বৃহস্পতিবার   ১৪ নভেম্বর ২০১৯   কার্তিক ৩০ ১৪২৬   ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

উত্তর দক্ষিণ

প্রকাশিত: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯  

পর্ব: ০৯

আনোয়ারা ডায়গনস্টিক সেন্টার থেকে সীমার বায়াপসি রিপোর্ট এসেছে। হাসপাতালের ডক্টরদের দেখালাম। সেদিন বিকেলে প্রফেসর ডাক্তার মোয়ারফ স্যার এলেন একটি টিম নিয়ে। সীমাকে দেখলেন। কেবিন থেকে বেরিয়ে এসে বললেন- রোগীর এ অবস্থায় আপনারা ইচ্ছে করলে বাহিরে নিয়ে যেতে পারেন কিংবা আমাদের এখানে রাখতে পারেন। আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাবো। আমি সাথে সাথে বললাম- আমি আপনাদের এখানেই চিকিৎসা করাবো।

 

সিদ্ধান্ত হলো প্রথমে কেমোথেরাপি দেয়া হবে। তারপর সার্জারি। এরপর রেডিওথেরাপি। আমি শাহাবকে জানালাম। ফেরদৌস ভাইকে জানালাম। ফেরদৌস ভাই চাইলেন প্রথমে সার্জারি করে টিউমারটির সাইজ ছোটো করে নিতে। মোয়ারফ স্যার পরদিন আমাকে জানালেন, ফেরদৌস আমাকে ফোন করেছিলো। আমি তাঁকে বলেছি এই পর্যায়ে সার্জরিটা পূর্বে করলে অনেক ঝুঁকি থাকে। রোগটা তখন অনেক দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সুহৃদ বন্ধু ডাক্তার অনুপও বললো-কেমোথেরাপি আগে দিয়ে নিন। তিনি আরও বললেন, দেশের সর্বোচ্চ হাসপাতাল যে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে সেটা ঠিক হবে।

 

তখনতো কিছু বুঝি না। শুধু জানি কেমোথেরাপি মানে ভীষণ ভয়ের বিষয়। অসহনীয় কষ্ট। আমার ভয়ে আত্মা শুকিয়ে যায়। সীমাকে কোনো কিছুই জানানো হয় না। প্রফেসর ডাক্তার মফিজুর রহমান কেমো দেয়ার প্রস্তুতি পর্ব হিসেবে বেশ কয়েকটি টেস্ট দিয়ে গেলেন। সাথে সাথে সীমার ছোট ভাই দিদার এবং তাঁর মামা সেলিম ব্লাড টেস্টের ব্যবস্থা নিয়ে ফেললো। এ দু’জন যতটা করেছে তার হিসেব কষা ঠিক হবে না। ভাই বোনের জন্য মামা ভাগ্নির জন্য করবে এটাই আমাদের সামাজিক রীতি। তারা করেছেনও অকৃত্রিম ভালোবাসার আলোকে। এ পর্যন্ত সব ঘটে যাচ্ছে অনেক দ্রুত। সব জায়গা থেকেই বিশাল সাপোর্ট পাওয়া যায় যা কারোরই ভাবনার মধ্যে ছিলো না।

 

ব্লাড রিপোর্ট দেখে মফিজ স্যার জরুরি ভিত্তিতে ব্লাড দেয়ার কথা জানালেন। আমি সবাইকে ব্লাডের প্রয়োজন জানালাম। ব্লাড মিলানো যাচ্ছে না। অনেক সময় এমন হয়। সহজ জিনিসও দুর্লভ হয়ে ওঠে। বি+ ব্লাাড গ্রুপ। পাওয়া খুব কঠিন কাজ নয়। কিন্তু এখন অতি জরুরি সময়ে পাওয়া যাচ্ছে না। এদিকে মফিজ স্যার বার বার যোগাযোগ করছেন। জানতে চাচ্ছেন ব্লাড দেয়া শুরু হয়েছে কি না। তখনতো জানি না হিমোগ্লোভিন কম থাকলে কেমোথেরাপি দেয়া যায় না। রক্ত দিয়ে কিছুটা সময় নিয়ে আবার টেস্ট করাতে হয়। হিমগ্লোভিন দেখতে হয়। 

