মঙ্গলবার   ১৬ জুলাই ২০১৯   শ্রাবণ ১ ১৪২৬   ১৩ জ্বিলকদ ১৪৪০

উত্তর দক্ষিণ

প্রকাশিত: ১৭ জুন ২০১৯  

পর্ব : দুই

২১ মার্চ, ১৯৯৩ দুবাইয়ের পাট সম্পূর্ণ চুকিয়ে দেশে এসে ব্যবসা শুরু করি। নারায়ণগঞ্জ শহরে প্রথম বুটিক হাউজ আমার হাত দিয়ে শুরু হয়। ভালোইতো করছিলাম। এই ব্যবসার সকল অভিজ্ঞতাই আমার অর্জন করা ছিলো, কোনো রকম দুই নম্বরি ছাড়া। শুধু অভিজ্ঞতায় কি হয় ? মাথার উপর অবিরাম নানা দিকের চাপ থাকলে কি এগোনো যায় ? 

 

তারমধ্যে অন্যতম চাপ ছিলো বাড়িওয়ালাদের। ভাড়া বাড়িতে থাকাটাই এমনিতে আমার আতঙ্কের। তার মধ্যে একজন শুরু থেকে তিনি প্রায় আমার যেখানে ব্যবসা সেই দালানটি ভেঙে ফেলার কথা বলতেন। একবার তিনি এমন সিরিয়াসলি বললেন যে আমি ভয় পেয়ে গেলাম। একটা ব্যবস্থা করার জন্য গেলাম সমবায় মার্কেটে বন্ধু লিটনের কাছে। যে বন্ধুটি আমাদের বুটিক হাউজটির নাম 'নকশা' দিয়েছে। লিটনের সহায়তায় সমবায় মার্কেটের তিনতলায় দ্রুত একটি ব্যবস্থা হয়ে গেলো। আমাদেরই আরেক বাল্য বন্ধুর সাড়ে সাত'শ স্কয়ার ফুটের একটি বড় দোকান ভাড়া নিয়ে নিলাম।

 

ভাগ্য যদি খারাপ থাকে চৌথা আসমানে গেলেও কি রেহাই পাওয়া যায় ? একেবারে এমন পুকুর দেখে পালিয়েছিলাম এখন সাগরে পড়েছি। একেতো দোকানটি জমলো না বিশেষ একটি কারণে। তার উপর আমার ভালো লোকগুলোও চলে গেলো। যাদের মধ্যে একজনের এখন মস্তবড় ব্যবসা। বেশ প্রতিপত্তি। এদিকে বছর আড়াইয়ের মধ্যে এই সমবায় মার্কেটের বাড়িওয়ালাও চাপ সৃষ্টি করে অস্বাভাবিক ভাড়া বাড়ানোর দাবি নিয়ে। অন্যথায় বিশাল অংকের টাকায় ৭৫০ স্কয়ার ফুটের বর্তমান দোকানটি ক্রয় করে নিতে।

 

অন্যদিকে প্রথম বাড়িওয়ালা তিনি এই আড়াই বছরে মধ্যে বাড়ি ভাঙার পুনরায় কোনো আওয়াজ দিলেন না! আমার মনে হলো তিনি ভাঙবেন না। বর্তমান পরিস্থিতিতে বন্ধুর দোকানটি ছেড়ে দেয়াই সমুচিন মনে করলাম। এবং আমি ছেড়ে দিলাম সমবায় মার্কেটের দোকানটি খুবই আধুনিক একটি ডেকোরেশন করা অবস্থায়। ওঠতি সুসময়ে প্রথম বাড়িওয়ালার ওই নোটিশ আমাকে বহু লক্ষ টাকার লোকসানে ফেলে দেয়। সোজা কথা আমার মাজা ভেঙে দেয়। 

 

