শনিবার   ২৪ আগস্ট ২০১৯   ভাদ্র ৯ ১৪২৬   ২২ জ্বিলহজ্জ ১৪৪০

এমপির পিএস’র কারিশমায় কাউন্সিলর সাদরিল কারাগারে

প্রকাশিত: ২০ জুলাই ২০১৯  

স্টাফ রিপোর্টার (যুগের চিন্তা ২৪) : পিতা সাবেক সাংসদ মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন সরাসরি রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত থাকলেও সেভাবে রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেননা নাসিক ৫নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর গোলাম মুহাম্মদ সাদরিল। 


এর সেকারণেই সদ্য সমাপ্ত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের বর্তমান সাংসদ শামীম ওসমানের পরিবারের সদস্যদের সাথে তার সখ্যতার ছবি গণমাধ্যমে আসে। 


বাবার প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীর কারণে যেখানে জেলে যেতে হয়নি তখন এক সংরক্ষিত আসনের পারিবারিক সমস্যা মেটাতে গিয়ে কাউন্সিলর সাদরিলকে কারাগারে যেতে দেখে বিষয়টিকে আড়চোখে দেখছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। 


স্থানীয়দের ভাষ্য, মূলত সংরক্ষিত আসনের এমপি সেলিনা ইসলামের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) সোহেলের বিক্ষুদ্ধ আচরণকে আড়াল করতেই মামলায় জড়ানো হয়েছে সাদরিলকে। এনিয়ে ৫নং ওয়ার্ডসহ জেলার সর্বত্র চলছে আলোচনা।  


স্থানীয়দের মতে, সিদ্ধিরগঞ্জের ওমরপুর এলাকায় প্রবাসী কালু মিয়ার বাড়ির সামনে সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি (৩৪৯) সেলিনা ইসলামের গাড়ি ভাঙচুর ও শ্লীলতাহানি করার মামলায় গ্রেফতার নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) ৫নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর গোলাম মোহাম্মদ সাদরিলসহ ১০ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দশদিনের রিমা- আবেদন করার পুরো প্রক্রিয়াটিই তৈরি হয়েছে এমপির পিএসসে কারিশমায়। 


ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, পুরো ঘটনাকেই ওই পিএস সোহেল জটিল করেছেন। গাড়ি থেকে তিনি নেমেই অস্ত্র হাতে চিৎকার আর গালাগালি করতে করতে বাড়িতে প্রবেশ করতে চায়। ‘কোথায় যাবেন’ জানতে চাওয়াতে বাড়ির দারোয়ানকেও তিনি পিটিয়েছেন বলে শোনা যায়। 


তবে সেটিকে আড়াল করে উল্টো বিএনপির রাজনীতিকের ছেলে ও স্থানীয় কাউন্সিলরের নামে মামলা দিয়েছেন। পুলিশও ঘটনাস্থল পৌঁছে ঘটনার পুরো বিষয়টি আঁচ করতে পারেনি বলে মনে করে স্থানীয়রা। 


 পুলিশের দেয়া তথ্যানুসারে, এমপি সেলিনা ইসলামের আত্মীয় (সম্পর্কে খালাতো বোন) সালমা বেগম (২৫) ও তার স্বামী হাফেজ আহমেদ (৩২) কালু মিয়ার বাড়িতে ভাড়া থাকেন। পারিবারিকভাবে ২০১৮ সালের বিয়ের পর  থেকেই দুজনের মধ্যে পারিবারিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে একাধিকবার ঝগড়া হয়।


ওই ঝগড়া সমাধানের জন্য বুধবার (১৭ জুলাই) রাত সাড়ে ৯টায় কুমিল্লা থেকে সিদ্ধিরগঞ্জে আসেন সেলিনা ইসলাম। বিচার সালিশ শেষে উভয় পক্ষকে মিলে যাওয়ার কথা বলে ভবনের নিচতলায় চলে আসেন সেলিনা ইসলাম। 


তখন ওই ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে ‘বাঁচাও বাঁচাও’ চিৎকার শুরু করে হাফেজ আহমেদ। কিন্তু কেন হঠাৎ হাফেজ কেন চিৎকার করলেন এ বিষয়ে কোন কারণ উল্লেখ করেনি এবং এখানেই পুলিশকে ভুল তথ্য দিয়ে রহস্যের জট পাকিয়েছেন এমপির পিএস সোহেল এমনটিই মনে করেন স্থানীয়রা। তাদের ধারণা, এমপির পিএস হাফেজকে মারধর করেছিলেন কিংবা তাকে অস্ত্র প্রদর্শন করে ভয় দেখিয়েছিলেন। 


