শুক্রবার   ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯   আশ্বিন ৫ ১৪২৬   ২০ মুহররম ১৪৪১

উত্তর দক্ষিণ

প্রকাশিত: ২০ জুন ২০১৯  

পর্ব : তিন

গ্রীন লাইফের টেস্টগুলো শেষ করে বিশ্রাম নেয়ার কথা জিনা, শাহনাজের বান্ধবী পাপিয়াদের বাসায়। জিনা সীমার ছোট বোন, শাহনাজ খালা। শাহনাজ বয়সে তাদের বেশ ছোটো। সীমার বিশ্রাম নেয়া সম্ভব হয় না। সময় মোটামুটি গ্রীন লাইফে যথেষ্ট গিয়েছে। অনেকগুলো টেস্ট সময়তো যাবেই। এখন ছুটছি আনোয়ারায় বায়াপসি করার জন্য। সীমার রোগটি কী পর্যায়ে আছে তার পরীক্ষা-নীরিক্ষা করার জন্য। তার উপরই চিকিৎসা। 

 

প্রথমদিনই চিকিৎসক চৈতিকে জানিয়েছিলেন সীমা বড়জোর দু-তিন মাস বেঁচে থাকবে। আমার বুক ধুক ধুক করে কাঁপে। শ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে চায়। মৃত্যু? মানে সবাইকে ছেড়ে একেবারে চলে যাওয়া ? আমি মানতে পারি না। কীভাবে মানা যায় ? তবে যেতে হয়। সবাইকে ছেড়ে যেতে হয়। এই ভাবনার ভীষণ কষ্ট! সীমা কষ্ট পাচ্ছে আমি বুঝি। আমারও কষ্ট হয়। বড় কষ্ট হয়। 

 

মৃত্যু নিয়ে আমার দুর্ভাবনা কয়েক জায়গায়। প্রথমত প্রিয়জনদের কোথায় রেখে যাচ্ছি। দ্বিতীয়ত ঋণগুলোর বিধি-বিহিত করে যেতে না পারা। উপরন্তু সেগুলো কারোর ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে যাওয়া। সে আমি ভাবতে পারি না। তারপর এই সুন্দর পৃথিবীতে আর না ফেরার দুঃখ। কি দেখলাম এই জীবনে ? নোংরামী-কদর্যতা ছাড়া আর কিছুইতো দেখা হলো না। 

 

সীমারওতো এমন বহু হাহাকার বুকে চেপে আছে। কোনো শখ পূরণ হলো না তার এ জীবনে। বরঞ্চ নানা যন্ত্রণার মধ্যে গত সাতাশটা বছর তাঁর পার হলো। দুঃখগুলো তাঁর শেষে হলো না কোনো কালেই এরই মধ্যে শরীরে বাসা বেঁধেছে মরণঘাতী রোগ। ভাবতেই ভয়ে গা শিউড়ে ওঠে ! সীমা কিছু বলে না কিন্তু কিছুটা আঁচ করতে পেরেছে। এই যে দৌড়াদৌড়ি, ছোটাছুটি চোখে পড়ার মতোইতো। ভয়ংকর একটা কিছুর দুূর্ভাবনা তাকে পেয়ে বসবে সেটাই স্বাভাবিক। সব মিলে আমি যে কতটা অসহায় বোধ করছি সে আমি কাকে বোঝাই। 

 

অন্যদিকে অনেকের কাছে আমি খুব একটা ভালো মানুষ নই। তাদের কাছে তার অসংখ্য কারণ রয়েছে। তা আমি সব জানি না। এদিকে আমার মানুষের ভুলগুলো তড়িৎ চোখে পড়ে। তাদের কৃত্রিম ভালোবাসা আমার সহ্য হয় না। কারোর শঠতা আমি বরদাস্ত করি না। সাধারণত আমি এগুলো থেকে দূরে থাকি। যেহেতু যাদের সাথে আয়-রুজির ঘাট বেঁধেছি সেখানে ছাড় দিলে হয় কী করে ? এরপর আমি ভালো করে জানি নিজের পায়ে দাঁড়াতে না পারলে আত্মতৃপ্তি আসে না। অবশ্য সাহায্য-সহযোগিতা, দয়া নেয়া যায় একটা সীমারেখা পর্যন্ত। হিসেব করতে হবে প্রতিদানের সময় যেনো হাতে থাকে। নতুবা এ জীবনের কী মূল্য থাকলো।

