মঙ্গলবার   ২৬ মে ২০২০   জ্যৈষ্ঠ ১১ ১৪২৭   ০৩ শাওয়াল ১৪৪১

চিকিৎসার অভাবে ধুকছে মানুষ

রাসেল আদিত্য/ নুসরাত জাহান সুপ্তি 

প্রকাশিত: ১৩ মে ২০২০  

শহরের জল্লারপাড়ের বাসিন্দা সাব্বির আল ফাহাদের বাবা মোহাম্মদ হোসেন রানার ডায়াবেটিস এবং ইনফেকশনজনিত সমস্যা ছিল। মধ্যরাতে হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় শহরের  নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে (ভিক্টোরিয়া)। কিন্তু সেখানে ডাক্তার তাকে দেখতে চাননি। তাই বাধ্য হয়ে বাসায় নিয়ে আসেন। 

 

পরের দিন অ্যাম্বুলেন্স ডেকে শহরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক ঘুরে ঢাকায় নিয়ে যান। কিন্তু সেখানেও ভর্তি করাতে পারেন নি। পরে বাসায় এনে মোবাইলে চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করে বিভিন্ন টেস্ট দিলেও শহরের ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো বন্ধ থাকার কারণে টেস্ট করাতে পারেনি। 

 

এ অবস্থায় এক সপ্তাহ থাকার পরে একদিন সকালে অবস্থার অবনতি হলে হাসপাতাল ও  ক্লিনিকে ভর্তির জন্য ঘুরতে ঘুরতে পথিমধ্যেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন মোহাম্মদ হোসেন রানা। ‘আমার বাবা সর্বাধুনিক চিকিৎসা ব্যবসা থাকার পরেও করোনাভাইরাসের কারণে বিনা চিকিৎসায় মারা গেছেন। ’ বলছিলেন সাব্বির আল ফাহাদ। 

 

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘পকেটে পর্যাপ্ত পরিমাণ টাকা থাকা সত্ত্বেও আমরা তাঁর (বাবার) যথার্থ চিকিৎসা করাতে পারিনি। আমাদের পরিবারের সবাই এখন কষ্ট নিয়ে দিন যাপন করছি।’

 

ঠিক একই রকম আক্ষেপ এবং মনোকষ্টের কথা জানালেন নারায়ণগঞ্জ সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি এবং ভূইয়ারবাগের বাসিন্দা আবদুস সালাম। তিনি বলেন, ‘আমার বড় ভাই, পাট কর্পোরেশনের অবসরপ্রাপ্ত ডিজিএম আ. হাই লিভারজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন।সে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পরলে তাকে আমরা সারারাত চেষ্টা করেও  কোন হাসপাতালে ভর্তি করতে পারিনি। এর পরের দিন সকালবেলা তিনি বিনা চিকিৎসায় মারা যান। খানপুর ৩০০ শয্যা হাসপাতালে হাসপাতালে কথা বলার পরেও এবং অনেককে বলেও আমার ভাইকে হাসপাতালে ভর্তি করতে পারিনি।’

 

‘অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, করোনাভাইরাসের নামে চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে। যার ভুক্তভোগী হচ্ছি আমি নিজে। কারণ আমার ভাইকে আমি চিকিৎসা করাতে পারিনি।’ বলছিলেন সাংবাদিক নেতা আবদুস সালাম।

 

এখানেই শেষ নয় সরকারি ও বেসরকারি সকল হাসপাতালে গাইনি রোগের চিকিৎসা থাকলেও সম্প্রতি চিকিৎসার অভাবে মারা গেছেন শহরের মাসদাইরের বাসিন্দা অন্তঃসত্ত্বা সাজিয়া বেগম।


বাসায় পা পিছলে পড়ে যাওয়ায় শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে একাধিক হাসপাতাল ও ক্লিনিকে নিয়ে গেলেও কোথাও তার চিকিৎসা করা হয়নি। যার পরিণতি ছিল সাজিয়া বেগম  ও তার গর্ভে থাকা শিশুর মৃত্যু ঘটে। করোনার আতঙ্কে সাজিয়া বেগমের চিকিৎসা করা হয়নি কোন হাসপাতালে। দিনে দিনে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর মিছিল যেমন দীর্ঘ হচ্ছে তেমনি অভিযোগের পাহাড়ও  উচুঁ হচ্ছে। 

 

এমন সব অভিযোগের বিষয়ে জনাতে চাইলে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল (ভিক্টোরিয়া) হাসপাতালের আবাসিক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. মো. আসাদুজ্জামান যুগের চিন্তাকে বলেন, ‘এমন অভিযোগ আসলে অনেকটা ঠিক না। কারণ জরুরি বিভাগসহ অন্যান্য বিভাগসমূহে এখন অনেক লোক দেয়া হয়েছে। তাদেরকে পিপিই দেওয়া হয়েছে, তাই এখন সমস্যা হওয়ার কথা কথা না। তারপরও যদি কোন অভিযোগ থাকে তাহলে আমরা সে বিষয়টা দেখবো।’

