শুক্রবার   ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯   আশ্বিন ৪ ১৪২৬   ২০ মুহররম ১৪৪১

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় বাংলাদেশকে এখনই উদ্যোগ নিতে হবে

প্রকাশিত: ৩১ জুলাই ২০১৮  

মোরছালীন বাবলা : জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীর যেক’টি দেশ প্রচন্ড ঝুঁকির মধ্যে আছে তারমধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। এই ঝুঁকির ফলে বাংলাদেশের মানুষ অনেকদিন থেকেই উদ্বিঘ্ন। শুধু বাংলাদেশেই নয় জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মানুষও গভীর ভাবে উদ্বিঘ্ন। পৃথিবীতে এই সমস্যা দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করছে। 

জলবায়ু বায়ু পরিবর্তন ও বায়ু মন্ডল ক্রমশ উত্তপ্ত হওয়ায় একদিকে বরফ খন্ড গলে পানি সমুদ্র পৃষ্টের উচ্চতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। পাশাপাশি শীতে বেশী শীত, গরমে বেশী গরম, বৃষ্টির সময় অতি বর্ষণ, বন্যার প্রকোপ বৃদ্ধি এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে।

এতে শুধু বাংলাদেশ নয় বিশ্বের সমুদ্র উপকূলবর্তী মানুষকে চরম ভোগান্তিতে ফেলে দিয়েছে এবং তারা গৃহহীন, আশ্রয়হীন, সহায় সম্বল হারিয়ে উদ্বাস্তু হয়ে পড়ছে।

 জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে নদী ভাঙ্গন, আবাদি জমি নদী গর্ভে বিলীন হচ্ছে।ফসলী জমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে।  নদীর পানিতে লবনাক্ততা  বাড়ছে। এসবের কারণে সমুদ্র উপকূলবর্তী মানুষ গুলোর স্বাস্থ্য ঝুঁকি প্রতিনিয়ত বাড়ছে। যাতায়ত ব্যবস্থা হারিয়ে যাচ্ছে,পানীয় জলের সংকট বাড়ছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে, একদল বিজ্ঞাণী ‘সূর্যের তাপ কমাতে কৃত্রিম মেঘ ছড়িয়ে দেয়ার  পরিকল্পনা’ করছে।

পরিবেশবিদদের আশংকা করছে এরফলে মাত্রাতিরিক্ত গ্রীন হাউজ গ্যাস নি:গমনের ফলে ভূমন্ডল এবং পৃথিবী নামক উপগ্রহ জ্বলন্ত অগ্নিগোলকে রূপ নেবে। পরিবেশবাদিদের আশংকার পরও হার্ভার্ড, কেমব্রিজ, এমআইটি, অক্সফোর্ডসহ বিশ্বের শীর্ষ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় ‘সোলার জিও ইঞ্জিনিয়ারিং’শীর্ষক এই গবেষণায় নেতৃত্ব দিচ্ছে।

বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের সময় যেভাবে ছাইয়ের আস্তরন বায়ুমন্ডলে ছড়িয়ে সূর্যকে আড়াল করে দেয়, সেই প্রক্রিয়ার নিয়ম মেনেই জলবায়ু পরিবর্তন ঠেকানোর উপায় বের করবেন তারা।

তবে আগ্নেয়গিরির ছাই বায়ুমন্ডলের যতদূর উপরে ওঠে, তারও অনেক ওপরে উঠে কৃত্রিম মেঘ তৈরির উপাদান ছড়ানো হবে। এর ফলে ওই আস্তরণ কয়েক বছর পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। বলাহচ্ছে, স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার অর্থাৎ বায়ু মন্ডলের সর্বোচ্চ স্তরে ওই কৃত্রিম আস্তরণ তৈরির লক্ষ্য নিয়ে গবেষণা চলছে।

জলবায়ুপরিবর্তন সম্পর্কিত জাতিসংঘের একটি বিশেষজ্ঞ প্যানেল অবশ্য সোলারজিওইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কার্যকারিতা এবং পরিণাম নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। 

