শনিবার   ১৬ নভেম্বর ২০১৯   অগ্রাহায়ণ ১ ১৪২৬   ১৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

জেলা জুড়ে বালু উত্তোলনের মহোৎসব : বিপর্যয়ে পরিবেশ

প্রকাশিত: ১২ জুলাই ২০১৮  

মাহফুজ সিহান (যুগের চিন্তা ২৪) : নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসনের ১৪টি বালুমহালের মধ্যে ১০টি অবস্থিত সোনারগাঁ উপজেলা আর বাকি ৪টি বালুমহাল রয়েছে আড়াইহাজার উপজেলায়। তবে এগুলোর মধ্যে মাত্র ৩টি বালু মহাল ইজারা নিয়ে সচল রয়েছে বলে জানা যায়।

জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী ২০১৭ সালে নারায়ণগঞ্জের ১৪টি বালু মহালের মধ্যে ৩টি বালু মহাল থেকে বালুমহাল থেকে বালু উত্তোলনের জন্য ইজারা দেয়া হয়েছে। সেগুলো হচ্ছে সোনারগাঁয়ের চর লাউয়াদি চররমজান সোনাউল্লাহ (৬), আনন্দবাজার বালু মহাল এবং আড়াইহাজারের ডিকচর বালু মহাল।

 

২০১৭ সালে এ তিনটি বালু মহাল ইজারা দিয়ে ৭৬ লাখ ৪৪ হাজার টাকা আদায় করেছে প্রশাসন। তবে এগুলোর প্রায় প্রত্যেকটির বিরুদ্ধেই রয়েছে ইজারাকৃত নির্দিষ্ট অঞ্চল ব্যতিরেকে অবৈধভাবে বাইরে থেকেও বালু উত্তোলন করার।

 

অথচ সোনারগাঁয়ের চর কিশোরগঞ্জ বালু মহাল (১), চর কিশোরগঞ্জ বালু মহাল (২), চর রমজান সোনাউল্লাহ (১), চর রমজান সোনাউল্লাহ (৪), চর লাউয়াদি চর রমজান সোনাউল্লাহ (৫), চর হোগলা বালু মহাল, ঝগড়াচর দক্ষিণ নয়নপুর, দক্ষিণ নয়নপুর দক্ষিণবন্ধ, ডেঙ্গুর কান্দি বালু মহাল সবগুলোই জেলা প্রশাসনের মতে মৃত বিধায় ইজারা দেয়া সম্ভবপর হয় নি।

 

এ ১৩টি মৃত বালু মহাল ব্যবহার করে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতির মুখোমুখি ঠেলে দেয়া হয়েছে। হিসেবের বাইরে থেকে নদী অধ্যুষিত এলাকাগুলোতেও বিভিন্ন জায়গা থেকে রাতের আধারে বালু উত্তোলন করছে অসাধু ব্যবসায়ীরা।

 

ইজারাকৃত বালু মহল ছাড়াও অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলে ইতিমধ্যে মেঘনা নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে অনেক গ্রাম। বালু উত্তোলনকে ঘিরে গত বছর ঘটেছে বালুখেকো প্রভাবশালী মহলের সাথে গ্রামবাসীর সংঘর্ষ। গ্রামবাসী সব সময়ই দাবি জানিয়ে আসছিলো ড্রেজার দিয়ে যেভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে, তাতে বাড়ি-ঘর নদীগর্ভে চলে গেছে সামনে বর্ষার সময় আসায় আরো বাড়িঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরী হয়েছে।

 

অবৈধভাবে গড়ে ওঠা এসব বালু মহালের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলে প্রাণনাশের হুমকি দেয়ার ঘটনাও ঘটছে। অবৈধভাবে নদী থেকে বালু উত্তোলন করে লাখ টাকা আয় করলেও, সরকার হারাচ্ছে মোটা অঙ্কের রাজস্ব, ঘটছে পরিবেশের মারাত্মক বিপর্যয়।
সোনারগাঁয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলে মেঘনা নদীর তীরবর্তী কয়েক হাজার হেক্টর কৃষি জমি ও অনেক গ্রাম ইতিমধ্যে বিলীন হয়ে গেছে।

