রোববার   ১৭ নভেম্বর ২০১৯   অগ্রাহায়ণ ৩ ১৪২৬   ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

কাউয়া কাহিনী

প্রকাশিত: ৩০ অক্টোবর ২০১৯  

অমিত হাসান : প্রকৃতি ও পরিবেশের সৌন্দর্য ও ভারসাম্য রক্ষায় পাখির ভূমিকা অপরিসীম। পাখির মধ্যে কর্ভিডি গোত্রের পাখি কাক। তবে, শুধু প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় যেমন কাকের ভূমিকা রয়েছে তেমনি পাখিটি সামাজিক পরিবেশকেও কখনো কুলষিত করে তোলে। কুচকুচে কালো বর্ণের ও ধারালো ঠোঁটের এই পাখিটিকে ধূর্ততার প্রতীক হিসেবেও সমাজে বহুল পরিচিত।

 

কর্ভিডি গোত্রের অন্তর্গত কাক উষ্ণম-লীয় সব মহাদেশ (দক্ষিণ আমেরিকা ব্যতিত) এবং বেশ কিছু দ্বীপ অঞ্চলে কাকের বিস্তার রয়েছে। কর্ভাসগণের মধ্যে প্রায় ৪০ প্রজাতির কাক দেখা যায়। কর্ভিডি গোত্রের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বিভিন্ন প্রজাতির কাকে পূর্ণ। অধিকাংশ কাকের দেহ বর্ণ কালো রঙের। কাকের উদ্ভব ঘটেছে মধ্য এশিয়ায়। সেখান থেকে এটি উত্তর আমেরিকা, আফ্রিকা, ইউরোপ এবং অস্ট্রেলিয়া মহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলার কাক বলতে সাধারণত পাতিকাককে বোঝায়। কাকের প্রসঙ্গ উঠতে প্রথমেই মনে পড়ে ছোট বেলায় বহুল পঠিত একটি ছড়ার কথা। ছড়াটির দুটো লাইন ছিল এরকম- ‘কাকের কঠোর রব বিষ লাগে কানে, কোকিল অখিন প্রিয় সমধুর গানে।’

 

আমাদের অতিপরিচিত নিত্যসহচর এই পাখিকে আমরা যে শুধু ঘৃণা করি তা নয়, তাচ্ছিল্য ও ঘৃণা দুটোর মধ্যেই থাকে এই কাক। কাককে আমরা ধূর্তচোর বলে চিহ্নিত করে থাকি। যে মানুষ আত্মকেন্দ্রিক, দুমুখো, ধূর্ত তাকে আমরা কাকের সাথে তুলনা করি। কাকের বসবাস আবর্জনায়। মানুষের উচ্ছিষ্ট ও আবর্জনা খেয়ে কাক জীবন ধারণ করে। যে এলাকা যত নোংরা সে এলকায় তত বেশি কাক।
কুৎসিত পাখি হিসেবে কাক খুবই পরিচিত। কর্কশ কন্ঠ কাকের কুখ্যাতির একটা বড় কারণ। অমঙ্গলের প্রতীক হিসেবেও কাকের রয়েছে কুখ্যাতি। গ্রামের কোন বাড়ির উঠোনের পাশের কোন গাছে বসে যদি একটা কাক ডেকে ওঠে তবে সেই বাড়ির লোকজনের মধ্যে শুরু হয়ে যায় অমঙ্গল দূর করার নানা প্রস্তুতি।

 

আমাদের সাহিত্যে, গানে, কবিতায় কাক নিয়ে অনেক রসাত্মক বর্ণনা আছে। তার অধিকাংশই কাকের ধূর্ততা, দুমুখো চরিত্র নিয়ে। কাককে বরাবরই অমঙ্গল এবং অশুভ লক্ষণের প্রতীক বলে মনে করা হয়। সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের রাজনীতিতে রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য, বিবৃতি, আলাপ-আলোচনায় কাকের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। রাজনীতিবিদরা ইদানিংকালে প্রায়শই নেতিবাচক অর্থে এই কুৎসিত পাখিটিকে উদাহরণ হিসেবে বক্তব্যে টেনে আসছেন। তাদের আলোচনায় কাকের সঙ্গে মাছির সংযোগ চোখে পড়ার মত। কাক এবং মাছি দুটি প্রাণিরই বসবাস আবর্জনায়। মানুষের উচ্ছিষ্ট ময়লা-আবর্জনা থেকেই কাক ও মাছি তাদের খাদ্য সংগ্রহ করে।

 

পবিত্র হাদিসেও এসেছে কাক প্রসঙ্গ। হযরত আয়শা (রাঃ)ও ইবনে উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত হাদিসে কাক সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বরেন, কাক ক্ষতিকর প্রাণি। তার নাম রেখেছেন ‘ফাসিক’ যার অর্থ নিকৃষ্ট প্রাণি।

 

ইদানিংকালে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ও প্রাচীন রাজনৈতিক দল এবং সরকারি দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এ বর্তমানে দুর্নীতি বিরোধী শুদ্ধি অভিযান চলছে। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ বিশেষ করে দলটি সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী জনাব ওবায়দুল কাদের এই শুদ্ধি অভিযানকে কাক তাড়ানো, মাছি খেদানো বলে আখ্যায়িত করেছেন। ‘দুষ্ট, দুমুখো কাক ও মাছিকে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ দলের জন্য অশুভ ও অমঙ্গলের প্রতীক বলে মনে করছেন। তাই দলকে পরিচ্ছন্ন করার জন্য কাক এবং মাছি তাড়ানোকে জরুরি বলে মনে করছেন।’

 

কাক এবং মাছি ময়লা-আবর্জনা খেয়ে পরিবেশকে দূষণমুক্ত করলেও রাজনৈতিক কাক এবং মাছি রাজনৈতিক পরিবেশকে দূষিত করে। রাজনৈতিক কাক-মাছিরা ভিন্ন গোত্র, ভিন্ন জায়গা থেকে শুধু মাত্র হালুয়া-রুটি পাওয়ার আশায় দলে সুদিনে দলে যোগ দিয়ে দলকে কুলষিত করে।

 

যাদের জন্ম ময়লা-আবর্জনায় (বিএনপি-জামাত, ছাত্রদল-শিবির) তারা দলে (আওয়ামী লীগ) এসে ময়লা আবর্জনা ছিটিয়ে দলকে কলুষিত করছে। জননেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বিশাল বিশাল অর্জনের মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে এক উচ্চ আসনে নিয়ে গেছে। কিন্তু এই অশুভ ধূর্ত কাউয়া আর মাছির জন্য আওয়ামী লীগের এই বড় বড় অর্জনগুলো ম্লান হওয়ার উপক্রম হয়েছে। তাই দল ও দেশ বাঁচাতে দুর্নীতি বিরোধী এই শুদ্ধি অভিযান। ‘কাউয়া খেদাও, মাছি খেদাও’ এই কর্মসূচি আরো বেগবান হোক এটাই আজকের বাংলাদেশের প্রত্যাশা।