তাদের তৈরি প্রযুক্তি ফাঁস হওয়া একটি রিপোর্টে  বলা হয়েছে, অর্থনৈতিক ভাবে, সামাজিক ভাবে এবং  প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে এই প্রযুক্তির প্রয়োগ সম্ভব নয়। কৃৃত্রিম ভাবে জলবায়ু তৈরির ফলে বিশ্বের কিছু কিছু অঞ্চলে অস্বাভাবিক বন্যা, খরা, বা অতিবৃষ্টি বা অনাবৃষ্টি দেখা দিতে পারে এমনটাই মনে করছেন অনেকে।

মাত্রাতিরিক্ত গ্রীন হাউজ গ্যাস নি:র্গমনের ফলে জলবায়ূ পরিবর্তন হওয়ায় বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বায়ুমন্ডলকে ইতিমধ্যেই বিপর্যস্ত করে তুলেছে বা তুলছে। এ জন্য বাংলাদেশসহ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো দায়ি না হলেও এর দায় ধণী দেশগুলোর উপরেই বর্তায়। 

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট সমস্যগুলো মোকাবেলায় বাংলাদেশ অনেক আগে থেকেই পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। ২০০৯ সালে সরকারের উদ্যোগে  জলবায়ু পরিবর্তন জনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ‘জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট’(বিসিসিটি) প্রতিষ্ঠা করে। 

বিসিসিটি’র মাধ্যমে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের মাধ্যমে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি হ্রাসে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতেও কাজ করছে সরকার। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীর ১৪ কোটি ৩০ লাখ মানুষ বাস্তুতচ্যুত এবং আশ্রয়হীন হয়ে পড়ছে। এরমধ্যে বাংলাদেশও আছে। 

পরিসংখ্যান বলছে,জলবায়ু পরিবর্তন জনিত ঝুঁকি সৃষ্টির পেছনে অন্যতম এবং প্রধানতম দায়ি হচ্ছে উন্নত রাষ্ট্র তথা শিল্পনোন্নত দেশ সমূহ।  অতিমাত্রায় গ্রীন হাউজ গ্যাস নির্গমনের কারণেই বায়ুমন্ডল এবং ভূমন্ডল উত্তপ্ত উনুনে পরিণত হচ্ছে। 

গ্রীন হাউজ গ্যাস নিঃর্গমন তথা নিঃস্বরণের ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র,জাপান,চীন,রাশিয়াসহ ইউরোপের দেশসমূহ,পাশ্ববর্তী দেশ ভারত বেশী দায়ি। আর সে তুলনায় বাংলাদেশ শতকরা হিসেবে গ্যাস নিঃস্বরণ করে মাত্র ০.০৫ ভাগ।  

কথা হচ্ছে,জলবায়রু ঝুঁকি হ্রাস এবং মোকাবেলা না করতে পারলে, সাগরে ভাসমান,ছিদ্রযুক্ত একটি জাহাজের মতো গোটা বিশ্ব,ধীরে ধীরে ডুবে যাবে। জলবায়ূ পরিবর্তনের কারণে খরা, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি এবং সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাবে। 

ফলে কৃষি নির্ভর মানুষের জীবন-জীবিকা পড়তে হুমকীর মুখে। তখন গোটা বিশ্বে খাদ্য শস্যের আবাদ,মজুদ,উৎপাদনও হ্রাস পাবে ধীরে ধীরে। ভুগর্ভস্থ পানির স্তরও ক্রমাগত নীচে নেমে যাবে। তখন সংকটে পড়বে কৃষিজ উৎপাদন,বাড়বে ভূমি ধ্বস,ভূমিকম্পের মাত্রাও বাড়বে। আর বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে মরুকরণ দেখা দেবে।

গবেষকরা বলছেন, গ্রীন হাউজ গ্যাস নির্গমণ রোধ করতে না পারলে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি আরো বাড়বে। বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকার  মানুষকে রক্ষায় এখন থেকে দরকার সমন্বিত পরিকল্পনা ও উদ্যোগ। আর তা করতে ব্যর্থ বা বিলম্বিত হলে ২০৫০ সাল নাগাদ দেশে জলবায়ু উদ্বাস্তুর সংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ৩ কোটি। 

সাংবাদিক- মোরছালীন বাবলা

Email : moursalin@gmail.com

এই বিভাগের আরো খবর