 

শেষে সিদ্ধিরগঞ্জ থেকে এক সুহৃদ ব্যক্তি আমার এক বন্ধুর ফোনে যোগাযোগ মারফত চলে এলেন হাসপাতালে তাঁর ব্যবসায়িক জরুরি কাজ ফেলে। আমি সাধারণত সব কিছুর নোট টুকে রাখি। তাঁর নামটাও রেখেছিলাম। চারিদিকের চাপে দুশ্চিন্তায় আমি তখন স্থিতিশীল থাকতে পারি নি। ঠিক মত দম ফেলতে পারি নি কখনও। তাঁর নাম ও ঠিকানা কোথায় যে রাখলাম এখন মনে করতে পারছি না। এরই মধ্যে আমার দুটি মোবাইল চুরি হয়ে গেলো। সর্বনাশ হলো আমার বড় একটি তথ্য ভাণ্ডারের।

 

সীমা কিছুই বুঝে না তাকে নিয়ে এদিকে কি চলছে। কী হচ্ছে জানতে চায় না। তবে ভিতরে জানার আগ্রহ প্রবল। আমি নানা কথায় নানা গল্পে তার মনোযোগ অন্যদিকে ঘুরিয়ে রাখি। সে সুস্থ হয়ে যাবে তার আশ্বাস দেই। মানুষের মনই হলো বড় শক্তির উৎস। এখানে কমান্ড ঠিক দিতে পারলে অনেক অসাধ্য সাধন করা যায়। তাকে আমি বুঝাই তুমি ঠিক হয়ে যাবে। 

 

অনেক উদাহরণ টেনে নিয়ে আসি। কয়েক মাসের সময় দিয়েছিলেন ক্যান্সার আক্রান্ত এক কিশোরীকে চিকিৎসকগণ। সেই কিশোরী শেষ ইচ্ছা পূরণ করার জন্য তাদের ফার্ম হাউজে চলে গেলো পরিবারের সবাইকে নিয়ে। সেখানে সবাই খুব আনন্দ করে কাটায়। দিন যায় মাস যায় বছর যায় কিশোরী মারা যায় না। সবাই অবাক হয়ে আবার চিকিৎসকের কাছে চলে আসে। রিপোর্ট দেখা গেলো কিশোরী ক্যান্সারমুক্ত। 

 

আশ্চর্যজনক ঘটনাটি ইউরোপের কোথাও। তাদের সামাজিক রীতিনীতি আমাদের মতো নয়। তাদের চিন্তা-ভাবনা অনেক উন্নত। এদিকে আমাদের সব জায়গায় সমস্যা থাকে। সমস্যা সৃষ্টি করার জন্য খুব কাছেই কিছু অবুঝ মানুষ থাকে। সমস্যা তারা যে কোনো প্রকারে সৃষ্টি করে থাকে। যত ভিজিটর আসেন তাদের চেহেরা দেখেই রোগী আতঙ্কিত হয়ে ওঠেন। নানা উপদেশ দিতে থাকেন। এমন কি কবে কে মারা গেলো তার খবর নির্দ্ধিধায় বলতে থাকেন। আমার পর্যাপ্ত টাকা থাকলে সীমাকে আমি সব সমস্যার উর্ধ্বে রাখতে পারতাম। বাইরের কোনো দেশে চলে যেতাম। কখনও এক পাল অনেক বড় মাহাত্ম রাখে এই কষ্টকর জীবনে।

 

আমি সারাটা জীবন চেয়েছি অর্থ সঙ্কট দূর করতে। স্বনির্ভর থাকতে। দেশে এসে যে পথে যাচ্ছিলাম তাতে দূর করে ফেলতে পারতাম। একটা সময় আর কয়েক হাত দূরে ছিলো অভাব মুক্ত নিষ্কন্টক প্রশস্ত সড়ক। আর্থিক সচ্ছলতাটা এসে গিয়েছিলো প্রায়। পথ নির্বাচনও ছিলো যুগোপযোগী। এ ব্যবসায় কতটা প্রাচুর্য্য এসে যেতো ভাবা যায় না। যা অনেকেরই কল্পনার বাহিরে চলে যেতো। 