 

অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলে ইতিমধ্যে নদীতে বিলীন হয়ে গেছে ভুরভুরিয়া, খাসের চর, নতুনচর, সুলতান নগর, রামপ্রসাদের চর, নলচর, মৈষারচর, নুনেরটেক এলাকার গুচ্ছগ্রাম, রঘুনারচর, সবুজবাগসহ ২০টি গ্রাম। নতুন করে ভাঙনের আশঙ্কা তৈরী হয়েছে নুনেরটেক, হাড়িয়া, রামগঞ্জ, ভাটিবন্দর, জিয়া নগরসহ আরও অনেক গ্রামে।

 

গত বছর সোনারগাঁ উপজেলার মেঘনা নদীর আনন্দবাজার বালু মহালে চান্দেরপাড়া এলাকায় ড্রেজার নিয়ে কৃষকদের ফসলী জমির তীর ঘেষে বালু উত্তোলন করতে গেলে গ্রামবাসী একত্রিত হয়ে এ হামলা চালালে বালু সন্ত্রাসদের সাথে ঘটে মারামারির ঘটনা। সর্বশেষ গত রমজান মাসে বালু উত্তোলনের টাকার ভাগ নিয়ে দু’পক্ষের সংঘর্ষে টেঁটাবিদ্ধসহ ৩০ জন আহত হন।

 

গত বছর আড়াইহাজারের খাগকান্দা ও কালাপাহাড়িয়া ইউনিয়নের মেঘনা নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলনে বাধা দেয়ায় গ্রামবাসীর ওপর সন্ত্রাসীদের গুলিবর্ষণ ও ককটেল হামলায় গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন ৫ জন। বালু উত্তোলনে বাঁধা দিলেই শুরু হয় ক্ষমতাসীনদের হামলা ও মামলা।

 

ফলে ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পায় না। মেঘনা নদীতে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির কিছু নামধারী নেতাকর্মী। সরকারের নাম ভাঙিয়ে ধ্বংস করা হচ্ছে মানুষের বাড়িঘর ও ফসলি জমি।

 

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বারদী ইউনিয়ন চেয়ারম্যান জহিররুল হক বলেন, বালু মহালের ইজারা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। অনেকে চুরি করে হয়তো বালু উত্তোলন করে থাকতে পারে। পুলিশ বা প্রশাসনের লোক দেখলে তারা দৌড়ে পালিয়ে যায়।

 

ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সদস্য আবু নাইম ইকবাল বলেন, বালু মহাল থেকে বালু উত্তোলনের সাথে আমি জড়িত আছি। তবে মূল দায়িত্বটা পালনা করে ইজারাদার লিটন সাহেব। আমার জানা মতে বালু মহল থেকে অবৈধভাবে কোন বালু উত্তোলন করা হচ্ছে না।

 

বালু মহাল থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ব্যপারে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) জসিম উদ্দীন হায়দার বলেন, জেলা প্রশাসনে অধিভ্ক্তু বালু মহালগুলোর বেশিরভাগ বালু উত্তোলনের উপযোগী নয়। ইজারা দেয়া হয়েছে মাত্র ৪টি বালু মহাল। এখন বাকিগুলো যদিও বালু উত্তোলনের উপযোগী নয় সেহুতু এগুলোকে বন্ধ করতে হবে।

 

যদি এগুলো খোলা রাখা হয় তাহলে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন চলবে। বালু মহাল নীতিমালা অনুযায়ী এসব মৃত বালুমহালগুলো থেকে বালু উত্তোলনে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটতে পারে। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নষ্ট হতে পারে। এসব মৃত বালু মহালগুলোকে সনাক্ত করার জন্য এসিল্যান্ড এবং উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) কাজ করে। তারা তদন্ত করে দেয়া মতামতের ভিত্তিতে আমরা কমিশনারের অফিসে পাঠাই।