 

পরনির্ভরশীল পরগাছার মতো জীবন অন্তত আমি চাই না। দুবাইতে ছিলাম সারে সাত বছর। ১৯৮৬ সনের ৭ নভেম্বর থেকে ২১ মার্চ ১৯৯৩ সন পর্যন্ত। তারপর দেশে ফিরে ২৬ মার্চ থেকে নকশা'র প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু। কারোর সাথে কোনো যোগযোগ নেই। যে কোনো কাজের প্রারম্ভেই কিন্তু ব্যস্ততার শেষ থাকে না। ভীষণ ব্যস্ততার মধ্যে দিন কাটাই। মূলত অর্থহীনতার কারণে আমাকে দিনরাত গায়ে খাটতে হয়। 

 

যেখানে হাত পাতার অভ্যাস তখন একদম নেই। পরেরটা আশা করাতো দূরের বিষয় চোখ তুলে দেখিও না এতোটা কঠোর নিয়ন্ত্রিত আত্মসম্মানবোধ। আমার চিন্তা একটাই কাজ করলে টাকা জমবে। তাই যত পারো কাজ করো। তাই কারোর সাথে যোগাযোগ নেই। সারাক্ষণ কাজের মধ্যে ডুবে থাকি। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব সবার থেকে দূরে সরে। যেহেতু মূল কারণ আমার পকেট ফাঁকা। গড়ের মাঠ। কাউকে এক কাপ চা খাওয়ানোর মতো টাকা-পয়সা নেই। সেখানে কাকে বলি আসো ভাই গল্প করি।

 

ছোটো বোন লাভলীর দৈনিক পঞ্চাশ টাকা হাত খরচ দিয়ে কতটা কুলানো যায়। তবে কাজের মধ্যে থেকে স্বপ্ন বুনি একদিন আমিও এমনি করে কারোর হাত খরচ দিবো। দুবাই ফেরত একজন মানুষের পঞ্চাশ টাকা হাত খরচ সে আবার ছোটো বোন থেকে এসব ঘটনা কি বিশ্বাস যোগ্য ? হ্যাঁ, কিছুই ছিলো না আমার। একমাত্র মাথা গুজার বাবার ঠাঁইটুকু ছাড়া। এত অভাব-অনটন কেনো ? এই না থাকার কী কারণ ? দুবাই থেকে সারে সাত বছর পর ফিরে এসে এমন শূন্যতা কিসের জন্য ? সে স্মৃতিচারণে এখন নাই বা গেলাম। প্রসঙ্গক্রমে কোনো এক সময় এসে গেলে দেখা যাবে। 

 

এদিকে আমাকে উপদেশ দেয়ার মানুষের অভাব দেখি না। অনেকেই খবর দেয়। পথে দেখা হলে সময় করে আসতে বলে। এর মধ্যে মস্তবড় ধনী একজন বড় ভাই আমাকে কয়েকবার বললেন- তুমি কী করছো, আসো আমার সাথে বসো, বসে বুদ্ধি পরামর্শ নাও। নতুবা তুমি এখানে কিছুই করতে পারবে না। আমি মনে মনে ভাবি, কপর্দকশুন্য একজনকে কী উপদেশ দিবেন। দিলে কিছু টাকা-পয়সা দিতে পারেন। যা আমার কাজে লাগবে। সে তো দিবেন না। আমি তাঁকে এড়িয়ে চলতে থাকি। কিছুদিন পর দেখি তিনি আমার সাথে ঠিক মতো কথা বলেন না। এমনকি সালাম দিলে তার উত্তর নিতেও আমি তাকে বিরক্তবোধ করতে দেখি!

 

একটি ঘটনা বলি। যা প্রাসঙ্গিক। দুবাই থেকে যখন আমি ফিরে আসি তখন আমার একজন ঘনিষ্ঠ বাল্য বন্ধু। পারিবারিকভাবে ধনী। নিজেও বড় ব্যবসায়ী। খবর পেয়ে সে আমার বাসায় দেখা করতে আসে। তার কাছে খুলে বলি আমার বর্তমান অবস্থার কথা। বন্ধুর কাছেইতো বলা যায়, তাই না। হ্যাঁ, এ ধারণা ভুল। সব জায়গায় এই ধারণা খাটে না। যে উচ্ছাস নিয়ে এসেছিলো ততোধিক নিরুৎসায়ীত হয়ে বন্ধু ফিরে যায়। এ ঘটনা আমাকে আমার অবস্থান নতুন করে ভাবতে শেখায়। আমি বুঝতে পারি সমান পর্যায়ে না আসতে পারলে সম্পর্ক টিকে না। অন্তত যাদের আত্ম-সম্মানবোধ প্রখর।

