মঙ্গলবার   ১২ নভেম্বর ২০১৯   কার্তিক ২৭ ১৪২৬   ১৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

খলনায়কের ভূমিকায় হাফিজুল, শঙ্কা

প্রকাশিত: ১১ জুলাই ২০১৯  

স্টাফ রিপোর্টার (যুগের চিন্তা ২৪): ২০১৮ সালের ১৬ জানুয়ারি হকার ইস্যুতে মেয়র আইভীর উপর হামলার ঘটনার প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিলেন বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) নারায়ণগঞ্জের সভাপতি হাফিজুল ইসলাম।

 

পুলিশ সুপার ফুটপাতে হকার বসা নিষিদ্ধ করার একমাস পরে হকারদের উস্কানি দিয়ে রাস্তায় নামিয়ে ১৬ জানুয়ারির মতো প্রেক্ষাপট তৈরি করতে চাইছেন হাফিজুল এমনটাই মনে করেন বিশিষ্টজনেরা।নগরবাসীর স্বস্তিতে পথচলায় গেলো বছরের মতো এবারও খলনায়কের ভূমিকায় হাফিজুল কাজ করছেন বলে মনে করেন তারা।

 

গরীব মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কথা বলে নগরীর সড়কগুলোর ফুটপাতে হকার বসানোর দাবিতে আবারো মাঠে  হকারদের হাফিজই নামিয়েছেন বলে মনে করনে তারা।

 

আর এ হকারদের উস্কানিতা হিসেবেও কাজ করছে হাফিজ। আর তাই হাফিজের ইন্ধনেই বৃহস্পতিবার (১১ জুন) চাষাঢ়া শহীদ মিনারে  বিকেল ৫টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত ফুটপাতে বসতে দেয়ার দাবি জানিয়ে বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করেন হকার সংগ্রাম ঐক্য পরিষদ।

 

সমাবেশ শেষে মিছিল নিয়ে তার নেতৃত্বেই হকারদের পুনর্বাসন ও পুনর্বাসনের আগ পর্যন্ত ফুটপাতে হকারদের বসার দাবি জানিয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে একটি স্মারকলিপি জমা দেন হকার নেতৃবৃন্দ।

 

গত ১৫ জুন জেলা পুলিশ সুপার হারুন অর রশীদের নির্দেশে বঙ্গবন্ধুসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোর ফুটপাতের হকার উচ্ছেদ হলেও এতদিন হকারদের কোনো সমাবেশ বা মিছিল করতে দেখা যায় নি। কিন্তু হঠাৎ উচ্ছেদের ২৩ দিন পর হকারদের মাঠে নামাকে আবারো প্রশ্নবিদ্ধ করছে সিপিবির এ নেতাকে।

 

হকারদের সমর্থন জানিয়ে হাফিজুল ইসলামের  এ অবস্থান অযৌক্তিক এবং চাঁদাবাজদের পুনর্বাসন করা হচ্ছে বলে মনে করেন নাগরিক সমাজ।  এ বিষয়ে যুগের চিন্তা ২৪ এর সাথে কথা হয় নারায়ণগঞ্জ নাগরিক সমাজ থেকে শুরু করে বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সাথে।

 

নাগরিক কমিটি নারায়ণগঞ্জ জেলার সভাপতি এড.এবি সিদ্দিকী জানান, ‘আমার মনে হচ্ছে হাফিজ রাজনীতি করার জন্যই এমনটি করছে। গতবছরও সে এমনটাই করেছে। এখানে শুধুমাত্র হকারদের স্বার্থ দেখলে চলবে না এখানে সাধারণ মানুষের সুবিধা অসুবিধা আছে কিনা সেটাও হাফিজকে দেখতে হবে।

 

হকারদের অবশ্যই পূর্নবাসনের পর উচ্ছেদ প্রয়োজন কিন্তু তাই বলে সাধারণ মানুষের সুবিধা-অসুবিধাকে উপেক্ষা করার কোনো অধিকার হাফিজুল ইসলামের নেই। হাফিজুল নগরবাসীর বিরুদ্ধে খলনায়কের মতো করছেন।

 