 

তখন এ ব্যাপারে তিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। যে চারটি বালুমহালের ইজারা দেয়া হয়েছে সেখানেও নির্দিষ্ট অঞ্চল ভাগ করা আছে যেখান থেকে তারা বালু উত্তোলন করতে পারবে। সেসব নির্দিষ্ট অঞ্চলের বাইরে গিয়ে যদি কেউ বালু তোলে (এক্ষেত্রে গত বছর সোনারগাঁয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের সময় কয়েকজনকে গ্রেফতার করেছিলাম এবং ড্রেজার আটকে রেখেছিলাম) অর্থাৎ আইনভঙ্গ করে অন্য কোথাও গিয়ে বালু উত্তোলন করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

 

আমাদের ম্যাজিস্ট্রেট এক্ষেত্রে তাদের গ্রেফতার করে জেল হাজতে প্রেরণ করবেন। অবৈধভাবে বালু উত্তোলণ করলে জরিমানা ও গ্রেফতার করে জেল হাজতে পাঠানো দুই শাস্তিতেই আমরা দন্ডিত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।

 

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি’র (বেলা) প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, নারায়ণগঞ্জের বালুমহালগুলোতে কয়েকটি সিন্ডিকেট কাজ করছে এটা সম্পর্কে আমরা অবগত। তবে অবৈধ বালুমহালগুলো সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য আমাদের হাতে নেই।

 

এ ব্যাপারগুলোতে অভিযোগের ভিত্তিতে আমরা কাজ করে থাকি। অচিরেই নারায়ণগঞ্জের অবৈধ বালু মহল থেকে বালু উত্তোলনে অভিযোগের ভিত্তিতে আমরা কাজ করবো।

 

পরিবেশ অধিদপ্তর নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখার সহকারি পরিচালক মো.নয়ন মিয়া বলেন, অবৈধভাবে বালু মহাল থেকে বালু উত্তোলন স্থানীয় প্রশাসন বাদে কেউ বন্ধ করতে পারবে না। নদী থেকে বালু উত্তোলনে পরিবেশ অধিদপ্তরের আসলে কিছু করার নেই। এখানে যাবতীয় করণীয় জেলা প্রশাসন এবং নদী রক্ষা কমিশনের। বিষয়ে আসলে পুকুর ভরাটে পরিবেশ অধিদপ্তর কাজ করতে পারে।

 

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) এর নারায়ণগঞ্জ শাখার সাধারণ সম্পাদক তারিক বাবু বলেন, আসলে এ ব্যাপারগুলোতে বিআইডব্লিউটিএ এর উচিৎ বালু মহালগুলোতে বিশাল ভূমিকা থাকা দরকার। নদী কিংবা জমির ক্ষতিতে বিআইডব্লিউটিএ ভূমিকা নিলে এ বিষয়গুলো আরো নিয়ন্ত্রণে আসতো। কোথায় ড্রেজিং করলে নদীর গতিপথ পরিবর্তন হবে এটাতে সবচেয়ে ভূমিকা বেশি বিআইডব্লিউটিএ। উন্নয়নের নামে পরিবেশ ধ্বংস করা যাবে না।

 

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহণ কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) নারায়ণগঞ্জ নদী বন্দরের যুগ্ম পরিচালক মো. গুলজার আলী বলেন, নদী, মৃতপ্রায় নদী, চ্যানেল, ক্যানেল ইত্যাদি এবং অভ্যন্তরীণ নৌ-পথ সমূহের নাব্যতা রক্ষা করা এবং উন্নয়ন ড্রেজিং এর পরিমাণ নির্ধারন পূর্বক কর্মসূচী প্রনয়ণ ও বাস্তবায়ন করা সংক্রান্ত কাজ করলেও বালু মহাল থেকে বালু উত্তোলন সংক্রান্ত বিষয়ে আমরা কোন কাজ করি না। এটা জেলা প্রশাসন দেখে থাকে।

এই বিভাগের আরো খবর