্রজয়ন্তী সহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তারা হামলা চালিয়েছে। শামীম ওসমান বিচারপ্রার্থীদের বাড়ির ইট খুলে আনার হুমকি দিয়েছে।


নাসিম ওসমান আমাদেরকে পিঁপরের মতো পায়ে পিষে মারার হুমকি দিয়েছে, লাশ বানিয়ে টুকরো-টুকরো করে কেটে শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলে তা মাছ দিয়ে খাওয়ানোরও ঘোষণা দিয়েছে। শামীম ওসমান ত্বকীর পিতা রফিউর রাব্বির বিরুদ্ধে একরে পর এক মামলা দিয়েছে, ধর্ম-অবমাননার মিথ্যা অভিযোগ এনে হেফাজতে ইসলামকে দিয়ে মামলা করিয়েছে, তাদের নিয়ন্ত্রিত মসজিদে মসজিদে মিথ্যা খুদবা দিয়ে জনতাকে উত্তেজিত করার চেষ্টা করেছে, হেফাজতকে দিয়ে মিছিল করিয়েছে আবার সে মামলায় যাতে রফিউর রাব্বি আদালতে যেতে না পারে তার জন্য হেফাজত ও তার অনুগত ছাত্রলীগ-যুবলীগ পরিচয়ধারী ক্যাডারদের দিয়ে আদালত প্রাঙ্গণে লাশ চাই, কল্লা চাই বলে মহড়া দিয়েছে। হেফাজতকে নিয়ে সমাবেশ করে কতল করারও হুমকী দিয়েছে। 


ত্বকী হত্যার প্রতিবাদে ৯মার্চ নারায়ণগঞ্জে অভাবনীয় হরতাল পালিত হয়। এর পর খেকে আন্দোলন আর থেমে নেই। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সহ দেশের অধিকাংশ জেলায় প্রতিবাদ সমাবেশ, মিছিল, মানব বন্ধন ইত্যাদি পালিত হয়েছে, এখনো হচ্ছে। আমেরিকা, কানাডা, জার্মান, ফ্রান্স, বৃটেন, অষ্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, কোরিয়া, ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হত্যার প্রতিবাদে কর্মসূচি পালিত হয়েছে।


ত্বকীর মৃতদেহ উদ্ধারের দিনটিকে কেন্দ্রকরে প্রতি মাসের ৮তারিখ ৬বছর ধরে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। ত্বকীকে নিয়ে অসংখ্য কবিতা, রচনা, গান তৈরী হয়েছে, ছবি আঁকা হয়েছে, বহু প্রমাণ্যচিত্র নির্মিত হয়েছে, ৮/১০টি গ্রন্থ রচিত হয়েছে। চার বছর ধরে জাতীয়ভাবে রচনা ও ছবি আঁকা প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। যেখানে দেশের প্রতিটি জেলারই হাজার হাজার প্রতিযোগী অংশগ্রহণ করছে। কিন্তু ত্বকী হত্যার আজও বিচার হয়নি। ঘাতকের প্রতি সরকার ও রাষ্ট্রের নগ্ন অবস্থানের এইটি একটি নির্লজ্জ উদাহরণ।


৩০ এপ্রিল ২০১৪ সংসদ সদস্য নাসিম ওসমান মৃত্যুবরণ করলে জাতীয় সংসদে আনিত শোক প্রস্তাবের আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী ওসমান পরিবারের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতির কথা জানান; এবং এর পর থেকেই কার্যত ত্বকী হত্যার তদন্ত কার্যক্রম থেমে যায়। আজকে রাষ্ট্রে সংগঠিত বিভিন্ন ঘটনাবলীর মধ্যদিয়ে বিচারিক প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রের বৈষম্যমূলক আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গির নগ্ন বহিঃপ্রকাশ পরিলক্ষিত হচ্ছে। রাষ্ট্রে সংগঠিত বিভিন্ন ঘটনাবলী প্রমাণ করে যে, সরকার তার রাজনৈতিক প্রয়োজনে কোন কোন বিচার সম্পন্ন করে এবং রাজনৈতিক প্রয়োজনেই কোন কোন অপরাধের বিচারকার্য বন্ধ করে রাখে।


এই পরিস্থিতিতে আজকে রাষ্ট্রের শক্তিশালী একটি স্তম্ভ বিচার ব্যবস্থার উপর থেকে মানুষের আস্থা ও ভরসার জায়গাটি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। বিচার ব্যবস্থা ও সুশাসন ধ্বংস হয়ে গেলে রাষ্ট্রের আর গণতান্তিক চরিত্র থাকে না, রাষ্ট্র দেউলিয়া হয়ে পড়ে। মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে আমরা দেউলিয়া দেখতে চাই না। আর চাইনা বলেই আর বিলম্ব না করে ত্বকী হত্যার সকল ঘাতকদের ও হত্যার নির্দেশদাতাদের গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় আনতে এবং আদালতে অভিযোগপত্র প্রদান করে বিচার সম্পন্ন করার দাবি জানাচ্ছি। আর তাই বিচার সম্পন্ন করার জন্য জন্য প্রধানমন্ত্রীকেই নির্দেশ প্রদানের জন্য আহ্বান জানাচ্ছি।

 

হালিম আজাদ 
লেখক : সদস্য সচিব-সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চ, কবি ও সাংবাদিক।
 

এই বিভাগের আরো খবর