এখান থেকে শুরু হয় আমার পশ্চাৎ যাত্রা। তার সাথে যুক্ত হয় অন্য আরেকটি তীব্র মানসিক পীড়াসহ অর্থনৈতিক চাপের বিষয়। এই চাপ আর থামাতে পারলাম না কোনোদিন। ফলে লোকসানের পর লোকসান। প্রডিউসারদের সহযোগিতা, সাপ্লায়ারদের সাড়া, ব্যাংক সব মিলিয়ে ঝুঁকির মধ্যেও অনেকদূর এগিয়ে ছিলাম। এইতো বছর খানেক আগে নকশা’র অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা অংশীদার জিনা যখন চলে গেলো। আরেক জন অন্যতম অংশীদার সীমা অসুস্থ হয়ে ঘরে ; তখন বাড়িওয়ালারা হিসেব কষে ফেললেন আমরা আর এখন থেকে নিয়মিত ভাড়া দিতে পারবো না। তারা নিজেরা থাকবেন বলে লোকজন ধরে আমাকে উঠিয়ে দিলেন। 

 

এর মধ্যে বিগত দীর্ঘ সাতাশ বছরে যে ভবনটি ভাঙার কথা সেটা না তিনি ভাঙলেন না তিনি নিজে উঠলেন। বরঞ্চ ওখানে আরও কয়েকটি দোকান বাড়িয়ে ভাড়া দিয়ে দিলেন ! আমার ভাগ্যে যা ঘটার তা ঘটে গেলো একের পর এক গুচ্ছ বোমার মতো। প্রথমে একটি পড়তে দেখা যায় তার পর সেখান থেকে আরও ছড়তে থাকে। এদেশে ভাড়াটিয়াদের অবস্থা তেমন যেমন পুকুরে নিমজ্জিত ব্যাঙের মতন ওই পুকুর পাড়ে খেলাচ্ছলে প্রস্তর নিয়ে দাঁড়ানো বাড়িওয়ালারা!

 

উত্তর-দক্ষিণ, পূর্ব-পশ্চিম উপর নীচের সর্বদিকের চাপে ধীরে ধীরে বর্তমানে বিশাল দেনায়-ঋণে ডুবে যাওয়া মানুষ আমি। তাই যেখানে যা পাই তাই আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করি বেঁচে থাকার অবলম্বন করে। না, আমি কখনও বাঁচতে চাই নি একান্ত নিজের জন্য। অনেকগুলো দায়িত্ব ছিলো আমার মস্তিষ্কে। আমার কাঁধে। যা আমি কখনও ঠিক মতো পালন করতে পারি নি। আবার যা ফেলে দিতেও পারি না। এই যে এমনি নির্মম বহুটানার যন্ত্রণার মধ্যে জীবন আমার বয়ে যায় তার ফিরিস্তি দিতে গেলে কয়েকটি বিশাল আঁকাড়ের উপন্যাস তৈরি করা যাবে।

 

শেষের দিকে শহরে এদিক সেদিক ছিটিয়ে থাকা ব্যবসায় ব্যবহৃত দোকান-পাট, বাসা-বাড়ির ভাড়াগুলো অন্যান্য খরচপত্রাদি নিয়মিত পরিশোধ করতে পারছিলাম না। যে সব জায়গায় অগ্রিম দেয়া আছে তার থেকে বাড়িওয়ালার কেটে নিচ্ছে। তার উপরেও বার বার চাপ দিতে ভুলে না। এই চাপাচাপিতে কী যে আনন্দ তাদের ! এদিকে আমার জীবন যায় যায়। তাদের কাছে মনে হয় অগ্রিমের টাকা টাকা না। সেই অংক যত তাড়াতাড়ি যেভাবেই হোক পুনরায় পরিপূর্ণ করে ফেলো নতুবা বাড়িওয়ালাদের ঘুম হারাম হয়ে যায়! 

