মঙ্গলবার   ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯   আশ্বিন ২ ১৪২৬   ১৭ মুহররম ১৪৪১

উত্তর দক্ষিণ

প্রকাশিত: ১৩ জুন ২০১৯  

পর্ব : এক

চৈতী যখন অঘটনটুকু জেনে এলো আমি বিশ্বাস করি নি। পরদিন আমি যখন ডক্টরের কাছে নিয়ে গেলাম তখনও মনে বড় আশা ছিলো। ক্লিনিকের ওয়েটিং রুমে বসে আল্লাহকে ডাকছি, তুমি রক্ষা করো, তুমি রক্ষা করো সীমাকে। বেশ কিছুক্ষণ সীমাকে পর্যবেক্ষণ করার পর ডক্টর নিজে বের হয়ে এসে ওয়েটিং রুম থেকে আমাকে নিয়ে তার অপারেশন থিয়েটারের কাছাকাছি বসালেন। তুমি তখন তার পাশের আরেকটি রুমে আশায় বুক বেঁধে আছো। এখানে কোথাও কোনো শব্দ পাই না। আলোগুলো কেমন যেনো তীর্যক। চোখ ঝলসায়। একটু পর এখানে একজন মুমূর্ষু রোগীর অপারেশন হবে। দেখছি সাদা হালকা ব্লু এপ্রোন পড়া কয়েকজন সেবক সেবিকার তার প্রস্তুতি নিতে। বিভিন্ন ঔষধ-পত্র তারা কঠিন নিরবতায় কাগজ দেখে দেখে মিলাচ্ছে। হয়তো সিনিয়র একজন ডক্টর এখানে থাকায় তাদের এই নিরব কার্যক্রমটুকু একটু বেশিই হতে পারে।

 

সীমার ডক্টর একেএম শফিউল আলম (সিনিয়র কনসালটেন্ড, সার্জারী) আমাকে নিয়ে তাঁর মুখোমুখী বসালেন। দেখছি তাঁর কঠিন চিন্তায় আচ্ছন্ন গম্ভীর মুখ। অথচ তিনি একজন প্রাণখোলা ভীষণ ভালো মানুষ। যাঁকে আমি পরম শ্রদ্ধা করি। কিছুটা ভয়ও করি। আমাদের দুজনকে তিনি জানেন। গভীর স্নেহ করেন। সীমার কথা জেনে খুব সকালে এখানে আসতে বলেছেন। অপারেশনের আগে তিনি সীমাকে দেখে নিবেন। এখানে তাঁর নতুন রোগী দেখার কথা না। খুব জরুরী হওয়াতে সীমার জন্য তিনি এই সময়টা দিয়েছেন। 

 

মূল অপারেশন থিয়েটারের পাশে। যেখানে একজন মুমূর্ষু রোগীর তিনি অপারেশন করবেন। এখানে এই অপারেশন থিয়েটারের আঙিনায় তখন মৃত্যুসম কৃত্রিম তীব্র শৈত্যপ্রবাহ। ঠাণ্ডা আমি কখনও সহ্য করতে পারি না। শ্বাস কষ্ট হয়। অপারেশন দেখে আমি অভ্যস্ত নই। তাতে শ্বাস কষ্ট আরও বাড়ে। অচেতনতা, ছুরি-চাকু কাটা-ছেঁড়া আমি কখনও দেখতে চাই না। দেখি না। এমন কি টিভি-সিনেমাতেও। তার উপর আমার প্রিয় মানুষটিকে নিয়ে তীব্র শঙ্কা। সব মিলিয়ে আমার জন্য পরিবেশটি ছিলো বিষম ভয়ের। তার মধ্যে যাঁকে অনেক শ্রদ্ধা করি এবং পাশাপাশি প্রচণ্ড ভয় করি তার মুখোমুখী। আবার জানতে হবে তাঁর কথা সে যে আমার কতটুকু তা কাকে বলবো ? কেনো বলবো ? একটু পর কি জানি কতকিছু ভেবে ভেবে পাথরসম স্তব্ধতা সরিয়ে আমাকে ফেরদৌস ভাই জানালেন- জামাল, সীমার ক্যান্সার এবং রোগটি এডভান্সড।

 

তীব্র শৈত্যপ্রবাহের রুমটিতে আমি আর কিচ্ছু শুনতে পাচ্ছি না। সব নিরবতায় ছেয়ে আছে। আমি বাকহীন ফেরদৌস ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আছি কেবল। ঠিক ওই মুহূর্তে ফেরদৌস ভাইয়ের মুখটি ছাড়া আমার কাছে কোনো কিছুই দৃশ্যমান নয়। এবং কোনো শব্দ আর আমি পাচ্ছি না। সকল মনোযোগ আটকে রয়েছে একটি বিষয়ের উপর। আমার তখন একমাত্র চাওয়া যদি কোনো আশার কথা এরই মধ্যে তিনি বলেন। যদি কোনো সান্তনা দেন। কিন্তু আমি দেখলাম তখন তাঁর কঠিন রাগ-ক্ষোভ আমার দিকে ঠিকরে বের হতে। এই রোগের তিনি বিশেষজ্ঞ। এ জীবনে কত রোগী তিনি ভালো করেছেন। বাঁচিয়ে রেখেছেন দীর্ঘ সময়। আজ তাঁর ঘনিষ্ট একজন মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে তিনি হয়তো কিছু করতে পারছেন না। সেই রাগে-ক্ষোভে তিনি কিংকর্তব্যবিমূঢ়।