১৯৯৩ সালে বুটিক ব্যবসার চিন্তা যখন করি। তখন নারায়ণগঞ্জে এ বিষয়ে কেউ কল্পনা করে নি। সারা পেয়েছিলাম ব্যাপক। বোধহয় আমার খুব কাছের কিছু মানুষেরা সেটা সহ্য করতে পারছিলেন না। এক ঘনিষ্ট বন্ধুকে আমাদের প্রথম পোশাক মেলায় এমনকি নারায়ণগঞ্জের প্রথম পোশাক মেলা উদ্বোধনের পর মাইক্রোফোন দেয়া হলো কিছু বলার জন্য। সে তখন নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারে নি। তার কথায় শুধু হিংসা ঝরে পড়েছিলো সেদিন! তার কোনো কথায় আমি উৎসাহ পাই নি। আমার টিমের সবাই আশাহত হয়েছে।

 

কয়েকদিন পর মেলা চলাকালীন সময়ে আবার সেই বন্ধুটিই যখন পৌর পাঠাগারের মেলা প্রাঙ্গণ সংলগ্ন হঠাৎ গোলোযোগ বাঁধে আমার ওই বন্ধুটিই দৌড়ে এসে মেইন গেট ব্রক করে দাঁড়িয়ে যায় এবং চিৎকার করে বলে- জামাল, তুই চিন্তা করিস না। আমি এসে গেছি। মানুষের চরিত্র বোঝা বড় কঠিন। কখন কোন সময় কী করে বসে তা বলা যায় না। কখন খুব কাছে চলে আসে আবার কখন দূরে চলে যায় তা বলা যাবে না। আমাদের মেনে নিতে হয় এই বাস্তবতা। আমি সহজ সরলভাবে দেখি সব। কোনো ভেজাল চিন্তা করতে পারি না আমি। যদি আমার আর্থিক অভাব-অনটনে ফেলা না হতো তবে আমার মতো দায়িত্বশীল ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়তো। গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি।


সেবার মেলায় উপচে পড়ছিলো মানুষের ঢল। ১৯৯৪ সালের মাঝামাঝি নারায়ণগঞ্জ পৌর পাঠাগারের মহড়া কক্ষে মাসব্যাপী পোশাক মেলা চলছে। নারায়ণগঞ্জে প্রথম পোশাক মেলা। নারায়ণগঞ্জের প্রথম বুটিক হাউজ নকশা’র আয়োজনে। ভাবা যায় ? আমার এক পা তখন ফ্রাকচার। পাতাসহ হাটু পর্যন্ত একুশ দিনের জন্য প্লাস্টার করা। ক্রাচে ভর দিয়ে আমি এই সফল মেলার আয়োজন করি। আমাদের পোশাক প্রদর্শনে ও বিক্রয়ে সাহায্য করেছিলো নারায়ণগঞ্জ শহরের তখনকার সেরা একটি তরুণ টিম। তার মধ্যে ছিলো দশ/বারো জন উচ্চ শিক্ষিত শহরের সম্ভ্রান্ত ও প্রভাশালী পরিবারের অত্যন্ত আকর্ষণীয় তরুণী। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত এগারোটা-বারোটা পর্যন্ত তারা আমাদের সময় দিয়েছে। এই প্রাপ্তি ভোলার নয়। কৃতজ্ঞ আমি তাদের কাছে।

 

ছেলেদের মধ্যে ছিলো মোরসালিন বাবলা, জাভেদ রাজু, লিও, শিপলু, পিয়াল আরও অনেকে। মোরসালিন বাবলা টিভি সাংবাদিকতায় বর্তমানে অত্যন্ত সুনামের সাথে বিরাজমান। তখন দৈনিক পত্রিকায় সাংবাদিকতা করে। আমার যতদূর মনে পড়ে দৈনিক জনকন্ঠের নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছে।

 

