মঙ্গলবার   ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০   ফাল্গুন ১৩ ১৪২৬   ০১ রজব ১৪৪১

টানবাজার তার গুরুত্ব হারাচ্ছে

প্রকাশিত: ২৫ জানুয়ারি ২০২০  

নুসরাত জাহান সুপ্তি (যুগের চিন্তা ২৪) : টানবাজার। নারায়ণগঞ্জের প্রসিদ্ধ বাজারগুলোর অন্যতম এক নাম। শতবছরের পুরোনো এই বাজার এক সময় দিনব্যাপী ব্যবসায়ী, ক্রেতা-বিক্রেতার আনাগোনায় গমগম করলেও সময়ের বিবর্তনে বাজারটি এখন অনেকটাই শান্ত।

 

ব্যবসায়িক দিক থেকে এখনো অনেক গুরুত্বপূর্ণ হলেও জৌলুশ কমেছে টানবাজারের। অনেক ব্যবসায়ী নিজেদের ব্যবসা গুটিয়ে নিয়ে অন্য পেশা বেছে নিচ্ছেন।

 

টানবাজারের ইতিহাস ঘেটে যতটুকু জানা যায়, নারায়ণগঞ্জ প্রতিষ্ঠার পর থেকেই টানবাজারের যে আলাদা গুরুত্ব তৈরি হয় এবিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। ১৮৭৬ সালে পৌরসভা গঠনকালে ২ নম্বর ওয়ার্ডের একটি মহল্লার নাম ছিল ‘উত্তর টানবাজার’।

 

নদী পাড়ের উঁচু জায়গাকে কথ্য ভাষায় ‘টান’ বলা হয়। এশব্দটি সাধারণ নৌকার মাঝিমাল্লারা ব্যবহার করে থাকে। যেমন নদীপাড়ে নৌকা ভিড়িয়ে মাঝিরা বলে-‘একটু টানের থেকে আসি’ বা ‘টান থেকে একটু ঘুরে আসি’। 

 

ধারণা করা হয়, শীতলক্ষ্যা নদী পাড়ের এ জায়গাটিতে ওই সময়ই একটি বাজার গড়ে ওঠে। তখন নৌযানের বিশেষ করে নৌকার মাঝিমাল্লারা বাজারটিকে টানবাজার নামে আখ্যা দেয়। পরে সকলের নিকট এলাকাটি টানবাজার নামেই পরিচিতি লাভ করে। পরে অবশ্য টানবাজার পার্ক ২২৩টি দোকানে দোকানে ঠাসা ছিলো। 


কিন্তু তখন হংস হলের উত্তর সীমানা থেকে আশা সিনেমা হলের দক্ষিণ দিক পর্যন্ত ছিল একটি খোলা ময়দান। অবশ্য এরও পূর্বে এখানে একটা বিরাট ডোবা ছিল, যা পৌরসভা ভরাট করে মাঠে রূপান্তরিত করে। কালের বিবর্তনে টানবাজার পরবর্তীতে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জমজমাট প্রাণকেন্দ্র হয়ে ওঠে। 

 

নারায়ণগঞ্জ জেলার প্রবেশপথের একেবারে মুখে ভৌগলিক অবস্থান হওয়ায় সুতা ব্যবসা, ডাইস ক্যামিকেল ব্যবসা, স্বর্ণ ব্যবসা, ব্যাকিং সুবিধা অধ্যুষিত এলাকা হওয়ায় প্রাচ্যের ডান্ডি নারায়ণঞ্জ শহরের ব্যস্তততম ব্যবসার কেন্দ্রস্থল হয়ে ওঠে এই টানবাজার। তবে টানবাজারের নাম শুনে একসময় অনেকেই নাক সিটকাতেন। 

 

সব কিছু ছাপিয়ে  টানবাজারের খ্যাতি ছিলো দেশের বৃহত্তম পতিতাপল্লীটির অবস্থানের জন্য। যা নব্বই দশকের শুরু থেকেই ধীরে ধীরে  উচ্ছেদ হতে থাকে । এখান থেকে বিতাড়িত হয় কয়েক হাজার পতিতা। এই পতিতাপল্লীটির ভিতর ছিলো ৮/১০টি  ৪তলা বিল্ডিং, বেশ কিছু দোকানপাট। ছোট ছোট খুপড়ি ঘরেই ছিলো পতিতাদের বাস। 