 

আমি একটা সময় গণশত্রুতে পরিণত হলাম। মুষ্টিমেয় হাতে গোণা কয়েকজন মানুষ ছাড়া। আরেকটা কথা যে কোনো বিষয় আমি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলতে পারি না। হয় খোলাখুলি বলি আর না হয় বলি না, চুপ থাকি। যখন খুব বেশি অসহ্য লাগে তখন দূরে সরে যাই।

 

আমার বিপরীতমুখী বৈশিষ্ট্যে স্বভাবত তারা আমাকে অপছন্দ করতে শুরু করেন। যা একটা সময় চরম আকার ধারণ করে। আমিও আরও দূরে সরে যাই। এরাও পিছু ছাড়ে না। এরা সর্বক্ষণ নানা প্রকার আমার দোষ খুঁজতে থাকে। তন্ন তন্ন করে খুঁজে ফিরে বিশ্লেষণ করে শেষে চায়ের টেবিলে, ড্রইং রুমে, অফিসে, রাস্তায় দাঁড়িয়ে তুমুল আলোচনার পর সকল বিবেক-বিবেচনায় মিলে মিশে সাব্যস্ত করে ফেলে আমার মতো খারাপ মানুষ এ দুনিয়াতে আর কেউ নাই। আমি এতটা খারাপ মানুষ যে এর মধ্যে অনেকেই বলে ফেলেছে সীমার এই অবস্থার জন্য আমি দায়ী! 

 

আমার এক আত্মীয় খবর পেয়ে এসে তিনি সীমাকে দেখে মোল্লা ভবনের দোতলা থেকে সিড়ি দিয়ে যখন নামছেন তখন আমি উপরে উঠছি। তাকে দেখে আমি থামি সহানুভূতি আশা করি। কিন্তু তিনি বেশ চড়া ভলিউমে সরাসরি বললেন-আশি লাখ টাকা দিয়া ফ্ল্যাট কিনছো, না জানাইয়া একটা বিয়া করছো। সীমারে দেখো না। তো এই রোগ বাজাইবো না তো কি করবো ? সীমা এ কথা আমাকে এখন নিজের মুখে বললো-সে বাঁচতে চায় না! আমিও বইল্লা আইছি- এখন মরো। কষ্ট পাও।

 

তিনি আমার আত্মীয় শুধু নন নারায়ণগঞ্জ বার একাডেমিতে আমার এক বছরের সহপাঠী ছিলেন! এমনিতে আমার জীবন দুর্বিষহ। তার উপর নতুন যন্ত্রণা চাপিয়ে দেয়া। কোথায় অবলম্বন পাবো, সান্ত¦না আশা করি, পাশে থাকার ভরসা রাখি। না, সে সব নয়। বরঞ্চ মস্ত বড় অপরাধীর কাতারে আমাকে সবাই ফেলে দেয়। এই অপরাধের শাস্তি একমাত্র কঠিন যন্ত্রণাকাতর মৃত্যুদ-। তারা অনেকেই পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে খোলাখুলি বলতে থাকে-সীমা রাগে, ক্ষোভে নাকি বাঁচতে চায় নি। তাই এই পথ বেছে নিয়েছে !

 

দুদিন পর যখন আমরা দুজন হাসপাতালে তখন আমাকে সীমা বলেছিলো। জামাল, আমি তোমার টানাটানি বুঝতাম। কতবার ভেবেছি তোমার হাতে টাকা এলেই বলবো, তুমি আমার চিকিৎসা করাও। ধৈর্য ধরে রোজার অপেক্ষায় থেকেছি। তখনকার আশা করেছি। কিন্তু খেয়াল করেছি পাওনাদারদের টাকাই ঠিকমতো শোধ হচ্ছে না। কারিগরদের উপযুক্ত বোনাস দিতে পারছো না। সেখানে তোমাকে কীভাবে বলি ?