কতটা উদ্যমী হলে এক পায়ে খোরায়ে খোরায়ে আমি একটি সফল মেলা সম্পাদন করতে পারি। দিনের মধ্যে একতলা দোতলা করতে হয়েছে বহুবার। চমৎকার ইন্টিরিয়র করেছিরাম লোহা-লক্কর দিয়ে। বার বার যেনো ব্যবহার করা যায় সেভাবে তৈরি করেছিলাম। নাট বল্টুর মাধ্যমে সেই সব সেট জোড় লাগানো হতো। ঢালাইয়ের মাধ্যমে পা’গুলো তৈরি করেছিলাম। বিশ্বাস হয় এক পায়ে ছুটে বেড়িয়েছি নানা জায়গায়। কখনও লোহা ঢালাইয়ের কারখানা কালীর বাজার। কখনও মিশনপাড়ার ফরহাদ ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপে। ওরা ছাড়া আমাকে তখন এ কাজে কেউ সাহায্য করার ছিলো না। তারাই জানতেই পারছে না, বুঝতেই পারছে না আমি কী করতে যাচ্ছি। আমার মাথায় কী কাজ করছে। 


এর উপর কঠিন বাঁধাপ্রাপ্ত হতে থাকি বার বার। কখনও খুব কাঁদতে ইচ্ছে করতো। কিছু মানুষ থাকে যারা নিজেরা করতে পারে না। অন্যকেও করতে দেয় না। এ নিয়ে চলে সারাক্ষণ নানা আলোচনা সমালোচনা। তারা ভিতরে ভিতরে উসকায়ে দেয় প্রতিবন্ধকতার প্রবল ঢেউগুলো। ভেঙে পড়ে এক সময় সব। এমন কি এক সময় নিজেদের অস্তিত্বও বিপন্ন হয়ে ওঠে।

 

নতুন উদ্যোগ নেয়ার বড় যন্ত্রণা থাকে। কাউকে নিজের ভিশন দেখানো যায় না। তারা বুঝতে পারে না লক্ষ্য কতদূর। আমি ভাবতাম এক সময় চাহিদামত যোগ্যতামত যখন অর্থ প্রদান করা হবে তখনই নড়ে চড়ে বসবে সবাই। আমার বড় সমস্যা ছিলো বিনিয়োগে দুর্বলতা। আর্থিক সঙ্কট। পোশাকের বহু প্রতিষ্ঠান যুগের পর যুগ, দু-একটা প্রতিষ্ঠান শত বছরও অতিক্রম করেছে। লক্ষ্য এমনই ছিলো। আমি থাকবো না এক সময়। প্রতিষ্ঠান থাকবে। হয়তো তখনকার যারা পরিচালনায় থাকবে তারা হয়তো প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে উৎসাহে, শ্রদ্ধায় একটি ছবি ঝুলবে। প্রতি কর্মদিবসে ভক্তিভরে সম্মান দেখাবে। এমনইতো ছিলো আকাঙ্খা। খারাপ ছিলো কি?

 

মেলায় এনামুল রাতের বেলায় থাকতে রাজি হয়ে দুশ্চিন্তা কমিয়ে দিয়েছিলো। ছেলেটি ভীষণ সরল। কিন্তু ধৈর্য ও সহনশীলতা কম। আমার ভিশন ধরতে পারে নি। পরিশ্রম করতে পারতো অনেক। বিশ্বাসী ছিলো শতভাগ। কিন্তু শেস পর্যন্ত কিছু সমস্যা সে কাটিয়ে ওঠতে পারে নি। আমিও বার বার ব্যর্থ হচ্ছি তাদের সময়মতো টাকা দিতে। আশাতীত সুযোগ সুবিধা দিতে নতুবা আমার থেকে সরতে পারে কেউ!