একেকটি  খুপড়ি ঘরের মালিকানা ছিলো সর্দারনীদের হাতে। পতিতাপল্লীর আয়ের পয়সার ভাগ নিয়ে বাড়ির মালিক, থানার মাসোহারা, দালাল, একশ্রেণির রাজনৈতিক নেতাদের মাঝে চরম বিরোধ ও সংর্ঘষ ছিলো নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। 


১৯৯৯ সালের ২৪ জুলাই টানবাজার ও নিমতলী যৌনপল্লী উচ্ছেদ হয়ে গেলেও  কালের সাক্ষী হয়ে এখনো টিকে আছে সেই বিল্ডিংগুলো। তবে সময়ের বিবর্তনে বাড়ির মালিকদের কোমর আরও শক্ত হয়েছে। টানবাজারে ইটের উপর ইটের গাঁথুনিতে বহুতল ভবন নির্মাণ হয়েছে, হচ্ছে। রমরমা ব্যবসা হচ্ছে সুতা-কাপড় আর ক্যামিকেলের। 

 

টানবাজারের ব্যবসায়ীদের এখন প্রধান ব্যবসা সুতার উৎপাদন। সুতা তৈরীকে কেন্দ্র করে চলছে আরো বেশ কিছু ব্যবসা। কিন্তু দিনে দিনে এসব ব্যবসাতেও মন্দা দেখা দিয়েছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা। একই অবস্থা ক্যামিকেল ও স্বর্ণ ব্যবসায়ে। এসকল ব্যবসায়ের প্রভাব পড়েছে টানবাজারের ব্যাংকিং খাতেও। অনেক ব্যাংকেই লেনদেননের হার অনেক কমেছে।


সরেজমিনে টানবাজার এলকার ঘুরে দেখা যায়, টানবাজারের রূপ ক্রমশ বদলাচ্ছে। বদলেছে নামও। একসময় টানবাজারে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল ‘টানবাজার পার্ক’। ৭০ বছরের আগে শহরের প্রধান মার্কেট ‘টানবাজার পার্ক’ ২০১৯ সালের ২৬ আগস্ট নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন গুড়িয়ে দেয়ার পর এখন এখানে বহুতল ভবন নির্মাণ ও শহরের সর্বোচ্চ পার্কিং ব্যবস্থা তৈরির কাজ করা হচ্ছে। 


টানবাজার পার্কের পাশেই মিনাবাজারও এখন আর ততোটা জমজমাট না। টানবাজার পার্কের সুতা, কাপড়, রং, ক্যামিকেল ব্যবসায়ীরা আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দোকান দিয়েছে। টানবাজারের সাধনা ঔষধালয় ধংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। টানবাজারের যে সড়কটি মালবাহী গাড়িতে ব্যস্ত থাকত। 


এক গাড়ির পিছনে অন্য গাড়িতে লাইন ধরে পণ্যের আনা-নেওয়া হতো। কিন্তু এখন সুতার দোকানে বিক্রেতারা বসে আড্ডা দেয়। একই অবস্থা ক্যামিকেলের দোকানেও। বাজারের স্বর্ণব্যবসায়ীরা মাছি মারছে। দোকান খুললেও দোকানে ক্রেতা নেই।  


সুতা ব্যবসা :

সারাদেশে সুতার তৈরীর জন্য প্রসিদ্ধ টানবাজার। দেশি সুতা তৈরী করা হয়। দেশের সর্বস্তরে এখান থেকে পণ্য সরবরাহ করা হয়। কিন্তু দিনে দিনে বিদেশি সুতার চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশি সুতা বিক্রি হ্রাস পেয়েছে। সুতার বিক্রি কমে যাওয়ায় দিনে দিনে টানবাজার সুতা ব্যবসায়ীরা ব্যবসায়ের প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে।


সুতা ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘১০০ জনে ১০ জন বিক্রেতার দোকান থেকে সুতা বিক্রি হয়। খালি খালি দোকান খুইলা রাখি। কোন কেনাবেচা নেই। অনেক ব্যবসায়ীদের এখানেও দোকান আছে আবার অন্যান্য জেলায় দোকান আছে। তারাই কোন রকম বিক্রি করতে পারে। এখান থেকে সুতা নিয়ে অন্য জায়গায় বিক্রি করে। আমাদের এইখানে কেনাবেচা অনেক কম।’