 

তিনি আরো বলেন, ‘এতদিন হাসপাতালে রোগীর চাপ কম ছিল। কিন্তু লকডাউন কিছুটা শিথিল হওয়ায় এখন চাপ বেড়ে গেছে। আউটডোরে এখন প্রতিদিন প্রায় দুইশ’ এর উপরে রোগী আসে আর ইমারজেন্সিতেও প্রায় প্রতিদিন শতাধিক রোগী আসে। এখানে বিভিন্ন রোগীরা আসছে কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে তারা তথ্য গোপন করে। কয়েকদিন আগেও আমাদের দুজন ডাক্তারের করোনা পজেটিভ হয়েছে। আবার অনেক সময় দেখা যায় রোগীদের মাস্ক পড়া থাকলেও তাদের সাথে যারা আসে তারা মাস্ক পড়া বা সুরক্ষা সামগ্রী ব্যবহার করেনা।  আবার এখন করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের মধ্যে তিনভাগের একভাগের মধ্যে কোনো লক্ষণ থাকেনা। তাই সতর্ক হয়েই আমরা সেবা দিচ্ছি।’


দেশের স্বাস্থ্য সেবার অপ্রতুলতা নিয়ে বরাবর অভিযোগ থাকলেও, করোনাভাইরাস সংক্রমণ বিস্তার লাভের পর থেকেই দেশের স্বাস্থ্য অবস্থা যে কতটা নাজুক, সেই চিত্রটি ফুটে উঠেছে নারায়ণগঞ্জ জেলার বিভিন্ন ঘটনায়। 


একদিকে যেমন করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের হাসপাতালগুলো ঠিকভাবে সেবা দিতে পারছে না, অন্যদিকে অন্যান্য জটিলতার রোগীরাও চিকিৎসা পেতে গিয়ে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। সরকারি হাসপাতালগুলোর পাশাপাশি সেই তালিকায় রয়েছে বেসরকারি হাসপাতালগুলোও।

 

গত কয়েক বছরে নারায়ণগঞ্জে যে শত শত বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক গড়ে উঠেছে, তাদের বিরুদ্ধে এই সংকটের সময় চিকিৎসা সেবা বন্ধ করে রাখার অভিযোগও রয়েছে।

 

সরেজমিনে দেখা যায়, নগরের একাধিক ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চিকিৎসাসেবা সীমিত। আবার কোন কোন ডায়াগনস্টিক সেন্টার পুরোপুরি বন্ধ করে রাখা হয়েছে। জেলার বৃহৎ দুটি সরকারি হাসপাতালের নিকটবর্তী অধিকাংশ ডায়াগনস্টিক সেন্টার বন্ধ।


যেসব ডায়াগনস্টিক সেন্টার চালু রয়েছে সেখানে ডাক্তারের সংখ্যা খুবই কম। রোগীরা নিজেদের নিয়মিত চিকিৎসকের সেবা পাচ্ছেন না। আবার কখনো স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে গিয়েও ফিরে আসছেন।

 

পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পূর্বের তুলনায় অর্ধেক চিকিৎসক সেবা দিচ্ছেন। অনেক ডাক্তারই এখন চেম্বারে নিয়মিত বসেন না। হাসপাতালের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের হাসপাতালে চিকিৎসক নিয়মিত বসছেন। কিন্তু লকডাউনের কারণে অনেক ঢাকা থেকে চিকিৎসকরা আসতে পারছে না বিধায় ডাক্তারের সংখ্যা এখন কম।’

 

একই অবস্থার কথা জানালেন মর্ডান ডায়গনস্টিক সেন্টারের হিসাব রক্ষক মোহাম্মদ শরীফ। তিনি বলেন, ‘লকডাউনের কারণে অনেক কম ডাক্তার চেম্বারে বসেন। পূর্বের ৩ ভাগের ১ ভাগ চিকিৎসক এখন রোগী দেখেন। তবে সীমিত পর্যায়ে ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পরীক্ষা নিরীক্ষা চালু রয়েছে।’

 

ভুক্তভোগী নিতাইগঞ্জের ফারহানা ইসলাম জানান, আমি কিছু পরীক্ষার জন্য চাষাড়ার মডার্ন ডায়গনস্টিক সেন্টারে গিয়েছিলাম। কিন্তু অধিকাংশ পরীক্ষা সেখানে করানো হচ্ছে না। পরবর্তীতে আমার অন্য ডায়াগনস্টিক সেন্টার টেস্ট করিয়েছি। সব ডায়গনস্টিক সেন্টারে একই অবস্থা, সকল পরীক্ষা এখন হয়না।

 

আবার নগরের অধিকাংশ বেসরকারি হাসপাতালে এখন শুধুমাত্র গাইনি বিভাগে রোগীরা ভর্তি আছেন। অন্য কোন রোগের রোগী ভর্তি নেই। জেলার প্রাইম জেনারেল ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. আহসানুল কবির রিজন বলেন, আমাদের হাসপাতালে ২০ শয্যা রয়েছে। তার মধ্যে ১৩ শয্যায় প্রসূতি নারী ভর্তি আছেন।