 

১৯৯৩ সালের মার্চ মাসে দুবাই থেকে ফিরে এসে সীমা-জিনার সাথে বসলাম। কথা হলো ভবিষ্যত নিয়ে। কিছু একটা করবো তা নিয়ে। আমার লক্ষ্য বোঝাতে চেষ্টা করলাম। প্রমাণ দিলাম কিছু তৈার করে নিজের যোগ্যতার। তারাও ঝাঁপিয়ে পড়লো আমার সাথে সুন্দর একটি লক্ষ্য নিয়ে। সীমা-জিনা যতটুকু করেছে তা অবিশ্বাস্য। তারা রাত-দিন পরিশ্রম করেছে। আজ ২০১৭ এর জুন মাস ক্যান্সার হাসপাতালের বেডে শুয়ে সীমা বলে- জামাল, আমাকে বাঁচাও। আমি আবার নকশা’য় আগের মতো পরিশ্রম করবো। অনেক পরিশ্রম করবো।

 

আমার ভিতরে প্রবল কষ্টের চাপ তৈরি হয়। তা দুচোখে লোনা জল হয়ে বের হয়ে আসতে চায়। প্রচণ্ড জোরে চিৎকার করে কাঁদতে পারলে ভালো হয়। আমি সীমার সামনে কাঁদতে পারি না। ক্যাবিনে দ্বিতীয় কেউ নেই যাকে রেখে বাহিরে গিয়ে দাঁড়াতে পারি। এ জীবনে আমার লক্ষ্য কী ছিলো? আর কী হয়ে গেলো! সবাই মিলে আমাদের সামান্য সহযোগিতা করলেই হয়ে যায়। তা না করে অনেকেই দাঁড়িয়ে গেলো প্রবল প্রতিবন্ধক হয়ে। যত অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি এই একটি ব্যবসায় তা সব লিখে গেলে অনেকের চরিত্র নগ্নভাবে উন্মাচিত হয়ে যাবে। তা কি সম্ভব ? বোঝমান হয়ে উপরের দিকে নোংরা কিছু কি ছোঁড়া যায়?

 

প্রতিটি মৃত্যুর কোনো না কোনো কারণ থাকে। আমার মৃত্যুর কারণও থাকবে। সেই কারণগুলো আমি এখনই লিখে যেতে পারি। কতটা নির্মম অভিজ্ঞতা আমার অর্জন হয়েছে প্রতিটি পদে পদে তা ভাবা যায় না। আমি লিখি কেনো ? এ সমাজের বাহিরে আমি নই। আমার মতো এমন অনেকেই এইরকম তিক্ত অভিজ্ঞতা অর্জন করে। তারা সবাই জানাতে পারে না। লিখতে পারে না। কখনও সাহসের অপ্রতুলতা, কখনও লেখার অনভিজ্ঞতায় তারা আটকে থাকে। যতটুকু লিখি নাম উল্লেখ না করে। সামান্য আভাসেও যেনো প্রকাশ না পায় সে চেষ্টা করি। কী প্রয়োজন কাউকে হেয় করে। ছোটো করে। যার যার কর্মফল একদিন ভোগ করবেই। ইহকাল কী পরকালে। 

 

আমাকে অনেকেই খাটো করে। দ্বায়িত্বহীন প্রমাণ করতে চায়। কিন্তু আমার কাছে অকাট্য প্রমাণ আছে নিজেকে নির্দোষ সাব্যস্ত করার। কার কাছে গিয়ে নিজের কষ্ট বলবো? দেখা আছে আমার কার কতটুকু যোগ্যতা! তারচেয়ে বরং লিখে যাই। সেটাই ভালো। ভবিষ্যতে অন্তত কেউ না কেউ আমার দুঃখটুকু নিয়ে হয়তো কোনো অবসরে ভাববে। চোখের কোণে তার দুফোটা জল জমবে। কারণ এমন অসহায় জীবন কম লোকেই পার করে।

 

আমার এক লেখক বন্ধু বলেছিলো- তুই লিখ গল্পাকারে। উপন্যাসাকারে। যেনো এটা গল্পই মনে হয়। অনেক চেষ্টা করেছি। হয় নি। নিজের জীবনের এমন নির্মমতা নিয়ে গল্প লিখে নিজেকে উপহাস করার মতো দাঁড়িয়ে যায়। আমি পারি নি। আমি বহু চেষ্টা করেছি। এই হঠকারিতা করার যোগ্যতা আমার নেই।