 

আমি এই মসিবতের কোনো রকম কূল কিনারা করতে পারছিলাম না। ভীষণ কষ্ট নিয়ে তাই ভাবতে বাধ্য হই কোনটা ছাড়ি কোনটা ধরে রাখি। এই ছাড়ার চিন্তা করা কিন্তু সহজ কাজ নয়। তারও কাজ থাকে অনেক। এদিকে অতি জরুরি হয়ে পড়ছিলো হয় খরচ কমাও নয় আয় বাড়াও। এই যে মৃত্যুসম যন্ত্রণা আমি ভোগ করে চলেছি বছরের পর বছর তা বোঝার মতো মাত্র কয়েকজন ছিলো। এর মধ্যে একজন চলে যায় মাত্র দু’দিনের নোটিশে। সে আমার প্রাণপ্রিয় বন্ধু কাজী মনির উদ্দিন কাজল। যাঁর কাছে আমি যে কোনো বিপদে সবার আগে সব রকম সাহায্য পেতাম। লোকবল, বুদ্ধি কিংবা অর্থনৈতিক। 

 

এরই মধ্যে আসে সীমা তোমার অসুখের খবর। কঠিন দুঃসংবাদ। যে সংবাদের আমার অস্থি-মজ্জা দেহ-মন সব ক্ষত বিক্ষত হয়ে যায়। আমি আর আমার মধ্যে থাকতে পারি না। কোথাও কোনো শান্তি পাই না। না ঘুমাতে না খেতে না পরতে। হাঁটা চলা ফেরাও সম্বিত আছে বলে মনে হয় না। আমি যেনো শীতল একটি মাংসপিণ্ডে পরিণত হয়েছি। যার রক্ত চলাচল বন্ধ। উষ্ণতা উত্তাপ আছে বলে ভাবা যায় না।

 

এই অসুখ যেনো তেনো অসুখ নয়। ক্যান্সার। তা আবার এডভান্সড। পত্র-পত্রিকা বিভিন্ন মিডিয়া থেকে পড়ে-শুনে-দেখে যেটুকু জানি বুঝি এই রোগের কতটুকু ভয়াবহতা। জুনের দুই তারিখ দুই হাজার সতের। ফেরদৌস ভাইকে দেখিয়ে নিয়ে এসে বাসায় তোমার ঘরে বিশ্রাম নেয়ার জন্য বিছানায় বসালাম। এরপর আমি ঘোরের মধ্যে নীচে নেমে আসি। আমি বুঝতে পারি আমার এখন যে কোনোভাবে প্রবল বেগের কান্নার প্রয়োজন। তখন ফিলোসফিয়া স্কুলের গলিতে আকষ্মিক দুর্ভাবনায় হতভম্বের মতো দিদার গাড়িতে বসে ছিলো। আমিও গাড়ির ভিতর গিয়ে বসলাম। অনেকক্ষণ অঝোরে কাঁদলাম। আর বললাম বালা মসিবতের মধ্যে আল্লাহ্ আমাকেই কেনো বেছে নেয় ? একটা সময় গাড়ি থেকে নেমে চলে গেলাম শো-রুমে। মাত্র কিছুদিন পূর্বে কোনো এক প্রসঙ্গে এই ব্যবসা এই আউটলেট ছাড়ার কথা বলে সীমা জানিয়ে ছিলো- যদি ছাড়তে হয় সেদিন আমি আর বাঁচবো না।

 

দিদারের গাড়ি থেকে নেমে ওখানে গিয়ে দেখি জিনাও ভাবলেশহীন নিথর নির্বাক নিশ্চল চোখদুটি জলে পরিপূর্ণ মনে হলো সামান্য ধাক্কায় অঝোরে শ্রাবণধারা নামবে। জিনার আগেই আমি আবার কান্নায় ভেঙে পড়লাম। কয়েক সেকেন্ড পর জিনাও কাঁদতে শুরু করে। শোরুমে তখন মেয়েরা আমার দিকে তাকিয়ে আছে, ওরা ভাবতেই পারছে না এই রুক্ষ মানুষটি কীভাবে এমন কাঁদতে পারে! পরে জিনা গিয়ে বলেছে সীমাকে-আমার কান্নার কথা। 

 