 

মেডিহোপ হাসপাতালের ব্যাবস্থাপক মাহমুদ বলেন, আমাদের হাসপাতালে ৭-৮ জন চিকিৎসকের চেম্বার রয়েছে। কিন্তু করোনার কারণে একজন গাইনী বিশেষজ্ঞ ডাক্তার বসেন। তাই অন্য রোগের কোন চিকিৎসা আপাতত হচ্ছে না। হাসপাতালে এখন শুধুমাত্র প্রসূতি নারীরা ভর্তি আছেন।

 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে খেলাঘর নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটির সভাপতি রথীন চক্রবর্তী বললেন, চিকিৎসা সেবা যে করোনাভাইরাসের কারণে ভেঙ্গে পরেছে এটা ঠিক। কিন্তু আমদের দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা প্রাইভেটাইজেশনর কারণে আগেই ভেঙ্গে পরেছে। একমাত্র যেখানে বা যে দেশে প্রাইভেটাইজেশন হয়নি সেখানের চিকিৎসা ব্যবস্থা কিন্তু এখনও অনেক ভালো।

 

তিনি বলেন, ‘স্বনামধন্য ডায়াগোনস্টিক সেন্টারসহ আরও আনেক ক্লিনিক নারায়ণগঞ্জ থেকে কোটি  কোটি টাকা ব্যবসা করে নিয়েছে। তারা কিন্তু পারতো একটা ফ্লোরকে বিশেষায়িত করে চিকিৎসা নিয়মিত সেবা চালিয়ে যেতে। তারা কিন্তু তা করেনি। আবার এরা কিন্ত অনেকটা সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। একদিকে চিকিৎসা ব্যবস্থা প্রাইভেটাইজশেন হয়ে গেছে আর অন্যদিকে এগুলো অনেকটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে। মানুষের বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জের মানুষের দুঃসময়ের সময় তারা পাশে নেই। এটা খুবই অমানবিক।’

 

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ধীমান সাহা জুয়েল বলেন, ‘প্রত্যেক স্বাস্থ্যকর্মী বা ডাক্তার তাদের প্রটেকশন নিয়ে চিকিৎসা সেবা দেবেন এবং দেয়া উচিত। যদি এ উপায়ে চিকিৎসা সেবা নাি দয়ে থাকে বা দিতে অপারগতা প্রকাশ করে তাহলে আমরা এর নিন্দা জানাচ্ছি এবং কতৃপক্ষের কাছে আবেদন জানাচ্ছি চিকিৎসাব্যবস্থা দ্রুত কার্যকর করার জন্য।’

 

করোনা পরিস্থিতির কারণে চিকিৎসা ব্যবস্থার এমন অবস্থার বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) নারায়ণগেেঞ্জর সাবেক সভাপতি ডা. শাহনেওয়াজ চৌধুরী বলেন, ‘আমার অভিমত হলো, যত কম ঘর থেকে বের হতে পারে ততো ভালো। কারণ এখন কিন্তু ব্যাপকভাবে টেলি মেডিসিনের সেবা নেওয়ার সুযোগ আছে। কেউ যদি ফোনে কোন ডাক্তারের সাথে কথা বলে তবে ডাক্তার সাহেব ফোনে তার সমস্যাগুলো জেনে সমাধান দিতে পারে। আর খুব ইমারজেন্সি থাকে তার তো ডাক্তারের কাছে আসতেই হবে। সেক্ষেত্রে সরকারি হাসপাতালের জরুরি বিভাগগুলো খোলা আছে।

 

তিনি বলেন, ‘রোগী যদি এ সময় বাইরে আসে তাহলে সে অন্যান্য মানুষ বা অপেক্ষামান রোগীদের মধ্যে যারা আক্রান্ত তাদের দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে। আবার একজন রোগী জানেননা তিনি করোনায় আক্রান্ত, এখনো কোনো উপসর্গ দেখা দেয়নি, তাহলে ডাক্তার আক্রান্ত হতে পারেন। সে ক্ষেত্রে সবার উচিত বাইরে বের না হয়ে যতটা সম্ভব ঘরে বসে চিকিৎসা নেয়া।’

 

সার্বিক বিষয়ে জনাতে চাইলে জেলা সিভিল সার্জন মোহাম্মদ ইমতিয়াজ বলেন, ‘সরকারি জেনারেল হাসপাতালে সকল রোগের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তবে সরকার থেকে সকল বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার খোলা রাখার নির্দেশ দেওয়া আছে। লকডাউনের কারণে ঢাকা থেকে ডাক্তার ও টেকনিশিয়ানরা আসতে পারছে না বলে সাময়িক সমস্যা হতে পারে কিন্ত কোন চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা যাবে না। সীমিত পর্যায়ে হলেও চিকিৎসা দিতে হবে। 

এই বিভাগের আরো খবর