গতবছরও তিনি নগরবাসীর সাথে পল্টি মেরেছিলেন। পরে মেয়রের উপর হামলার মতো ঘটনা ঘটেছিলো। প্রেক্ষাপটে কিন্তু হাফিজও ছিলো। তিনিই এক সাংসদকে হকার ইস্যুতে টেনে এনে রাজনীতি করেছিলেন।’

 

বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) নারায়ণগঞ্জ জেলা সভাপতি নিখিল দাস বলেন, ‘হাফিজুর রহমানের সাথে আমরা একমত নই। আমরা অবশ্যই চাই হকার সমস্যার স্থায়ী সমাধান হোক। কিন্তু তাই বলে সাধারণ মানুষের সমস্যা করে নয়।

 

তার উচিত বিষয়টি নিয়ে হকারসাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে হকারদের স্থায়ী সমাধানের নাসিকের সাথে বসা। কিন্তু হাফিজতো আলোচনা না করে গতবার ভোল পাল্টেছিলেন। এবারও তাই করছেন।

 

ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা যে তিনি গতবার করেছিলেন এবার আর তেমন সুযোগ পাবেননা তিনি। কারও পকেটে থেকে জনস্বার্থ বিসর্জন দেয়ার কারণে হাফিজের উদ্দেশ্য সফল হবেনা।’

 

হকারদের দাবি এবং নেতৃত্বদানকারী নেতাদের অবস্থান অযৌক্তিক মন্তব্যে করে গণসংহতি আন্দোলন নারায়ণগঞ্জ জেলা সমন্বয়ক তরিকুল সুজন বলেন, বর্তমানে হকারদের যে অবস্থান তাতে মনে হচ্ছে হকারদের পুর্নবাসন নয় এখানে চাঁদাবাজদের পুনর্বাসনের চেষ্টা করা হচ্ছে। হাফিজ তাতে সমর্থন যোগাচ্ছে স্বার্থ উদ্ধার করতে।

 

আমরা অবশ্যই হকারদের পুনর্বাসনের পক্ষে। তাই বলে ফুটপাতে বসাকে আমরা সমর্থন করি না। হকারদের যে এবং হকারদের এ দাবিকে সমর্থন জানিয়ে যারা তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছে তাদের এ অবস্থান সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।

 

নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান মাসুম, হাফিজুল ইসলামের আজকের কর্মকান্ড গুঁটি কয়েক চাঁদাবাজদের প্রতিষ্ঠিত করার জন্যই নারায়ণগঞ্জের হাজার হাজার মানুষকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়েছে। গতবারও সে এমন কাজই করেছিলো। এটা সম্পূর্ণ স্ববিরোধী রাজনীতি। এখন সে যদি  রাজনীতির নামে অপরাজনীতি করে এটা অত্যন্ত নিন্দনীয়।  আমরা এর তীব্র নিন্দা জানাই।

 

নারায়ণগঞ্জ সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি আব্দুস সালাম বলেন, ‘আমরা বিগত সময়গুলোতে দেখেছি হাফিজুল ইসলাম হকারদের সাথে নিয়ে বিভিন্নভাবে নারায়ণগঞ্জকে উত্তেজিত করার চেষ্টা করছে। সে পুলিশ সুপারের অনুপস্থিতিতে নারায়ণগঞ্জকে আবারো একটা বিব্রতকর পরিস্থিতি ফেলার চেষ্টা করছে।

 

তাদের দাবি যাই হোক ফুটপাত সাধারণ মানুষের চলাচলের জন্য, এটা ব্যবসা করা জন্য নয়।  আমরা চাই হকার সমস্যা সমাধান হোক। তাই হকার সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও পুলিশ প্রশাসনকে অনুরোধ জানাচ্ছি।’

 

নারায়ণগঞ্জের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের আহ্বায়ক রফিউর রাব্বী বলেন, ‘হকার পুনর্বাসনের দাবি আমরা সমর্থন করি। কিন্তু চাষাঢ়া থেকে মন্ডলপাড়া পর্যন্ত এ রাস্তায় যাতে কোনোভাবেই হকার বসতে না পারে এ বিষয়টি আমরা  পুলিশ প্রশাসন সিটি করপোরেশকে আগে থেকেই বলে আসছি এবং এখনও একই অবস্থানে আছি।

 