 

একসময় ফেরদৌস ভাই চেয়ার ছেড়ে ওঠলেন। আমি পাপেটের মতো অদৃশ্য সুতার টানে দাঁড়ালাম। তিনি যেতে যেতে থেমে হঠাৎ মোবাইলটি বের করে কাকে যেনো কয়েকবার চেষ্টা করলেন। পেলেন না। কয়েক কদম পর অপারেশনের ঘরে ঢোকার পূর্বে তিনি আমাকে বললেন- সন্ধ্যায় চেম্বারে আসুন, এক জায়গায় পাঠাবো।

 

একটু দূরে যে রুমটিতে সীমা বসে আছে আমি সেখানে গেলাম। আমি দেখি সীমা ভালো কিছু জানার অধীর আগ্রহ নিয়ে বেডে বসে আছে। আমাকে দেখে সে বড় বড় চোখ মেলে তাকায়, সুস্থতার কথা শুনতে চায়। আমি তাকে বলি- সীমা তোমার তেমন কিছু হয় নি। ফেরদৌস ভাই বলেছেন তুমি ভালো হয়ে যাবে। সীমা প্রশ্ন করে- জামাল আমার কি হয়েছে ? আমি আবারও বললাম- তেমন কিছু না, নিয়মিত ঔষধ খেলে তুমি ভালো হয়ে যাবে। আমি আমার প্রবল কান্নার চাপ ভিতরে আবদ্ধ রাখি। যা এই মুহূর্তে সবার আগে জরুরি।

 

দরিদ্রতা হঠাও, এ ছিলো আমার জীবনের প্রধান লক্ষ্য। শৈশব থেকে আজ পর্যন্ত আমি অনেক কাছের মানুষের নেগলেসি দেখে চলেছি। আমি নাম বলে তাঁকে অসম্মানিত করবো না। তার উপর সীমা খুব কষ্ট পাবে। তিনি একবার বলেছিলেন- চাল নাই, চুলা নাই। তিনি আমাকে সবসময় সবার অলক্ষ্যে কি বিষে, কোন যন্ত্রণায় খাটো করার প্রাণান্ত চেষ্টা করতেন। এমনকি নীচে ফেলে রাখার আপ্রাণ চেষ্টায় নিয়োজিত থাকতেন। বোধহয় কাউকে আমার চেয়ে বড় রাখার তার গোপন বাসনা থাকতে পারে। এটা হতে পারে তাঁর মানসিক রোগের প্রকোপ কিংবা কঠিন হিংসাত্মক চাপ।

 

প্রধানত আমি একজন অতি স্পর্শকাতর মানুষ। প্রায় চার যুগ আগে যখন সীমার সাথে পরিচয় থেকে ভালোবাসা হয়। তখন দুজনে আমরা আইন কলেজের বারান্দায় বসে কিংবা সেটেলম্যান্ট অফিসের উঁচু সিড়িতে বসে সবার অলক্ষ্যে স্বপ্ন গাঁথি। আমার একটি কথাই ছিলো, যা তখন বার বার তাঁকে বলেছি- আমরা দুজন নতুন একটা পৃথিবী গড়বো। যেখানে প্রথমত অভাব-অনটন থাকবে না। যা আমি সারা জীবন প্রতিদ্বন্দ্বী ভেবে এসেছি। দারিদ্রতা আমাকে শান্তি দেয় না। আমাদের একটি বড় লাইব্রেরি থাকবে আমরা অবসর কাটবো বই পড়ে। আমরা গান শুনবো। টিনের ঘরে বসে বৃষ্টি দেখবো। সময় পেলে এ দেশেই ঘুরে বেড়াবো বহু জায়গায়। আমাদের যখন ছেলে হবে তার নাম রাখবো ড্রিম। আর যদি মেয়ে হয় নাম রাখবো ড্রিমি। ওই সময় তুমি আমার সাথে সাথে পাল্টা ধরে প্রচুর বই পড়তে। 

 

তোমার মাথা ব্যথার একটি কমন রোগ ছিলো। তার জন্য মাঝে মাঝে তুমি নানুর দেয়া একটি তাবিজ পড়তে। তাবিজটি কপালের মাঝে রেখে কালো কাইতন দিয়ে টাইড করে নানু তোমার মাথার পিছনে বেঁধে দিতেন। জানো তোমাকে তাতে অনেক সুন্দর লাগতো। কেমন যেনো পৌরাণিক কোনো রাণীর মতো। আমি খুলতে বলতাম না। কারণ তুমি কষ্টের জন্য সেটা পড়েছো। যত তাড়াতাড়ি সেটা খুলে রাখা যায়। তোমার পড়তে কষ্ট হয়। তারপরেও তুমি আমার জন্য বইটি পড়ে শেষ করো। আইন কলেজের বাসায় দোতলার উপর পশ্চিম দিকে দুটি জানালা ছিলো সেখানে তুমি বসে পড়তে। আমি যেনো দেখি সে কথা ভেবে জানালার পাতগুলোর সাথে ঘেষে মুখটি রাখতে।

