বুধবার   ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০   ফাল্গুন ৭ ১৪২৬   ২৪ জমাদিউস সানি ১৪৪১

১০কোটি টাকার বাজার

ঋতুরাজ বসন্তকে ঘিরে জমজমাট ফুলের গ্রাম সাবদি

প্রকাশিত: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২০  

যুগের চিন্তা রিপোর্ট : ফুল ভালোবাসেননা এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভারী দুষ্কর। সৌন্দর্যের প্রতীক ও ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে ফুল সবার কাছেই সমাদৃত। অতীতে ফুল কেবল মানুষের মনের ক্ষুধা মেটালেও এখন মুক্ত বাণিজ্যের দিনে ফুল থেকে উপার্জিত আয়ে অনেকেরই পেটের ক্ষুধাও মিটছে। 


যশোরের পর নারায়ণগঞ্জেও ফুল চাষের সম্ভাবনা বিশাল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের আরেকটি সম্ভাবনাময় খাত হতে পারে সেটিই প্রমাণ করেছে। নারায়ণগঞ্জ জেলায় চলতি বছর ১৫৫ হেক্টরের অধিক জমিতে ২৪ ধরণের ফুল চাষ হয়েছে। ফুল চাষ লাভ জনক হওয়ায় চাষিরা তাদের জমিতে অন্যান্য শস্য ফলন না করে ফুল চাষে ঝুঁকে পড়েছে। 


ফুল চাষ করে স্বাবলম্বী নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার কলাগাছিয়া ইউনিয়নের প্রায় ১৫ হাজার নারী-পুরুষ। এই উপজেলায় সবচাইতে বেশি ফুল চাষ হয় কলাগাছিয়া ইউনিয়নের সাবদি গ্রামে। ফুলের সাম্রাজ্য সাবদি ছাড়াও ফুলের দেখা মেলে দিঘলদী, সেলশারদী, মাধবপাশা ও আইছতলায়। 


বছরের এই সময় ঋতুরাজ বসন্তকে বরণ করে নিতে পহেলা ফাল্গুন, ভালবাসা দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে ৫ কোটি টাকার ফুল বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে ব্যস্ত বন্দরের ফুল চাষী আর ব্যবসায়ীরা। প্রতিদিনই ফুলের সৌন্দয্য উপভোগ করতে রাজধানী ঢাকাসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে শত শত নারী-পুরুষ ভীড় জমায় বন্দরের এই সাবদিতে। 


সাবদি গ্রামের সবচাইতে বড় ফুল বাগানের মালিক জাকির হোসেন। তিনি জানান, ‘বছরের বারো মাসই তিনি ফুল চাষ করেন। গোলাপ, গাঁদা, রজনীগন্ধা, গ্লাডিওলাস, জারবেরা, বাগানবিলাস, চন্দ্রমল্লিকা, ডালিয়া, কসমস, দোলনচাঁপা, নয়নতারা, মোরগঝুটি, কলাবতী, বেলী, জীপসী, চেরী, কাঠমালতী, আলমন্ডা, জবা, রঙ্গন, টগর, কাঠগোলাপ, রক্তজবা, ক্যালেন্ডুলা ফুলের চাষ করেন তিনি। 

 

ফলন ভালো হয়, ভালো লাভও হয়। তবে ফুল চাষের জন্য মানসম্পন্ন বীজ, চারা ও টিস্যু কালচারের জন্য গবেষণাগার নেই, স্বল্প সুদে ঋণের সুবিধা পাওয়া যায় না। উৎপাদিত ফুল সংরক্ষণে কোন হিমাগার এবং বাজারজাত করারও ভাল ব্যবস্থা নেই। এসব সমস্যার সমাধান করলে ফুলের চাষ আরো বাড়বে, আগ্রহী হবে মানুষ।’  


ফুল চাষী সানী মিয়া বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জ, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ফুলের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। পহেলা ফাল্গুন, ভালবাসা দিবস, পহেলা বৈশাখ, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২৬ মার্চ, ১৬ ডিসেম্বরসহ জাতীয় দিবসগুলো ছাড়াও জন্মবার্ষিকী, মৃত্যুবার্ষিকী, গায়ে হলুদ, গাড়ি সাজানো, বিভিন্ন ধরনের পূজা-পার্বন ও সভা-সমাবেশে ফুলের বেশ চাহিদা রয়েছে। এসব দিবস আসলে ফুলের দাম একটু বেশি পাওয়া যায়।’


তিনি জানান, ‘দিঘলদী গ্রামের বেকার যুবক সুধেব চন্দ্র দাস প্রথম এই গ্রামে ফুলের চাষ শুরু করেন। পরে আরও কয়েকজন  বেকার যুবক ওই গ্রামে সুধেবের দেখাদেখি ফুলের চাষাবাদ করেন। ওই গ্রামের রহমতউলল্লাহ ১৯৯২ সালে ডেমরার বাওয়া জুটমিলের চাকরি চলে যাওয়ার পর তিনি ঢাকায় ফেরি করে ফুলের ব্যবসা শুরু করে। পরে ওই গ্রামের অপর ফুল ব্যবসায়ী মোতালেবের উৎসাহে ১৯৯৫ সালে তিনি গ্রামে এসে বাৎসরিক ইজারা ভিত্তিতে অন্যের জমিতে ফুল চাষ শুরু করেন। বর্তমানে রহমতউল্লাহর ফুল চাষ করে নিজে ২০ বিঘা জমির মালিক হয়েছেন।’

 