রাতে সীমা আমাকে খুশি মুখে প্রশ্ন করে-জামাল, তুমি নাকি আমার জন্য কেঁদেছো ? আবার আমার ভিতরে কান্নার চাপ জেগে ওঠে। আমি সীমার সামনে কোনো ভাবেই কাঁদি না। হাসি, হাসার অভিনয়ের চেষ্টা করি। সীমাকে আমিও হাসতে হাসতে বলি-কোথায় কাঁদলাম! সাথে সাথে মোবাইলের চার্জার আনার কথা বলে আমি তাড়াতাড়ি আমার পড়ার রুমে যাই। সেখানে গিয়ে দেখি অন্ধকারে সামির কাঁদছে। পাগলের মতো কাঁদছে। আর বলছে- বাবা, মার জন্য কিছু করো। মা'কে ছাড়া আমি বাঁচবো না।

 

ডা. অনুপ কুমার সাহা আমার বাল্য বন্ধু জপনের একমাত্র ছোট বোন মিঠুর হাসবেন্ড। আমাদের সবার সাথে অনুপের ভালো সম্পর্ক। এক সময় বহু অবসর ছুটি কেটেছে একসাথে। তাঁকে আমার বিশেষ করে এই জন্য ভালো লাগে তিনি স্বাচিপ-এর জাদরেল নেতা হয়েও মূলত খুব নরম মনের মানুষ। তাঁর আরও একটি বড় গুণ কোথাও পরিবেশ অনুকূলে থাকলে তিনি গলা ছেড়ে গান ধরেন। তিনি সীমার অসুস্থ্যতার কথা জানলেন দিদারের মাধ্যমে। সেদিনই অনুপ বিএসএমএমইউ-তে এক ডক্টরের কাছে সীমাকে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিলেন।

 

গাড়িতে যেতে যেতে বিষয়টি জানালাম আমার বন্ধু যুগান্তরের উপ-সম্পাদক এহসানুল হক বাবুকে। বাবু সাথে সাথে বললো- তুই ডা.মামুনকে বল। ডা.মামুন আমাদের খুব কাছের বন্ধু প্রয়াত খাজা রহমতের শ্যালক এবং বিএসএমএমইউ-তে তাঁর ভালো পজিশন। সাথে আরেকটি পরিচয় উজ্জ্বল তিনি বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। আরও গুরুত্ব বাড়বে বলে বিষয়টি আমি সাথে সাথে ফোনে রহমতকে জানাই। রহমত তখন একটি চ্যানলে আমন্ত্রিত অতিথি হয়ে ক্যামেরার সামনে বসবে হকি খেলা বিষয়ক টকশোতে। রহমত ঠিক ওই সময়েই ডা. মামুনকে জানায় এবং ডা.মামুনের মোবাইল নম্বর এসএমএস করে পাঠায়।

 

ডা. মামুন সাথে সাথে সীমার ডক্টরকে ফোন করে। সীমার ডক্টর এই প্রান্ত থেকে ফোনে বলে-স্যার, এমন বড় বড় বিগশটের রোগীর আত্মীয়-স্বজন হয়েও এমন পর্যায়ে যায় কী করে ? আমার প্রচণ্ড রাগ হয় ডক্টরের প্রতি তিনি কী করে রোগীর সামনেই এমন মন্তব্য করে ফেললেন! যাক তিনি একটি ভালো কাজ করলেন তা হলো রোগীর যে সকল টেস্ট এই মুহূর্তে প্রয়োজন তা সব লিখে দিলেন। বলে দিলেন কোথায় কোথায় যেতে হবে। 

 