অপর এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘এখান থেকে সুতা নিয়ে মাধবধী, নরসিংদীতে পোশাক তৈরি হয়। এজন্য এখন সেখানেই সুতা বিক্রি হয়। এদিক থেকে আগে সুতা নিয়ে যাইতো। কিন্তু এখন তারা ওইখান থেকেই সুতা নিয়ে কাপড় তৈরি করে। এখানে সুতা তৈরী হলেও গ্রাহকের চাহিদা কম। সুতা বিক্রি কম হয়।’


ক্যামিকেল ব্যবসা :

প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ক্যামিকেল ব্যবসায় টানবাজারের ক্যামিকেল ব্যবসাতেও ধ্বস নেমেছে। ক্রেতার চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত ক্যামিকেল বাজারে থাকায় ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন ক্যামিকেল ব্যবসায়ীরা।


ক্যামিকেল ব্যবসায়ী শহীদুল ইসলাম টানবাজারের ব্যবসায়ের স্বর্ণযুগের কথা মনে করে বলেন, ‘এখন কি আর ব্যবসা করি! ব্যবসা ছিল ২০-২৫  বছর আগে। বহুত লাভ হইতো। কিন্তু এখন আর সেই অবস্থা নেই। ব্যবসা করতাছি। কিন্তু তেমন লাভ হয় না এখন। কোন রকম চইলা ফেইরা আছি একরকমে।’


স্বর্ণ ব্যবসা :

স্বর্ণ ব্যবসায়ের জন্য বহুল পরিচিত মিনাবাজার। জেলাসহ জেলার বাহিরের ক্রেতাদেরও ছিল ব্যাপক সমাগম। কিন্তু আজ মার্কেটে ক্রেতাদের সংখ্যা নেই বললেই চলে। পূর্ব পুরুষের ব্যবসা ধরে রেখে ব্যবসা করছেন একাধিক ব্যবসায়ী। মিনা বাজারের বিপরীতে মৃধা অলংকার প্লাজায় কিছু সংখ্যক পরিচিত জুয়েলার্সের দোকানে কেনাবেচা থাকলেও মিনাবাজারের ব্যবসায়ের অবস্থা মন্দা।  মিনা বাজারের ৮২ বছরের ঐতিহ্যবাহী হক জুয়েলার্স ব্যাপক ক্ষতিতে ঝুঁকছে। 


‘হক জুয়েলার্সে’র ম্যানেজার সজিব বলেন, ১৫-২০ বছর আগে মাসে ২০০-৩০০ ভরিরও ব্যবসা হইতো এখন মাসেও ৫০ ভরির ব্যবসা হয় না। যে আয় হয় সেই আয় দিয়ে দোকানের শ্রমিকের খরচ দিয়ে কিছুই থাকে না। এই মার্কেটের অনেক দোকান এখন চলেই না। পাওনাদারের টাকা না দিতে পাইরা দেওলিয়া হয়ে গেছে।


বিগত ১৫ দিনে লেনদেনে করতে না পারার আক্ষেপ নিয়ে পিন্টু জুয়েলার্সের মালিক হাসানুজ্জামান পিন্টু বলেন, ১৫ দিন যাবৎ ব্যবসায়ে বিসমিল্লাহ করতে পারি নাই। একসময় যেরকম জমজমাট ব্যবসা ছিল এই মার্কেটে সেই রকম ব্যবসা এখন নেই। ব্যবসায়ের চালান ভাইঙ্গা ভাইঙ্গা দোকানের খরচ চালাইতাছি। পারলে দোকান বন্ধ করে  দেই। 


ব্যাংকিং ব্যবসা :

টানবাজারে বাংলাদেশে ভালো ব্যাংকগুলোর অধিকাংশ ব্যাংকের শাখা রয়েছে। টানবাজারের ব্যবসায়ের অস্থিরতার প্রভাব পড়েছে টানবাজারের ব্যাংকিং খাতেও। ব্যাংক গুলোতে লেনদেনের পরিমাণ কমেছে বলে জানান তারা। এই বাজারের ব্যবসায়িক লেনদেনের উপর ব্যাংকের মুনাফার অনেকাংশ নির্ভর করে বলে জানায় বিভিন্ন ব্যাংকের কর্মকর্তা।