প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, ঘটনাস্থলের কাছ থেকে তখন দূরে ছিলেন সাদরিল। আর হাফেজের চিৎকারেই স্থানীয়রা বাড়ির সামনে জড়ো হয়। উৎসুকভাবে বিষয়টি জানতে চাচ্ছিলেন সকলে। এসময় কাউন্সিলর সাদরিল নিবৃত্ত করতে গেলে সেখানে আরো হট্টগোল পাকান এমপির পিএস। 


তিনি উচ্চসরে স্থানীয়দের গালিগালাজ ও অস্ত্র প্রদর্শন করে পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে তৈরি করেন। যার ফলে স্থানীয় লোকজন ক্ষিপ্ত হয়। এসময় এমপিও গাড়িতে না উঠে নিচতলার একটি রুমে আশ্রয় নেন। এমপিকে কেউ কিছুই বলেনি। 


তবে এমপি পিএস সোহেলের উগ্র আচরণে স্থানীয় লোকজন এমপির  (ঢাকা মেট্রো-ঘ-১৫-৬৩৮০) গাড়ির  গ্লাস ভাঙচুর করে। খবর পেয়ে যখন পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে তখন ঘটনা ভিন্নখাতে নিয়ে যান এমপির পিএস। কারণ সম্পর্কে স্থানীয়রা মনে করেন,  এমপির পিএস সোহেল সালমা বেগমের ভাই। 


তাছাড়া তখন সালমার বাবা ও তার ভাই সোহেলের চাচা আব্দুল হাইও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। ঘটনা সামাল দিতে পুলিশের তাড়াহুড়োয় ১০জনকে আটক করে নিয়ে যাওয়ার সময়ও এলাকাবাসীর বক্তব্য পায়নি পুলিশের সদস্যরা। কিন্তু যখন মামলায় কাউন্সিলরকে মামলায় আসামি করা হলো তাতে হতবাক হয়েছেন তারা। 


আর এমপির পিএস ও সালামার ভাই সোহেলের দায়ের করা মামলায় কাউন্সিলর সাদরিলসহ দশজনের ১০ দিনের রিমা- আবেদন এবং আগামী ২১ জুলাই রিমা- শুনানির তারিখ বিস্মিত করেছে এলাকাবাসীকে। 

 

এদিকে এ প্রসঙ্গে জানতে সাংসদ সেলিনা ইসলামের ব্যক্তিগত সহকারি (পিএস) হাফেজ আহমেদ সোহেলের সাথে। তিনি দারোয়ানকে মারধর, অস্ত্রসহ চিৎকার করে বাড়িতে প্রবেশ করার বিষয়টি অস্বীকার করেন। সোহেলের দাবি, “আমরা বোনের বাসায় যাই। সেখানে বোন জামাইকে বুঝিয়ে নেমে আসি। এরমধ্যে নিচে আসার পরে লোকজন আমাদের উপর হামলা করে।”


হামলা করার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “ওপরে বোন জামাই অযথায় চিৎকার করাতে লোকজন জড়ো হয়। তাই তারা আমাদের উপর হামলা চালিয়ে মারধর করে। পরে আমি গুলশানের একটি ক্লিনিকে চিকিৎসা নিয়েছি।”


এদিকে তার চাচা আব্দুল হাই নিজেই দাবি করেছেন, “তার ভাতিজা সোহেল উপরে উঠার আগে নিচ থেকেই চিৎকার করছিলো। তিনি বাধা দিলেও সে থামেনি। 

 

এমনকি উপরে গিয়ে তিনি যখন মেয়ের জামাইকে মারধর করছিলেন তখন এমপি নিজে সোহেলকে থামার জন্য ধমক দেন এবং থামাতে না পেরে দুটি চড় মারেন। এ সম্পর্কে জানতে চাইলে সোহেল বলেন, চাচা যদি কথা ঘুরিয়ে ফেলেন তাহলে কি করার আছে।”

 

তাহলে সাংসদ আপনাকে চড় মারলেন কেন, এমন প্রশ্ন করতেই সোহেল বলেন, “তিনি চড় মেরেছিলেন কিনা মনে নেই। আমার মাথা ঠিক ছিলো না। ওই এলাকার লোকজন মাথায় বাড়ি দেওয়ার কারণে কিছু মনে নেই।” 

 

কিন্তু এমপি তো আপনাকে চড় দিয়েছেন উপরে। তখন তো আর লোকজন নিচে ছিলো না। তাহলে কীভাবে তখন এলাকাবাসী আপনার মাথায় আঘাত করলেন, এমন প্রশ্ন করতেই তিনি মিটিং আছে জানিয়ে ফোনটি কেটে দেন।
 

এই বিভাগের আরো খবর