রোববার   ২৬ জানুয়ারি ২০২০   মাঘ ১৩ ১৪২৬   ৩০ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১

জেলা জুড়ে অবৈধ ইটভাটায় বিপর্যস্ত পরিবেশ, হুমকিতে জনস্বাস্থ্য

প্রকাশিত: ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯  

শামীমা রীতা (যুগের চিন্তা ২৪) : সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দেওয়া এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর শহরগুলোর তালিকার একেবারে উপরের দিকেই স্থান পেয়েছে নারায়ণগঞ্জের নাম। আয়তনে নারায়ণগঞ্জ দেশের সবচেয়ে ছোট জেলা। অথচ এই জেলাতেই রয়েছে ৩৪৪টি ইটভাটা। এর মধ্যে ২৫৪টি ইটভাটাই অবৈধ।

 

ইটভাটাগুলোর অধিকাংশ আবার গড়ে উঠেছে জনবসতিপূর্ণ এলাকায়, নদীর ধারে ও ফসলি জমি দখল করে। নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে গড়ে ওঠা এসব ইটভাটা পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি হুমকির মুখে ফেলছে জনস্বাস্থ্য। নারায়ণগঞ্জে মোট ইটভাটার রয়েছে ৩৪৪টি। এর মধ্যে ২৫৪টি ইটভাটাই অবৈধ।

 

এর মধ্যে অধিকাংশ ইটভাটাই গড়ে উঠেছে জনবসতিপূর্ণ এলাকায়, নদীর ধার ও ফসলি জমি দখল করে। এসব অবৈধ ইটভাটায় নারায়ণগঞ্জের পরিবেশের মারাত্মকভাবে ক্ষতি করছে। পাশাপাশি হুমকির মুখে পড়ছে জনস্বাস্থ্যও।

 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ইটভাটা ফতুল্লা,বন্দর এবং রূপগঞ্জে। এসব ইটভাটার কালো ধোঁয়ার বিষাক্ত গ্যাসে অতিষ্ঠ এলাকাবাসী। ইটভাটা সাধারণত এফসিকে, অটো ব্রিকস, জিগজ্যাগ, হাইব্রিড, ফরম্যান, বিএসভিকে ও অন্যান্য ধরণের হয়।

 

পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, ছাড়পত্র ও নবায়ন বিহীনভাবে নারায়ণগঞ্জে পরিচালিত জিগজ্যাগ পদ্ধতির ইটভাটা রয়েছে ১৫০টি। এর মধ্যে রূপগঞ্জে রয়েছে ৮২টি, সদর উপজেলায় রয়েছে ৩৬টি, বন্দরে ২৫টি, সোনারগাঁয়ে ৭টি। আর ১২০ ফুট চিমনীবিশিষ্ট অবৈধ ইটভাটা রয়েছে ১০৪টি। এর মধ্যে, সদর উপজেলায় রয়েছে ৬৯টি, রূপগঞ্জে রয়েছে ৩২টি, আড়াইহাজারে ১টি, সোনারগাঁয়ে ২টি। (২০১৭ সালের তথ্যানুযায়ী)। ইতিমধ্যেই নারায়ণগঞ্জে পরিবেশ ও প্রশাসনের যৌথ অভিযানে  বন্ধ করে দেয়া হয়েছে ১৯ অবৈধ ইটভাটা। 

কৃষি জমির মাটি যাচ্ছে ইটভাটায় :

গত বুধবার নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার সাদিপুর বড়বাড়ি এলাকার কৃষকদের জমির মাটি স্থানীয় একটি প্রভাবশালী চক্র বিভিন্ন ইটভাটায় বিক্রি করে দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠে। এ ঘটনায় বুধবার এলাকাবাসী জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।

 

স্থানীয় কৃষকেরা জানান, মাটি সন্ত্রাসীরা ক্ষমতাসীন দলের নাম ব্যবহার করে এসব অবৈধভাবে এক মাস ধরে উপজেলার সাদিপুর বড়বাড়ি গ্রামের কৃষকদের ফসলি জমির মাটি ১০ থেকে ১৫ ফুট গর্ত করে কেটে ট্রাকে তুলে স্থানীয় কয়েকটি ইটভাটায় বিক্রি করা হচ্ছে। 

 

এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রকিবুর রহমান খান বলেন, ‘কৃষকদের ফসলি জমির মাটি জোরপূর্বক কেটে নেওয়ার বিষয়ে ইতিমধ্যে অভিযোগ পেয়েছি। দু-এক দিনের মধ্যে এ কাজে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

 

কৃষি জমিগুলোতে মাটি কেটে  নেয়ার কারণে জমিগুলোতে ফসল উৎপাদন কমে যাচ্ছে। নারায়ণগঞ্জ জেলায় মোট জমির পরিমাণ ৬৮ হাজার ৮৩৯ হেক্টমিটার। এর মধ্যে মোট আবাদযোগ্য জমি রয়েছে  ৪৬ হাজার ৭৭৪ হেক্টমিটার। মোট কৃষি নির্ভর পরিবার রয়েছে ১লাখ ৭২ হাজার ২৮৯ টি পরিবার।

 

এর মধ্যে অন্য উপজেলাগুলো হল- বন্দর, সোনারগাঁ, আড়াইহাজার। কিন্তু গত কয়েকবছরে কৃষি জমির পরিমাণ কমে গেছে অর্ধাংশ। আর এ ইটভাটার দূষণের প্রভাবে কমেছে আবাদযোগ্য জমিগুলোর উর্বরতাও।  ফলে কৃষি প্রধান পরিবারগুলো বাধ্য হয়ে ঝুঁকছে অন্য পেশায়।

 

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বন্দর উপজেলার এই ১টি ওয়ার্ডে গড়ে উঠেছে ২৪টি ইটভাটা। এর মধ্যে অধিকাংশই ইটভাটাগুলোই সরকারি অনুমোদন ছাড়াই আবাসিক এলাকা ও কৃষিজমির ওপর গড়ে উঠেছে । ফলে এগুলোর বিষাক্ত ধোঁয়ায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে এলাকার পরিবেশ।

 

ক্ষতিকর প্রভাবে ইতিমধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে মুছাপুর ইউপির ১নং ওয়ার্ডের ফনকুল, দাসেরগাঁও, গোবিন্দকুল, পাতাকাটা, বৈরাগীপাড়, ব্রাহ্মণের বাগ, শাসনেরবাগ এলাকার প্রায় এক হাজার বিঘা জমির ফসল। বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে এই ওয়ার্ডের ২ হাজার ৩৭৮ জন (২০১১ সালের আদমশুমারি ও বর্তমান ওয়ার্ড সীমা অনুযায়ী) বাসিন্দাদের জনজীবন ।

 

কিন্তু এ ব্যাপারে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই মুছাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান  মাকসুদ হোসেনের। এ ব্যাপারে কথা বলতে চাইলে তিনি বলেন, এগুলো কোনো ব্যাপার না। এখানে তো মাত্র এক ইউনিয়নে ২৪ টি ইটভাটা। বক্তবলীতে গিয়ে দেখেন এক এলাকাতেই ২০০ টার উপরে ইটভাটা রয়েছে।

 

এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রতি বছরই  এ এলাকায় ২ থেকে ৩টি করে ইটভাটা গড়ে উঠছে। ফলে অধিকাংশ কৃষিজমিই উর্বরতা হারিয়েছে। ফসল উৎপাদন হ্রাস পাওয়ায় কৃষকরা ঝুঁকছে অন্য পেশায় । কেউ কেউ জমি বর্গা দিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে বর্গা নিয়ে কৃষিজমির মাটি ইটভাটার কাছে বিক্রি করছেন বর্গাচাষীরা।

 

তবে এ চিত্র শুরু মুছাপুর ইউনিয়ন নয়। এ চিত্র দেখা গেছে সোনারগাঁ, রূপগঞ্জসহ অন্যান্য এলাকাগুলোতেও।

 

এ বিষয়ে  জেলা কৃষি কার্যালয়ের কাজী হাবিবুর রহমান জানান, কৃষি জমি যে জমির মাটি রয়েছে তার উপরিভাগের মাটি (টপ সয়েল) রয়েছে তা যদি কেটে নেয়া হয় তাহলে জমির উর্বরতা কমে যাবে। যা ফসল উৎপাদনে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। কখনও কখনও ওই সকল জমিতে একেবারেই ফসল উৎপাদন করা সম্ভব হয় না।

 