রূপালি ব্যাংকের সহকারী মহাব্যবস্থাপক শাহনাজ মেহবুবা বলেন,  ‘ব্যাংকে পূর্বের তুলনায় লেনদেন হয়না বললেই চলে। লেনদেন খুবই কম। লেনদেন কমে যাওয়ার একাধিক কারণ রয়েছে। তবে অনেক বড় একটি কারণ টানবাজারের ব্যবসায়ীদের আর্থিক অবস্থা। টানবাজারে ব্যবসা ভালো হয় না বিধায়ই ব্যাংকে লেনদেন কম হয়।’  


ঢাকা ব্যাংকের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকতা বলেন, ‘আমাদের লেনদেন এখন অর্ধেক কমে গেছে। টানবাজারে ব্যবসায়ের লেনদেন না হলে আমাদের লেনদেনও কমে যায়। ১৯৯৫ সালে এই শাখা খোলা হয়। তখন ব্যাংকে যে পরিমান লেনদেন হতো সেই পরিমাণ লেনদেন এখন হয় না।’


টানবাজারের জৌলুশ কমার কারণ ব্যবসায়ীদের চোখে : 

টানাবাজারের ব্যবসায়ের মন্দা অবস্থার বিশেষ কিছু কারণ থাকলেও প্রধান কারণ হিসেবে ব্যবসায়ীরা জানান, টানবাজারে ৪০০ বছরের পুরাতন পতিতা পল্লী ছিল। এছাড়া শীতলক্ষ্যা নদীর পাশ ঘেষেঁই এই টানবাজারের অবস্থান। নদীর এই পাড়ে নগরায়নের ফলে বিভিন্ন জেলার থেকে প্রতিদিন কমপক্ষে ২৫ হাজার মানুষ এখানে আসত। 


মানুষের আনাগোনায় টানবাজারের ব্যাপক পরিচিতি ছিল। যার ফলে এখানে সব ব্যবসায়ীদের ব্যবসা ভালো হতো। এখনো কয়েকটি ব্যবসায় প্রসার থাকলেও পতিতা পল্লী উচ্ছেদের পর থেকে ব্যবসায়ীদের লেনদেন হ্রাস পেতে শুরু করে। 


এছাড়াও টানবাজারের বহু পরিচিত সাধনা ঔষাধালয়, আশা  হল, মাশা হল, হংস হল এখন বন্ধ। এসব প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে এই বাজারে প্রতিদিন প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের সমাগম হতো। এসকল কারণে এখানের ব্যবসা ছিল জমজমাট। ব্যবসায়ীদের আগের উচ্ছাস ও আমেজ যা এখন নেই।


বাংলাদেশ টেক্সটাইল ডাইস এন্ড ক্যামিকেল মার্চেন্ট এসোসিয়েশনের সহকারী সভাপতি মোজাম্মেল হক ব্যবসায়ের অবনতির কারণ হিসেবে বলেন, ‘টানবাজারে ক্যামিকেল ব্যবসায়ের অবস্থা খারাপ হওয়ার মূল কারণ বন্ড লাইসেন্স। সরকার গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি গুলোকে বন্ড লাইসেন্স দিয়েছে। গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির মালিকেরা তার অপব্যবহার করছে। 


তারা তাদের প্রয়োজনীয় পণ্যের অতিরিক্ত পন্য আমদানি করে। পরবর্তীতে সেই ক্যামিকেল বাজারে ছাড়ে। এই কারণে যে  তিক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা সৃষ্টি হয় সে জন্য টানবাজারের ক্যামিকেল বাজারের ভালো ব্যবসা হচ্ছে না।’


বাংলাদেশ ইয়ার্ণ মার্চেন্টস এসোসিয়েশনের সভাপতি লিটন দাস বলেন, ‘টানবাজারের ব্যবসায়ীদের অবস্থার কিছুটা ভিন্ন মত পোষণ করে বলেন, নারায়ণগঞ্জের টানবাজার থেকে সারা দেশে রঙ-সুতা পাঠানো হয়। টানবাজারে নতুন ব্যবসায়ী  হয়েছে। নতুন সুতার মিল হয়েছে। ব্যবসায়ে ব্যাপক প্রতিদ্বন্দ্বী তৈরী হয়েছে। ব্যবসায়েও অনেক পরিবর্তন আসছে। তারপরেও সকলের ব্যবসা মোটামোটি ভালোই চলছে।’


 

এই বিভাগের আরো খবর