 

দূর থেকে অনেক কিছু ভাবা সম্ভব। ভাবনার কত কত ঢাল পালা তারা গজায়। এমন কল্পিত ভাবনা থেকে কঠিন নির্মমভাবে কখনও আঘাত করে বসে। একবারও ভাবে না তার প্রতি উত্তর থাকতে পারে। সেই প্রতি উত্তর দিয়ে ভদ্রলোকেরা তিক্ততা বাড়াতে চায় না। আমিও চাই না। আর ঘুরে ফিরে দেখি মানুষ লাগাতার কারোর অপকার বা ক্ষতি করে না মাঝে উপকারও করে বসে। 

 

একাবারে প্রফেশনাল নিষ্ঠুর ব্যক্তি না হলে কেউ একেবারে খারাপ হয় না। আমি এমন অনেকের সহযোগিতা পেয়েছি। যারা আমার সরাসরি বিরুদ্ধে অবস্থান করলেও প্রকাশ্যে বা সংগোপনে আমাকে ঠিকই উপকার করেছেন। তাদের প্রতি আমি খোলাখুলি কীভাবে অকৃতজ্ঞ হই। হতে পারে উপকারের চেয়ে বেশি অপকারই করেছে। তারপরেও আমি পারি না। আমার তাদের প্রতি মমত্ববোধ জাগে। বুঝি না এমন কেনো হয়। কেনো আমার হৃদয়ের গহীনে তাদের প্রতি সহানুভূতি জাগে। সর্বশেষ যা বুঝি মানুষের চরিত্র বোঝা বড় দায়।

 

এক ব্যাগ রক্ত দেয়ার পর পরদিন সিবিসি টেস্টের রিপোর্ট নিয়ে গেলাম মফিজ স্যারের নিকট। মফিজ স্যার রিপোর্ট নিয়ে ডিরেক্টর প্রফেসর ডাক্তার মোয়ারফ স্যারের সাথে ফোনে আলাপ করলেন। মফিজ স্যার কেমোথেরাপির নাম লিখে দিলেন। কোথা থেকে পাওয়া যাবে তা-ও বলে দিলেন।

 

৬ জুন ২০১৮ সীমার ক্যাবিনে সেদিন সকাল থেকেই আলাদা কেয়ার নেয়া শুরু হয়ে গেলো। তারা বার বার এসে এটা সেটা মাপছে। তাপ আছে কি না। প্রেসার ঠিক আছে কি না। সর্বশেষ ওজনও দেখে নিলো। এর মধ্যে সকালের দিকে ডক্টরদেরে একটি টিম মোয়ারফ স্যার আর মফিজ স্যারের নেতৃত্বে ভিজিট করে যায়। এক সময় ডাক্তার রোবানা সাবরিন এলেন সাথে দুজন সিনিয়র নার্স নিয়ে। নরমাল স্যালাইন দেয়া হলো প্রথমে। এর পর কেমোথেরাপি শুরু হলো। 

 

ডাক্তার রোবানা সাবরিন সারাক্ষণ বসে থাকলেন। সীমার সাথে অবিরাম কথা বলে গেলেন। লাল রঙের প্রথম কেমোথেরাপি এক সময় শেষ হলো। রোবানা সাবরিন ফোন দিলেন মফিজ স্যারের নিকট। বুঝতে পারলাম ওপাশ থেকে আলহামদুল্লিাহ বলে ফোন রাখলেন। সীমাকে এরপর জানানো হলো তাকে ইতিমধ্যে কেমোথেরাপি দেয়া হয়ে গেছে। সে বড় বড় চোখ করে অবাক হয়ে গেলো এর মধ্যে এত সব কা- ঘটে গেছে বলে! অনেক দিন পর তাকে বেশ আনন্দিত দেখা গেলো। বেঁচে থাকার একটা রাস্তা তার চোখের সামনে খুব সম্ভবত ভেসে ওঠে! (চলবে...)

 

এটিএম জামাল
সোনারগাও ভবন, মিশনপাড়া, নারায়ণগঞ্জ
১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