এখানে সকাল বিকেল রাতে কোনো সময়ই হকার বসতে দেয়া যাবে না। আজকে যারা হকারদের দাবি নিয়ে রাস্তায় নেমেছে এটাতে আমরা সমর্থন করি না এবং আমরা এর প্রতিবাদ জানাই।

 

আমরা মনে করি এটা হকার পুনর্বাসন নয় এটা হচ্ছে হকারদের ব্যবহার করে চাঁদাটাকে পুনরায় বহাল করার একটা প্রক্রিয়া। হাফিজসহ যারা এ হকারদের এ দাবিকে সম্মতি দিয়ে তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছে তাদেরও আমরা সমর্থন করি না।’

 

আত্মপক্ষ সমর্থন করে হকারদের এ দাবিকে যৌক্তিক বলে মনে করেন বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি নারায়ণগঞ্জ জেলা সভাপতি ও হকার নেতা হাফিজুল ইসলাম।

 

তিনি বলেন, সংববিধানে রয়েছে পুনর্বাসন ছাড়া কাউকে উচ্ছেদ করা যাবে না। তাই আমার দাবি হকারদের পুনর্বাসন করা হোক এবং পুনর্বাসন আগ পর্যন্ত বিকেল ৫ টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত তাদের ফুটপাতে বসতে দেয়া হোক। কারণ এ সময়টাতে স্কুল, অফিস টাইমের বাইরে সেক্ষেত্রে এ সময়টাতে হকাররা বসতেই পারে।

 

পৃথিবীর এমন অনেক দেশেই আছে রাস্তার পাশে বসে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসায় পরিচালনা করে আসছে। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশে কেন হতে পারে না? এটা অযৌক্তিকতা বা অবৈধর কিছু নেই। যারা এটাকে অযৌক্তিক বলছে তাদের সংবিধান দেখা উচিত বলে আমি মনে করি। তারা সবকিছুতেই দোষ ধরেন। যে যাই বলুক, আমি আমার অবস্থানে ঠিক আছি।

 

এ সময় তিনি চাঁদাবাজদের প্রসঙ্গে বলেন, আমরা অবশ্যই চাঁদাবাজদের বিপক্ষে। যারা হকারদের পূঁজি করে চাঁদাবাজি করে আমরা সবসময় তাদের বিরুদ্ধে আছি থাকবো। পুলিশ প্রশাসনের কাছে এ সকল চাঁদাবাজদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি।

 

জনমনে এখন প্রশ্ন আবারো কী ১৬ জানুয়ারীর ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে চলেছে? কেননা ২০১৮ সালের ১৬ জুন হকার ইস্যুতে ঘটে যাওয়া ঘটনাটির প্রেক্ষাপট তৈরির কালপ্রিট হিসেবে ধরা হয় এ হাফিজুল ইসলামকে। হাফিজ উস্কানি দিয়ে সড়কে নামানোয় আবারো নগরবাসীর মনে শঙ্কা জেগেছে।

 

তাদের মতে, আবারো কি হাফিজ ১৬ জানুয়ারির মতো প্রেক্ষাপট তৈরি করতে চাইছেন। আবারো হাফিজ কি টেনে আনবেন কোন অসুড়। যার ছোবলে আর কড়াল গ্রাসে রক্তাক্ত হবে নগরীর রাজপথ।

 

উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের ২৫ ডিসেম্বরের পর থেকেই নাসিকের সমন্বয়ে নগরীর বঙ্গবন্ধু সড়কের হকার উচ্ছেদ অভিযানে নামে জেলা পুলিশ প্রশাসন। অভিযানে নামে সিটি করপোরেশনও। কিন্তু বিকল্প ব্যবস্থা না করে হকারদের উচ্ছেদ ও বসতে দেয়ার প্রতিবাদে মাঠে নামে নারায়ণগঞ্জের হকাররা।

 

আর এ সময় হকারদের নেতৃত্ব দেয় হাফিজুর রহমান। ধীরে ধীরে হয়ে উঠেন হকারদের নেতা। পরবর্তীতে হাফিজুল ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে এ হকার সমস্যা সমাধানে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের এ কে এম শামীম ওসমান হস্তক্ষেপের চেষ্টা করলে সমস্যা সমাধানের বদলে সংগঠিত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ।

এই বিভাগের আরো খবর