 

আমার বুকটা হু হু করে। দুচোখে শ্রাবণধারা নামতে চায়। মনে মনে ভাবি এর মতো তুচ্ছ জীবন আর কী হতে পারে। আমি নিজেকে সংবরণ করে বলি- তুমি চিন্তা করো না। আমি দেখবো। আমার উপর ভরসা করো। সীমাকে দেখি বড় অসময়ে আমার উপর ভরসা করে। আমি তখন কেঁপে উঠি।

 

আসলে সীমা আমাকে কখনও বুঝতে পারে নি। তাঁকে বুঝতে দেয়া হয় নি। তার পিছনে অনেক কারণ আছে। সে কথায় আপাতত যাওয়া ঠিক হবে না। এমনিতেই আমার এই ধারাবাহিক লেখা বন্ধ করার চাপ আসছে নিজের ঘর থেকেই। বাস্তবতা হলো সর্বত্র সত্য বচনের পূজা করা হলেও তার প্রয়োগ ঠিক মতো হয় না। স্বয়ং পূজারীরর কাছেই তা দুর্বল। শুধু এইটুকু বিশ্বাস রাখলেই হতো অনেকে টাকা পয়সা দিয়ে যা পারে না। আমি আমার খুলে ধরার রীতিনীতি ও পৈতৃক ব্যবহার সূত্রে তা আদায় করে ফেলি। অবশ্য তা শিক্ষিত সমাজে হতে হবে। না হয় শূন্য হাতে চাল চুলাহীন একজন মানুষ দীর্ঘ সাতাশটি চলে কী করে ?

 

জন্মিলে মরিতে হইবে। জন্মাতে হয় মাথায় মৃত্যুদ- নিয়ে। কেউ আগে কেউ বা পরে। আমি শীঘ্র মরতে চাই না। আমার মাথার উপর বিশাল ঋণ। ছেলের ভবিষ্যত গঠনের দায়িত্ব। না, এখানে কেউ হাত দেয় না। কেউ জিজ্ঞাসা করে না ব্যাংকের পরবর্তী কিস্তি কি জোগার হয়েছে ? বাড়ি ভাড়া কি দিতে পারবে ? তোমার বিদ্যুৎ বিল জমে নি তো ? পাওনাদারদের টাকা নিয়মিত পরিশোধ হচ্ছে তো ? টানবাজার থেকে যে টাকা তোমার বন্ধুর মাধ্যমে কড়া সুদে নিয়েছিলো তার কি হাল ? আর সামিরের সেমিস্টারের ফি ? তার প্রতিদিনের যাতায়াত খরচ ? তার হোস্টেল ফি ? না, কেউ জিজ্ঞাসা করে না।


এখানে তারা যথেষ্ট সাবধান। সমস্যায় জড়াতে চায় না কোনোভাবেই। যদি জিজ্ঞাসা করে নিজের খসে। তবে তারা লাগাতার উপদেশ আর উপদেশ বিলায়। যেনো তাদের মতো জ্ঞানী লোক ইহধামে নেই। আহা, সত্যি এমন যদি হতো। তাদের মধ্যে হিংস্র প্রকৃতির দানবও কিছু রয়েছে। যারা ফাঁকে পেলে মুক্ষি মারতে চায়। পাছার কাপড় তোলে সেখানেও দু-একটা কষে মারবে এমন। কী লাভ তোদের অন্যকে নিয়ে এত ভাবার ? তোদের নিজেদের ভাবনা কী সব সমাধান করে ফেলেছিস ? তবে এবার কিতাব পুস্তক ঘাট, দেখ ধর্ম কী বলে। কীভাবে চলতে বলে। কোথায় কি করা উচিত, কি করা উচিত নয়। সেটা ভাবনা-চিন্তা করে বের কর। 

 

না, এই সহজ বিধানে যাবে না। আমাকে সবার আগে মরতে হবে মরারও আরও আগে! এটাই তাদের বিধান। কেনো ? কারণ তাদের মতো আমি নই বলে। আমি বহু আগেই বুঝে গেছি কেউ কারো নয়। তাই কেনো আমি অযথা সময় নষ্ট করবো ? আমারতো তাদের মতো বাপ-দাদার দেয়া অঢেল সয়-সম্পত্তি নেই। এখানে যারা সার্মথ্যবান তারা চায় না এ সংখ্যা আরও বাড়ুক। তারা চায় না, আমিও শূন্য থেকে হিরো বনে যাই। আমার যেনো কোনো ভাবেই ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল না হয়। এ এক মারাত্মক মানসিক ব্যাধি, নির্মম অসম হিংসা! 