প্রথমে গেলাম আনোয়ারায়। রাইফেল স্কয়ারের পথে। বায়াপসির জন্য ওখানে বেশ টাকা লাগবে। আমার হাতে এত টাকা নেই। আমি ফোন দিলাম নকশায়। বিকাশ করো। সেই টাকা ওঠাতে রিক্সা না পেয়ে দৌড়ে এলাম সাইন্স ল্যাবরোটরির মোড়। টাকা উঠিয়ে আবার দৌড়েই ফিরে এলাম আনোয়ারায়। বিল জমা দিয়ে এপয়েন্টম্যান্ট সময় সন্ধ্যায় জেনে নিয়ে চলে গেলাম গ্রীন লাইফ হাসপাতালে। বাকি সব টেস্ট করানোর জন্য। এক ফাঁকে দুপুরের ভাত খেয়ে নিলাম হাসপাতালের কেন্টিনেই। একের পর এক সব কিছুই ঠিকমতো হচ্ছে। আমি শুধু চেয়ে দেখি সীমাকে। তাঁর খাওয়া কতটুকু হচ্ছে। সে কী ভাবার চেষ্টা করছে। সে ঠিক মতো হাঁটতে পারছে কি না। তাঁর দুর্বল লাগছে কি না। সেই যে সকাল থেকে শুরু হয়েছে তার শরীরের উপর দিয়ে মেশিন-পত্রের চাপ আর শিরায় সূঁচ ফোটানোর প্রতিযোগিতা।

 

ফুলের মতো কোমল তোমার দেহ। তার উপর দিয়ে এই কষ্ট তুমি সহ্য করতে পারলেও আমার হয় না। মনে আছে সীমা- সেই যে আমি প্রতিদিন তোমাকে ফুল দিতাম দিনের আলোয় ফোটার আগে। আইন কলেজের বাসায়। তুমি ভোরের আলোয় দোতলার পুব দিকের বারান্দায় সন্তপর্ণে গিয়ে সেই ফুল বুকের মাঝে রাখতে। প্রাণ-মন ভরে হয়তো তার গন্ধ নিতে। আমি নীচ থেকে দেখতাম হালকা লেমন রংয়ের ম্যাক্সি পরিহিত তোমাকে। কী পবিত্র লাগতো তোমার মুখ! চোখের কাজল একটু ছড়িয়েছে। মাথার সাদা টিপটি ঠিক জায়গায় নেই। তবুও তুমি অনন্য। তুমি তখন বেশ স্লিম ছিলে। খুব দৌঁড়াতে তুমি। আইন কলেজ থেকে স্যাটেলম্যান্ট অফিস। কিংবা হোসিয়ারি সমিতির মাঠে। খোলা চুল উড়তো। আমি দূর হয়ে অবাক হয়ে শুধু চেয়ে থেকেছি।

 

জানো সীমা তুমি কখন ঘুম থেকে উঠবে সে আমার জানা ছিলো না। আমি কিন্তু উঠে যেতাম অন্ধকার থাকতে। তখনতো আর হাতে টাকা-পয়সা থাকতো না। থাকলেও খুব সামান্য। তাতে কি আর প্রতিদিন ফুল কেনা যায় ? আমি দিনের বেলায় আশে পাশের বিভিন্ন বাড়ির বাগানগুলো খেয়াল করি। আর হাতের কাছে আছে রামকৃষ্ণ মিশন। কাউকে না বলে আমি চুপি চুপি গাছ থেকে ফুল ছিড়ে নিয়ে আসতাম রাতের গাঢ় অন্ধকার থাকতেই। কাজটা কিন্তু সহজ ছিলো না তার জন্য আমাকে প্রায়ই দেয়াল টপকাতে হতো। 

 

একবার কী হলো-আমারই বন্ধুর বাসায় হানা দিলাম। তাদের অযত্নে পড়ে থাকা বাগান থেকে কয়েকটা ফুল ছিড়েছি। বন্ধুর বাসা বলে অনেকটা নির্ভয়েই ছিলাম। হঠাৎ পিছনে থেকে কে যেনো এসে শক্ত আটুনিতে ঝাঁপটে ধরলো। আমার নিশ্বাস বন্ধ হতে থাকে ভয়ে আর শক্ত-সার্মথ্য পেটোলা মোটা শরীরের চাপে। কি আর তেমন নিয়েছিলাম কয়েকটা কাঁঠালচাপা আর লিলি ফুলইতো ! 