তিনি আরো জানান, নারায়ণগঞ্জে প্রতিবছরই ১ শতাংশ করে কৃষি জমি কমেছে। কৃষি পরিবারগুলো কৃষিকাজ থেকে বেরিয়ে ইটভাটাসহ  কলকারখানা পেশায়  জড়িয়ে পড়ছে। যা আগামী সময়গুলোতে খাদ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে।

 

বিপর্যস্ত পরিবেশ, হুমকির মুখে জনস্বাস্থ্য :

শুধু কৃষি জমি নয় ইটভাটার প্রভাব পড়ছে জানস্বাস্থ্যেও কৃষিজমি ইটভাটা রয়েছে এমন এলাকাগুলো ঘুরে এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে জানা যায়, ফসলি জমি ছাড়াও ইটভাটার বিষাক্ত কালো ধোঁয়ায় এলাকার নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা আক্রান্ত হচ্ছেন নানা রোগে।

 

মুছাপুর ইউনিয়নের দাসেরগাঁও এলাকার নুরুজ্জামান জানান, আশেপাশে ইটভাটার কালো ধোয়া আর গন্ধে নিঃশ্বাস নেয়া অনেকটা কষ্টকর  হয়ে পড়েছে। তাছাড়া সারা বছরই কাশি, বুকে ব্যাথা এগুলো লেগেই থাকে।

 

নারায়ণগঞ্জ পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাঈদ আনোয়ার জানান,  নিয়ম না মেনে কোন লাইসেন্স কিংবা ছাড়পত্র ব্যতিরেকে ইটভাটাগুলো অবৈধভাবে গড়ে তুলেছে। আমরা  পরিবেশ দূষণ রোধে অবৈধ ইটভাটাগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

 

তবে একটি এলাকায় যে কয়টি ইটভাটা থাকার কথা তারচেয়ে অনেক বেশি ইটভাটা গড়ে উঠেছে। একটি এলাকায় কতগুলো থাকবে এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো আইন না থাকায়  আমরা এর সংখ্যা নির্ধারণও করতে পারছি না।

 

ফলে  একই এলাকার একাধিক ইটভাটা গড়ে তোলা হচ্ছে যা পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। বর্তমানে নারায়ণগঞ্জে বায়ু দূষণ অনেক বেড়ে গেছে। সালফার ডাই অক্সাইড, কার্বন ডাই অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড, পিএম ১০, পিএম ২.৫সহ ক্ষতিকর উপদানের উপস্থিতি নারায়ণগঞ্জের বাতাসে অনেক বেড়ে গেছে। 

 

সিভিল সার্জন ডা.ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, বায়ু দূষণের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয় হৃদযন্ত্র এবং শ্বাস-প্রশ্বাস। এমনকি অতিরিক্ত দূষিত বায়ু সেবনে গর্ভবতী নারী ও শিশু স্বাস্থ্যের প্রতি বিরূপ প্রভাব পড়ে, এমনকি জন্মের পূর্বেই শিশুর মৃত্যুর কারণ হতে পারে।

 

এছাড়া পরিপাক বিপাক প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়া, শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া এবং এলার্জিজনিত সমস্যাও এ বায়ু দূষণের কারণে পরিলক্ষিত হয়।

 

হাইকোর্টের নির্দেশ বাস্তবায়নে ধীর গতি :

গত ২৬ নভেম্বর ঢাকার আশেপাশের পাঁচ জেলার ইটভাটা ১৫ দিনের মধ্যে বন্ধের নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। সেই সময়সীমা ইতোমধ্যেই পেরিয়ে গেছে। তবুও বন্ধ হয়নি ইটাভাটাগুলোর কার্যক্রম। যদিও ফতুল্লা, বন্দর, আড়াইহাজার থেকে ইতোমধ্যে মাত্র ১৪টি ইটভাটা বন্ধ করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। এর মধ্যে ফতুল্লায় ১৩টি, বন্দরে ২টি ও আড়াইহাজারে ৪টি ইটভাটা রয়েছে।

 

এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাঈদ আনোয়ার বলেন, “হাইকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী জেলাজুড়ে এ অভিযান অব্যাহত থাকবে। আর উচ্ছেদকৃত ইটভাটাগুলো পুনরায় চালু করার কোনো সুযোগ নেই।”

 

অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট খাদিজা তাহেরা ববি বলেন, “অবৈধ ইটভাটাগুলো বন্ধে আমাদের অভিযান চলমান রয়েছে।”

এই বিভাগের আরো খবর