 

এখানে আমার ছেলের ভবিষ্যৎ নষ্ট হোক, তাতে কী ? ছেলেটাতো তাদের ঘরের নয়। আর সবাইকে ছেলে সম ভাবলে তাদের মিল কারখানার ফ্যাক্টরির শ্রমিকের প্রয়োজন মিটবে কী করে ? তাদেরতো অনেক অনেক অদক্ষ শ্রমিকের প্রয়োজন। আমার ছেলে যদি কখনও তাদের কাছে কাজের জন্য যায়, আমি জানি তারা বিগলিত হয়ে কাজ দিবে এবং সবাইকে বলবে দেখ, জামালের ছেলে আমার কারখানায় ! এ বলা যে কত সুখের হবে তাদের কাছে, সে আমি জানি। এ আড্ডা চলবে বেশ কিছুদিন। তাদের অযথা আড্ডার খোরাক চাই। এ এক বিকৃত জটিল মানসিকতার পরিবেশ। 

 

একটি উজ্জ্বল সম্ভাবনাকে শুরু থেকেই দেখেছি অনেকেই মারতে চায়। বিশেষ করে যাদের খাওয়া পরার চিন্তা তাদের বাপ-দাদারা চিরস্থায়ী বন্দোবস্তো করে গেছেন। আমাকে তারা মারতে চায়। কেনো, আমিতো মরতে চাই না ছেলেকে বহু ঋণের মাঝে রেখে। জীবনের ভলো-মন্দ, সুখ-দুঃখ বোঝার আগেই তাকে ঋণের বোঝা ঘাড়ে দিয়ে! কিংবা তার বিয়ে সাদী না দেখে। নাতিপুতির মুখ না দেখে। অসম্ভব। সবার আগে আমি নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই। তবে ঈশ্বর সর্ব্বোচ্চ জ্ঞানী। তাঁর ভাগ্য লিখন কে খণ্ডাতে পারে। তিনি কিসে কি রেখেছেন, তিনিই একমাত্র জানেন। মানুষের কি সাধ্যি তার ভেদ উদ্ধার করে।

 

গাড়ি পৌঁছে যায় আনোয়ারায়। সব জায়গায় আমি দ্রুত পরিচিতি লাভ করি। মিশে যেতে পারি। তাদের সহানুভূতি আদায় করতে পারি। আমি সিরিয়ালের আগে ভাগে ব্যবস্থা করে ফেলি সীমার বায়াপসির। আমি যতটা জানি সীমার আক্রান্তস্থল থেকে সামান্য মাংস কেটে নিবে। তার আগে লোকাল এনেস্থেতেসিয়া করে নিবে। কাজটি সহজ নয়। কষ্টকর বটে। সীমাকে যখন বায়াপসির পর বের করে নিয়ে আসে আমি কাছেই দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আমি তখন অবিরাম আল্লাহ্ কে ডাকছি। আল্লাহ্ এ কষ্টের লাঘব করো। আশ্চর্য, সীমা কিন্তু কোনো কষ্টই বোধ করছে না! আমি শুকরিয়া আদায় করি মহান আল্লাহর নিকট।

 

মানুষের যখন চিকিৎসার ব্যবস্থাদি চলতে থাকে তখন সে অনেক বড় সান্তনা খোঁজে পায়। যখন দেখে, জানতে পারে তাকে নিয়ে সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ছে, তখন তাঁর সাহস বাড়ে। মৃত্যু অনিবার্য জেনেও অন্যরকম সুখ তাঁর মধ্যে বিরাজ করে। আমি খুব কাছে থেকে দেখেছি, এ সময়ে কতটুকু কখন তাঁর মানসিক বিপর্যয় ঘটে। কখন কতটুকু আবার আশার সঞ্চার হয়।

 

আমি লিখতে চাই। এ শুধু আমাদের ঘটনা নয়। এমন হাজারো ঘটনা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে রয়েছে। যা অনেকে জানে না। তাই লিখবো। অবশ্যই পাঠকের কাজে আসবে সামান্য হলেও। ভালোবাসা জাগবে মানুষের প্রতি। হিংসা বিভেদ দূর হবে কিছুটা হলেও। (চলবে...)

 


এটিএম জামাল
সোনারগাঁ ভবন, মিশনপাড়া, নারায়ণগঞ্জ
১৯ জুন, ২০১৯