 

কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আমার বিমূঢ়তা কেটে যায়। আমি বুঝতে পারি আমার পিছনে কে ধরে আছেন। আমি তাঁকে বলি- কাকা, আমি জামাল। তাঁর বুঝতে সময় লাগে যখন চিন্তে পারেন সাথে সাথে ছেড়ে দিয়ে বলেন- মিলুর ভাতিজা, জামাল ? আমাদের বড় কাকা মিলু তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তখনই তিনি বেশ বয়স্ক মানুষ। তবে বাঁজখাই গলা। শুধু মহল্লায়ই না, আমার কাকা আর তিনি তাঁরা দু’জনে মিলে শহরের অনেকটা নেতৃত্ব দেন। তাঁদের যে কোনো একজনকে কখনও মহল্লার গলির এ মাথায় দেখা গেলে ওই গলির শেষ মাথা পর্যন্ত পুরোটা খালি হয়ে যেতো। এমনই ছিলেন তাঁদের নেতৃত্ব এবং শাসন।

 

তখন ধীরে ধীরে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। আমাকে তিনি বলেন যা, এই ফুল আবেদার মেয়েকে দিবিতো, দিয়ে আয়। আর যেদিক দিয়ে যেভাবে এসেছিস ভিতরে সেভাবেই বাহিরে যাবি। আমি দেখি তোর কৌশল। আর ফুল দিয়ে আমার সাথে দেখা করে যাবি। আমি ছাড়া পেয়ে তড়িৎ দেয়াল টপকে ফুল হাতে নিয়ে দে ছুট। ভালোবাসার ক্ষেত্রে কে কাকে ভয় পেয়েছে ? এখানে আমিও কম সাহসী নই।

 

এই ঘটনাটি তোমাকে বলি নি কখনও। ফুল যে প্রতিদিন চুরি করে এনে দেই সে বিষয়টি চেয়েছিলাম তোমার কাছে অজানাই থাকুক। আর যদি তুমি জেনে যাও-তবে কতটা লজ্জার, তাই না। আমার টাকা-পয়সার দীনতার কথা তুমি জেনে যাবে! তখন বলবে এভাবে আমার ফুল চাই না। যা আমার খুব খারাপ লাগবে। কতদিন আমি এভাবে ফুল দিয়েছি মনে নেই। 

 

সেইদিন সকালেই যখন দোতলার পূব দিকের পাটাতনের উপর কাঁঠাল চাপা আর সাদা লিলি ফুল যখন মাত্র রেখেছি তখন পিছনে কে যেনো ডাকলো। ফিরে দেখি আমার খুব ভালো একজন বন্ধু টগা। দু’জনে একই মহল্লায় থাকি। আসলে নাম টগর তাকে আমরা ডাকি টগা। এ শহর ভরে তাকে এই নামে সবাই চিনে। আমার কাছে সব সময় তার টগা নামটাই বেশ আন্তরিক মনে হয়। যাঁর নেতৃত্ব দেয়ার গুণ এবং সরলতায় ভরপুর টগা আমাকে বলে- দোস্ত, চা খাওয়া। ভাঙা দেয়াল থেকে নেমে টগাকে চা খাওয়াতে নিয়ে গেলাম নোয়াখালির ল্যাংরার দোকানে। 


ল্যাংড়ার দোকানে সদ্য ফোটানো চা খেতে খেতে হাসি মুখে টগা বললো-হানিফ ভাই যে ধরলো তোকে এমনি ছেড়ে দিলো ? আমি অবাক হয়ে টগাকে জিজ্ঞাসা করি-তুই দেখলি কী করে? সে বলে আমি প্রায় প্রতিদিন তোকে দেখি। তখন মিশনপাড়ার মোড়ে ছোটোখাটো একটি মাঠের মতো জায়গা ছিলো। হানিফ কাকার বাড়ি ঘেষে। আমরা এখানে বহু খেলেছি। কিন্তু স্থানীয় কাঠ ব্যবসায়ীরা তাদের কাঠের গুড়িগুলো এখানে একটার উপর একটা এলোমেলো অবস্থায় প্রায় ফেলে রাখতেন। আর কী করা খেলা ছেড়ে তখন গুড়ির মধ্যে বসে আমরা আড্ডা মেরেছি। একা হলে ইজি চেয়োরের মতো করে আধশোয়া হয়ে আরাম করেছি। সবাই জানে জগতে টাকার উপর আর কিছু নেই। না স্বাস্থ্য, না বিনোদন! কাঠ ব্যবসায়ীরা এটা আরও ভালো জানে।