 

তোমাকে রেখে ভাগ্যান্বষণে দুবাই গেলাম। সেখানে আটকা পরে গেলাম একটার পর একটা সমস্যায়। সেখানে যেনো সর্বাঙ্গে সমস্যা। সমস্যা আর সমস্যা। দম বন্ধ হয়ে আসে আমার। যেভাবে মুক্ত মাছ হঠাৎ শক্ত জালে আটকা পড়ে। আমি ঠিক সেই রকম আটকা পড়লাম। বিশ্বাস করো এমনটা আমি কখনও ভাবি নি। একটা অপরিকল্পিত অমানবিক নির্মম জীবন-যাপন আমার শুরু হয় ১৯৮৬ সনের ৭ নভেম্বর থেকে। তবুও হাল ছাড়ি না যা আমার বড় দোষ। আমি শেষপর্যন্ত কঠিন চেষ্টা চালিয়ে যাই, যা আমার বৈশিষ্ট্য।

 

সারে তিন বছর পর কোনো রকমে প্লেনের ভাড়া জোগার করে দেশে এলাম। এখানে সব অপরিচিত মনে হয়। রাস্তা-ঘাট গলি দালান-কোঠা কেমন যেনো সব বদলে গেছে। আমাদের ভালোবাসার সুতিকাগার আইন কলেজটাও তাতে বাদ যায় নি। স্যাটেলম্যান্ট অফিসটাও অনেক দূরের মনে হয়। সেখানকার সবুজ ঘাসগুলোও এখন কেমন যেনো মুখ ঘুরিয়ে রাখে। আগের মতো পরম মমতায় আমাকে কাছে টানে না। 

 

তোমাদের দোতলা টিনের বাসাটা যা ছিলো আমার স্বপ্নের প্রাসাদ। যেখানে বসে দুজনে কত বৃষ্টি দেখেছি। জলকণার পরশ নিয়েছি। কত স্বপ্ন এঁকেছি। তাই না। ওরা হাসাহাসি করতো। সারে তিন বছর পর সেখানে দেখি সুযোগ সন্ধানী ক্ষতিকারক পরগাছা শিকড় গেঁথেছে। দেখি না আগের মতো করে সেই শিল্প-সংস্কৃতির চর্চা তোমাদের বাসায়। যা আমাকে মুগ্ধ করতো। দেখি সবাই কেমন যেনো টাকার পিছনে ছুটছে। জাপানি টাকার প্রবাহে অন্যসব ভুলে গেছে। 

 

তুমিও আর আগের মতো পড়ো না। গান গাও না- এই নীল মনিহার এই স্বর্ণালী দিনে তোমায় দিয়ে গেলাম শুধু মনে রেখো। তোমার কণ্ঠে যে গানটি শুনে আমি তোমাকে ভালোবাসা নিবেদন করেছিলাম। মনে আছে সীমা। কাঠের দোতলা ঘরটিতে কাজলের পড়ার চেয়ারে আমি বসে বই ঘাটছি তুমি একটু দূরে পূবের জানালায় দাঁড়িয়ে গানটি গেয়েছিলে। এই নীল মনিহার এই স্বর্ণালী দিনে, আশ্চর্য তুমি সন্ধ্যার একটু আগেই হয়তো আমাকে শোনানোর জন্য গেয়েছিলে। 

 

পরদিন আমি আর কাজল আটরশির মাজারে যাবো। সেখান থেকে নানার অফিস চরভদ্রাসন যাওয়ার কথা। রিক্সায় বসছি, বাসে চড়ছি, ফেরিতে দাঁড়িয়ে আছি। দূরে কোথাও কোনো পাল তোলা নৌকায় চোখ আটকে গেলেও কর্ণকুহুরে তখনও গুঞ্জরিত হচ্ছে তোমার গান- এই নীল মনিহার এই স্বর্ণালী দিনে তোমায় দিয়ে গেলাম। তিন দিন ঘুরে এসে সাহস করে তোমাকে একটি পত্র লিখলাম। সুদৃশ্য ডিজাইন করা কাগজে ভালোবাসার কথা জানালাম। অপেক্ষা করছি তোমার উত্তরের। তুমিও আমাকে বেশি সময় কষ্ট দিলে না। উত্তর দিলে ভালোবাসো জানিয়ে। আমি জেনে গেলাম এ পৃথিবী আমার। এ পৃথিবী আমার। (চলবে...)

 

এটিএম জামাল
সোনারগাঁ ভবন,  মিশনপাড়া,  নারায়ণগঞ্জ।
১৩ জুন, ২০১৯