ফুল তুলে ও মালা গেঁথে ঘরে বসেই পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও বাড়তি আয় করে সংসারে সহায়তা করে স্বাবলম্বী হয়ে উঠছে স্থানীয়রা। নারী ফুল শ্রমিক সীতা রানী চন্দ্র  বলেন, ‘এখানকার নারীরা সাংসারিক সুখ-দুঃখের আলাপচারিতার ফাঁকে ফাঁকে ডালা ভরে ফুল কলি তোলে যার যার বাড়িতে ফিরে আসে। 

 

কাঠমালতির ফুল দিয়ে ‘গাজরা’ ও ফুল কলির লহর বানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে পুরো এলাকার মহিলারা। স্কুলের ছাত্রছাত্রীরাও সকাল ৯টা পর্যন্ত কলি তুলে স্কুলে যায়। তারা আবার বিকালে বাড়ি ফিরে ফুলে লহর বানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। 

 

এদিকে ফুলচাষীরা বাগান থেকে তুলে আনা ফুল বাড়ির আঙ্গিনায় মালা গেঁথে সেগুলো সন্ধ্যায় সাবদি বাজারে নিয়ে জড়ো করে। সাবদি বাজার থেকে ট্রাকে করে পাইকাররা প্রতিরাতে এসব ফুল ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যায় বিক্রির জন্য। উৎসবের আগে সবাই বাগানের তাজা ফুল চায়, ফুল বাগান থেকেও অনেকে ফুল কিনে নিয়ে যায়।’ 

বন্দর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ফারহানা সুলতানা জানান, ‘বছরের বারোমাসই বন্দরের কয়েকটি গ্রামে ফুল চাষ করা হয়। পহেলা ফাল্গুন, বিশ্ব ভালোবাসা দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে ফুলের বিক্রি নিয়ে ব্যস্ত ফুল চাষী ও ব্যবসায়ীরা। এতিনটি দিবসেই প্রায় ৫ কোটি টাকার ফুল বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে ব্যস্ততা ফুল চাষী ও ব্যবসায়ীদের।’   

 

বন্দর থানা বহুমুখী ফুল ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক তাওলাদ হোসেন বলেন, ‘সারা বছর ফুলের ব্যবসা হলেও বিশেষ বিশেষ সময়ে বেশী ভাল হয়। বিভিন্ন দিবসে ফুল বিক্রির ধুম পড়ে যায়। এ ব্যবসায় আরো সাফল্য পেতে চীন থেকে আসা কৃত্রিম ফুল বন্ধের জন্য সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করি আমরা। 

এছাড়া ফুল সংরক্ষণ, মান অনুযায়ী বিন্যাস করা ও মোড়কীকরণের ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তি ও কলাকৌশলের অভাব রয়েছে। ফুলচাষে বিদ্যমান সমস্যা নিরসন করে এই খাত সম্প্রসারণে সরকারি উদ্যোগের দাবি সবসময়ই জানায় ফুল চাষিরা। তবে এ বছর পোকায় ফুলের ক্ষতি সাধন করছে। এসব সমস্যা সমাধানে সরকার উদ্যোগ নিয়ে ফুল বিদেশে রপ্তানি করে বিপুল পরিমান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব।’ 

 

জেলায় ১৫৫ হেক্টরের অধিক জমিতে এ বছর ফুল চাষ হয়েছে জানিয়ে নারায়ণগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত উপ পরিচালক ড.মো.গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘ফুল চাষ লাভজনক। নারায়ণগঞ্জে বিশেষ করে বন্দরে ফুল চাষ ব্যাপকতা লাভ করেছে। জেলায় প্রায় ২৪ জাতের ফুল চাষ হয়। 


বন্দরের পাশাপাশি সোনারগাঁও উপজেলার সম্ভুপুরা ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামে এবং রূপগঞ্জ উপজেলার মাসুমাবাদ ও ভোলাবো এলাকায়ও ফুল চাষ করে সাবলম্বী হয়েছেন অনেকে। ফুল চাষীদের আমরা কারিগরী বিষয়গুলো যেমন প্রশিক্ষণ, ফুলের রোগ-বালাই প্রতিরোধে মাঠ পর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তারা দেখভাল করছে।

ফুলচাষীদের কোন সমস্যা থাকলে সেগুলো সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে। ফুলের নতুন জাত, এবং প্রযুক্তি আরো কীভাবে সম্প্রসারিত করা যায় সেবিষয়ে ফুলচাষীদের আমরা সজাগ রাখি।’  

 

চলতি সপ্তাহেই বন্দরের দিঘলদী এলাকায় একটি মন্দিরের উন্নয়ন কাজের পরিদর্শনে গিয়ে সাবদীকে পর্যটন এলাকা হিসেবে গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানিয়েছেন, নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান। তিনি বলেন, ‘এই এলাকার মানুষ ফুলের চাষ করে। এখানে চারপাশে ফুলের ক্ষেত। অপরপাশে ব্রহ্মপুত্র নদ। এখানে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসে। তাই এটিকে সম্পূর্ণভাবে পর্যটন এলাকা হিসেবে গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর এতে সব থেকে  বেশি সহযোগিতার প্রয়োজন হবে এই এলাকার মানুষের। 


এজন্য আপনারা রাস্তার পাশে জায়গা দখল করে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করবেন না। আর যারা ফুল চাষী আছেন আপনাদের এই ফুলই হবে এই এলাকার পর্যটন কেন্দ্র এবং সাবদির মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির মূল ভিত্তি।’ 
 

এই বিভাগের আরো খবর