 

টগা আবার জানতে চায়, দেখি তার অনেক কৌতূহল। আমার হাতে ধরে বলে-হানিফ ভাই তোরে কী বললো রে! হানিফ কাকার একটি কমন শাস্তি ছিলো সবার সামনে ওঠবস করানো। পাছার মধ্যে বেত দিয়ে মারা। টগার খেয়াল সেদিকেই। আমি সবিস্তারে তাকে খুলে বললাম। টগা অবাক হয়ে থাকলো কিছুক্ষণ। এরপর ভয়ে ভয়ে প্রশ্ন করে- তুই এখন যাবি তাঁর কাছে ? আমি বললাম-না যেয়ে উপায় কী ? তিনিতো পরে বাসায় গিয়ে উঠবেন। তখন আব্বা তাঁর বিশাল বিশাল হাতের সুখ ও যশ দুটোই ঝালিয়ে নিবেন আমার পিঠে। টগা আবার জিজ্ঞাসা করে তোর ভয় লাগছে না। আমি বললাম না, প্রেম করেছি সত্য। তবে ভয় কেনো থাকবে ? টগা বলে লাইলি মজনু, সিড়ি ফরহাদকে ফেল মারছিস দেখি!

 

চায়ের দোকান থেকে বের হয়ে আমি হানিফ কাকার বাসার দিকে যাই। যেতে যেতে দেখি তুমি তখনও ফুলগুলো নাও নি। তার আগেই আমাকে চুরির দায়ে বাগান মালিকের বিচারের মুখোমুখি হতে হচ্ছে! আজকে একটু তাড়াতাড়ি নিয়ে গেলে কী হতো ? একবার অন্তত ভাবতে চেয়েছিলাম তুমি ফুলগুলো নিয়ে বুক ভরে তার সুঘ্রাণ নিচ্ছো। তাতে আমি যে কোনো শাস্তি আনন্দে গ্রহণ করতে পারতাম। আমি যত হানিফ কবীরের বাসায় দিকে এগোচ্ছি টগা তত দ্রুত পিছিয়ে যাচ্ছে। দূর থেকে টগা অবশ্য সাহস দিতে ভুলে না, ইশারায় বোঝায় সে আমার কাছাকাছিই আছে।

 

হানিফ কাকা রাস্তার পাশে মস্তবড় ড্রইং রুমের দরজা খোলাই রেখেছেন। তিনি বসে আছেন উত্তরে দিকে বসানো কাঠের সোফায়। তিনি নিশ্চিত জানতেন- আমি তাঁর কথার অমান্য করবো না। আমি দক্ষিণ দিকের মূল দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সালাম দিয়ে ভিতরে ঢোকার অনুমতি চাই। তিনি বললেন ভিতরে এসো এবং সোফায় বসো। ইশারায় তাঁর মুখোমুখি সোফায় বসতে বললেন। আশ্চর্য! তিনি এখন সেই সময়ের মতো তুই করে বলছেন না। যা তিনি কখনও আমাকে অন্তত বলতে দেখিনি।

 

