বুধবার   ২৭ মে ২০২০   জ্যৈষ্ঠ ১২ ১৪২৭   ০৪ শাওয়াল ১৪৪১

বাড়ছে সংক্রমণ ও মৃত্যুর মিছিল

জনগণ বেপরোয়া, মানছেনা স্বাস্থ্যবিধি

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১৫ মে ২০২০  

নারায়ণগঞ্জে জনগণ বেপরোয়া। রাস্তা-ঘাটে, মার্কেটে ও মসজিদে লোকজন বেপরোয়া। ঈদ মার্কেটে মানুষ দলে দলে শহরে আসছে। মার্কেটে ভিড় করছে। একজন আরেক জনের গাঁয়ে ঘেঁষে কেনাকাটা করছেন। স্বাস্থ্যবিধির বালাই নেই।

 

প্রতিটি মার্কেটের সামনে হাতধোয়ার ব্যবস্থা থাকলেও অনেকেই তা এড়িয়ে চলেন। জনগণ এতটাই বেপরোয়া যে, স্বাস্থ্যবিধি না মানার কারণে গতকাল আবারো শহরের কালীরবাজারের ফ্রেন্ডস সুপার মার্কেট বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। রাস্তায় চলছে বিভিন্ন যানবাহন। মানুষ এমনভাবে চলাফেরা করছে-দেখে মনে হয়  দেশে কোন করোনা নেই। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বার বার সতর্কবাণী উচ্চারণ করছেন।

 

এভাবে চলতে থাকলে করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হবে। স্বাস্থ্যবিভাগের তথ্যমতে, নারায়ণগঞ্জে গত চব্বিশ ঘন্টায় নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন বাষট্টি জন। এ নিয়ে জেলায় মোট আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৪ শত ৭৫ জন। করোনায় আক্রান্তদের মধ্যে গত একদিনে নতুন কারো মৃত্যু হয়নি। আজ পর্যন্ত জেলায় মৃত্যু হয়েছে মোট উনষাট জনের।

 

গত চব্বিশ ঘন্টায় সুস্থ হয়েছেন আরো ৮১ জন । এ নিয়ে আক্রান্তদের মধ্যে মোট সুস্থ হয়ে উঠেছেন ২ শত ৭৯ জন। জেলায় এ পর্যন্ত নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে ৫ হাজার ৭ শত ৪৫ জনের। গত চব্বিশ ঘন্টায় নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে ৩ শত ৭৪ জনের।

 

নতুন আক্রান্ত হওয়াদের মধ্যে একুশ জন রুপগঞ্জ উপজেলার, উনিশ জন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন এলাকার, আট জন নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার, দশ জন সোনারগাঁ উপজেলার, তিন জন আড়াইহাজার উপজেলার, এবং এক জন বন্দর উপজেলার বাসিন্দা। নারায়ণগঞ্জে আইএসপিআর ঘোষিত লকডাউন চলছে ৮ এপ্রিল থেকে।


জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী আক্রান্তের মধ্যে ৭ শত ৪৫ জন এবং মারা যাওয়াদের মধ্যে ৪২ জন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন এলাকার। ফতুল্লা থানা এলাকার আক্রান্ত ৪ শত ৯৯ জনের মধ্যে মারা গেছেন ১৩ জন, রুপগঞ্জ উপজেলা এলাকার আক্রান্ত ৮২ জনের মধ্যে মারা গেছেন ১ জন, সোনারগাঁ উপজেলার আক্রান্ত ৭১ জনের মধ্যে মারা গেছেন ২ জন, আড়াইহাজার উপজেলার আক্রান্ত ৪৫ জনের মধ্যে কেউ মারা যাননি এবং বন্দর উপজেলার আক্রান্ত ৩৩ জনের মধ্যে মারা গেছেন ১ জন।


সুস্থ হওয়াদের মধ্যে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন এলাকার ১৯৩ জন, ফতুল্লা থানা এলাকার ৪৯ জন, আড়াইহাজার উপজেলার ১৫ জন, সোনারগাঁ উপজেলার ১৪ জন এবং বন্দর ও রুপগঞ্জ উপজেলার ৪ জন করে রয়েছেন। 


গত ২৯ এপ্রিল রুপগঞ্জে গাজী কোভিড-১৯ পিসিআর ল্যাব উদ্বোধনের পর গত ১৩ মে সকাল পর্যন্ত সেখানে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয়েছে ১ হাজার ৬ শত ৪৭ টি নমুনা। গত ৬ মে নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যা বিশিষ্ট খানপুর হাসপাতালে পিসিআর ল্যাব চালু হওয়ার পর থেকে সেখানে গত ১৩ মে সকাল পর্যন্ত মোট নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে ৫শত ৫৬ টি।


