বুধবার   ২১ আগস্ট ২০১৯   ভাদ্র ৬ ১৪২৬   ১৯ জ্বিলহজ্জ ১৪৪০

ইতিহাস, ঐতিহ্যে সাড়ে ৪শ’ বছরের পুরোনো ‘জ্বীনের মসজিদ’

প্রকাশিত: ৮ জুন ২০১৯  

শামীমা রীতা (যুগের চিন্তা ২৪) : বাঙালীর শত শত বছরের নিদর্শন ও হাজারো ইতিহাস, ঐতিহ্যের বাহক নারায়ণগঞ্জ জেলা। এ জেলার আনাচে-কানাচে এমন অনেক নিদর্শন রয়েছে যা বাঙালির হাজারো বছরের ঐতিহ্যের উদাহরণ। সময়ের সাথে সাথে অনেক নিদর্শনই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তবে এমন কিছু নিদর্শন এখনো যা এখনো মানুষের দৃষ্টিগোচরে রয়ে গেছে।

 

তেমনই এক নির্দশন মন্ডলপাড়া জামে মসজিদ। স্থানীয়দের কাছে এ মসজিদটি জ্বীন মসজিদ হিসেবে পরিচিত। লোকমুখে প্রচলিত এখানে জ্বীনেরা নামাজ পড়ে। মসজিদটির বয়স প্রায় সাড়ে ৪’শ বছরেও অধিক। 

 

নারায়ণগঞ্জ শহরের জিমখানা মোড় থেকে পশ্চিম দিকে বাবুরাইলের রাস্তা ধরে অল্প এগুলেই হাতের ডানেই এ মসজিদ অবস্থিত। তবে বাইরে থেকে এর ঐতিহ্যে সম্পর্কে ধারণা করা মুশকিল। স্থানবৃদ্ধির জন্য পুরোনো ছোট মসজিদটিকে ঘিরেই গড়ে তোলো হয়েছে আরো একটি মসজিদ।

 

সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মসজিদটির মূল গেটে মন্ডলপাড়া জামে মসজিদ তার নিচে ১৪৮২ লিখা। মসজিদের ভেতরে একটি সোনালী রঙা গম্ভুজ বেষ্টিত একটি ছোট্ট ঘর। তার মূল ফটকেও ১৪৮২ এ সংখ্যাটি উল্লেখ্য। এ সংখ্যাটি মসজিদটি প্রতিষ্ঠার সাল বলে নিশ্চিত করে মসজিদের মোতয়াল্লি আলহাজ্ব বরকত উল্লাহ খন্দকার।

 

বর্তমানে এ মসজিদের দুইজন মোতয়াল্লি রয়েছে। একজন আলহাজ্ব বরকত উল্লাহ খন্দকার অন্যজন আলহাজ্ব সাখাওয়াত উদ্দিন আহমেদ। মসজিদটির নানা বিষয় নিয়ে কথা হয় ষাটোর্ধ্বো বরকত উল্লাহ খন্দকারের সাথে।

 

জানা যায়, মসজিদটির প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দ সাহতাব উদ্দিন চৌধুরী ওরফে সাহতাব বেপারী। তার সাথে বিক্রমপুরের ভাগ্যকূলের রাজার বন্ধুত্ব¡ ছিলো। তখনকার নারায়ণগঞ্জের অর্ধেকের মালিক ছিলেন ভাগ্যকূলের রাজা। 

 

তার রেষ্ট হাউজ ও খাজনা আদায়ের জায়গা বা খাজাঞ্চিখানা ছিলো নিতাইগঞ্জের রাজারঘাট এলাকায়। যার ধ্বংসাবশেষ এখনো সেখানে আছে। ভাগ্যকূলের জমিদারের কাছ থেকে সাহতাব উদ্দিন বেপারী জিমখানা ও আশেপাশের ৫২ বিঘা জায়গা করবিহীন বন্দোবস্ত নেন।
সে সময় পারিবারিক মসজিদ হিসেবে সৈয়দ সাহতাব উদ্দিন চৌধুরী ওরফে সাহতাব বেপারী এ মসজিদ নির্মাণ করেন। আর এ এলাকার নাম দিয়েছিলেন রসুলবাগ। সে অনুযায়ী মসজিদের নাম দেয়া হয়েছিলো রসুলবাগ জামে মসজিদ। 

 

পরে এলাকাটি মন্ডলপাড়া, জিমখানা হিসেবে পরিচিত হয়। আর মসিজেদের নাম-ও পরিবর্তন হয়ে যায়। সেটি বিবি মরিয়ম মসজিদ নির্মাণের পরের কথা। তবে এ মসজিদ সুবেদারি আমলেই নির্মাণ করা হয়।

 

তার দাবি, শায়েস্তা খাঁ এর আমলে এ মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়। শায়েস্তা খাঁর মেয়ে বিবি মরিয়মের মসজিদ নির্মাণের পরপরই মোঘল সুবেদারি আমলে মোঘলরা এই মসজিদ, পঞ্চবটির আরছিমতলা জামে মসজিদ ও ঢাকায় একটি মসজিদ একই সময়ে নির্মাণ করেন। 

 

দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকার পর তার পিতামহের পিতা আব্দুল আলী খন্দকার ও তার বন্ধু মহীউদ্দীন খান এ মসজিদটি পুনরুদ্ধার করে।  পরে বিট্রিশ আমলে দলিল চালু হলে ব্রিটিশরা আইনী প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে মসজিদটির ৯১ শতাংশ জায়গা তাদের হস্তান্তর করেন।

 

পরবর্তীতে ১৯৮৮ সালের বন্যার পরে পুরোনো মসজিদটিকে ঘিরে নতুন মসজিদটি তৈরী করা হয়। ভেতরের  যে অংশটুকু সংরক্ষিত রয়েছে  সেটির সাথে আগে বাইরে আরো চারটি ধাপ ছিলো। বাইরে টিনের ছাউনির বারান্দা ছিলো। মসজিদটি মূলত ছয় কাতারের মসজিদ ছিলো। তবে মসজিদটি বড় করার সময় তা ভেঙে দেয়া হয়। আর নিদর্শন হিসেবে ছোট মসজিদটি রেখে দেয়া হয়।

 

মসজিদটিকে জ্বীন মসজিদ ডাকা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বরকত উল্লাহ্ খন্দকার জানান, এ মসজিদটি শুরু থেকেই এমন। অনেক ঘটনা আছে। আমরা নিজেরাই দেখতাম কেউ যদি এ মসজিদে অপবিত্র বা খারাপ কাজের উদ্দেশ্যে আসতো তাহলেই তাদের কাউকে পুকুর পাড়ে বা পানিতে ফেলে দিত। 


এমনকি এ মসজিদের যে বা যারা ক্ষতি করতে আসছিলো তাদের কারোই ভালো হয় নি। প্রতি বৃহস্পতিবার রাতে ছোট মসজিদে বসে আমরা নামাজ জিকির করি। এ মসজিদে নামাজ পড়তে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসে।
 

এই বিভাগের আরো খবর