একটু পর আব্দুল্লাহকে ডাকলেন। চা দেয়ার জন্য। একটু বলে রাখি, আব্দুল্লাহ এখানে কাজ করলেও সে ছিলো আমার বন্ধু। আমরা একসাথে নামাজ আদায় করেছি বহুদিন মিশনপাড়ার জামে মসজিদে পাশাপাশি। আমার বাসা থেকে বের হতে একটু দেরী হলে আব্দুল্লাহ মসজিদে ঢুকতো না। কিংবা আব্দুল্লাহর দেরী হলে আমি দাঁড়িয়ে থেকেছি। তখন কিন্তু মিশনপাড়ার মোড়টি অনেক খোলামেলা ছিলো। অনেকগুলো বাড়ির প্রধান ফটক নজরে আসতো। সেই হাসিখুশি প্রাণ খোলা আব্দুল্লাহর মুখ এখন দেখি খসখসে ভয়ে শুকিয়ে আছে।

 

জানো সীমা, সবাই ভয় পেলেও আমি কিন্তু ভয় পাই নি। আমি জানি বাহিরে অস্থির হয়ে কি জানি কি হয় সেই কারণে টগা পায়চারী করছে। এদিকে আব্দুল্লাহর ভয়ে ত্রাহি অবস্থা। আর ওই সময়ে গরম চায়ের কাপে চুবিয়ে নিশ্চিন্তে আমি টোস্ট বিস্কুট খাই। কী হবে ? কী করবেন হানিফ কাকা ? হয়তো মারবেন। না হয় ওঠবস করাবেন। পাছায় কষে বেত মারবেন। কম করেও হলেও বাঁজখাই গলায় বকবেন। যা হোক তোমার ভালোবাসা কাছে এতো আমার নস্যি মাত্র। ঘটনার একটু পর নাক ঝেরে ফেলে দিলেই হবে।

 

আমি নির্বিঘ্নে নির্ভয়ে চা খেয়ে যাই। না তাকিয়েই বুঝতে পারি হানিফ কাকা আমাকে পর্যবেক্ষণ করছেন। একটু পর হয়তো শুরু হবে তাঁর বাঁজখাই গলায় প্রাথমিক শাসন প্রক্রিয়া। তখন টগা হয়তো আরও দূরে সরে যাবে। কিংবা আব্দুল্লাহ আরও অসহায়বোধ করবে। জানো সীমা, আমি কিন্তু সামান্যতম নার্ভাস ছিলাম না। মনে মনে বলি ভালোবাসি মিথ্যেতো নয়, তারতো কিছুটা পাগলামি থাকবেই। আর যারা গভীরভাবে হৃদয়ের সমস্তটা নিংড়িয়ে ভালোবাসতে জানে না, তাদের কথা ভিন্ন।

 

হানিফ কাকা আমার চা খাওয়া পর্যন্ত কঠিন ধৈর্য নিয়ে অপেক্ষা করলেন। তারপর অবাক করে কোমল স্বরে জিজ্ঞাসা করলেন- তুমি এখন কিসে পড়ো ? তোমার রেজাল্ট কিন্তু ভালো হওয়া চাই। তোমাকে আমি সারাক্ষণ পড়তে দেখি। কখনও কাঠের গুড়িতে বসে, কখনও আইন কলেজের জানালায়। এমনকি তোমাকে হাঁটতে হাঁটতে কখনও পড়তে দেখিছি। ভালো রেজাল্ট কিন্তু আমাকে দেখাতে হবে। এখন বাসায় যাও। মেজদাকে আমার সালাম দিও। বুবু বলো- বিকেলে আমি চা খেতে আসবো। আম্মাকে তাঁর দেবর-ননদেরা ভাবি নয় বুবু ডাকেন।

 

আমি মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি। ছোটো-বড় সবার। যা আমার সৌভাগ্য। বাকি কিছু মানুষ আমাকে সহ্য করতে পারতো না। তারা আমাদের জীবনে এতটা বিষ ঢেলে দেয় যে আমরা ধ্বংসের কাছাকাছি পৌঁছে যাই। এমনকি মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হয়। (চলবে...)


এটিএম জামাল
সোনারগাঁ ভবন, মিশনপাড়া, নারায়ণগঞ্জ
১৫ জুন, ২০১৯