উল্লেখ্য, ৮ মার্চ নারায়ণগঞ্জে প্রথম করোনায় আক্রান্ত সনাক্ত হয় দুই জন। নারায়ণগঞ্জে প্রথম একজন নারীর মৃত্যু হয় ৩০ মার্চ। ৮ এপ্রিল সকাল পর্যন্ত ৩১ দিনে নারায়ণগঞ্জে করোনায় আক্রান্ত হয় ৪৬ জন এবং আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয় ৭ জনের। এরপর ৮এপ্রিল ভোর ৬টা থেকে আইএসপিআর ঘোষিত লকডাউন শুরু হওয়ার পরও যেন করোনার প্রকোপে লাগাম টানা যায়নি।

 

লকডাউনের শুরু থেকে আজ ১৪ মে সকাল পর্যন্ত গত ৩৭ দিনে আরো আক্রান্ত হয়েছেন ১৪২৯ জন এবং মৃত্যু বরণ করেছেন আরো ৫২ জন মানুষ। জেলায় আজ সকাল পর্যন্ত সব মিলিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা ১৪৭৫ জন আর মারা গেছেন ৫৯ জন। করোনা উপসর্গ নিয়ে আরো অনেক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আগামী ১৬ মে সংক্রমণের দশম সপ্তাহ পূর্ণ হবে।  


এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরো ও স্পাইন সার্জন এবং নিউরোস্পাইন সোসাইটি অব বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, জীবন-জীবিকা উভয় বিবেচনায় লকডাউন বর্তমানে কিছুটা শিথিল। এতে জনগণের দায়িত্ব বেড়ে গেছে। সবার মনে রাখা উচিত, আমাদের মতো দেশে আক্রান্ত আর মৃত্যু আরও বেড়ে গেলে লাগাম টেনে ধরা কঠিন হবে।

 

তাই নিজের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিজেকেই নিশ্চিত করে চলাচল ও দৈনন্দিন কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চললে সামনের দিনগুলোয় আরও ভয়াবহ পরিস্থিতি হতে পারে।

 

একেক দেশে একেক সময় এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব সর্বোচ্চ মাত্রায় গেছে। আমেরিকায় এটা সর্বোচ্চ মাত্রায় যেতে লেগেছে ৭৯ দিন। আমাদের দেশে প্রাদুর্ভাবের ৬৭তম দিনে আছি। সুতরাং সামনে আরও কঠিন পরিস্থিতি থাকতে পারে। তাই সবাইকে সরকারের নির্দেশনা মেনে চলা প্রয়োজন। 


করোনা রোগীদের প্রতি মানবিক হওয়ার আহ্বান : 

ব্রিফিংয়ে করোনায় আক্রান্তদের প্রতি মানবিক আচরণ করার আহ্বান জানিয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের এই শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, আমরা প্রত্যেকেই যেন মানবিক হই। আক্রান্ত ব্যক্তির প্রতি আমরা যেন কোনো অসদাচরণ না করি। তার প্রতি যেন কোনো কঠোর আচরণও না করি।

 

তিনি আরও বলেন, আমরা গণমাধ্যমে দেখেছি, একজন মৃত্যুবরণ করেছে। তাকে তার মা-সহ রাস্তায় নামিয়ে দেয়া হয়েছে। এ ধরনের অমানবিক আচরণ যেন না করি। আমরা সবাই মিলেই বাংলাদেশ। একা আমি ভালো থাকতে পারি না। আমি আজ সুস্থ আছি, কাল অসুস্থ হয়ে যাব না-এর কোনো নিশ্চয়তা নেই।


দৈনিক মারা যাচ্ছে ১২ জন 

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ও মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। গত ৭ থেকে ১২ মে পর্যন্ত মাত্র ৬ দিনে মারা গেছেন ৭২ জন। অর্থাৎ, দৈনিক গড়ে ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর তালিকায় শিশু থেকে শুরু করে বয়োবৃদ্ধ কেউ বাদ পড়ছেন না। গত ২৪ ঘণ্টায় মৃত ১৯ জনের মধ্যে ১০ বছরের কম বয়সী একটি মেয়েশিশু আছে।

 

এ ছাড়া ৩১-৪০ বছরের একজন, ৫১-৬০ বছরের মধ্যে ৭ জন, ৬১-৭০ বছরের মধ্যে ৫ জন, ৭১-৮০ বছরের মধ্যে ৫ জন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। এই ভাইরাসে ব্যক্তির সুরক্ষা তার নিজের কাছে। তাই তারা স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চলার আহ্বান জানান।


৪১ ল্যাবে পরীক্ষা 

করোনাভাইরাসের নমুনা শনাক্তকরণে আরও ৪টি নতুন ল্যাবরেটরি যুক্ত হয়েছে। এগুলো হল : ঢাকার বেসরকারি ইবনে সিনা হাসপাতাল, প্রাভা হেলথ, ঢাকার বাইরে নারায়ণগঞ্জের ৩০০ শয্যা হাসপাতাল ও জামালপুরের শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজ। এ নিয়ে মোট ৪১টি ল্যাবে নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে। 
 

এই বিভাগের আরো খবর